অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৩৫ জন ভিজিটর

মাওলানা আব্দুর রহীম কেন জামায়াত ত্যাগ করেছেন?

লিখেছেন আফগানী মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২

 

সময়টা ১৯৭৬ সাল। শেখ মুজিবের ভূমিধ্বস পতনে এদেশের মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সবচেয়ে বেশি উপকার হয় ৭১ সালের পরাজিত শক্তি এদেশের ইসলামপন্থী দলগুলোর। ১৯৭২ সালে মুজিব সবগুলো ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করে দেয়। এর মধ্যে একমাত্র জামায়াত ছাড়া আর কেউই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সমর্থ হয়নি। দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলো যথাক্রমে নেজামে ইসলামী পার্টি, খেলাফতে রব্বানী ও জামায়াতে ইসলামী। 

 

চার-পাঁচ বছর নিষিদ্ধ থাকার পর দেখা গেলো দলগুলো নামসর্বস্ব দলে পরিণত হয়েছে একমাত্র জামায়াত ছাড়া। জামায়াত ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন হওয়া এবং রাজনীতির বাইরে লোক তৈরির এজেন্ডা থাকায় তারা গোপনে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বেগ পেতে হয়নি। 

 

মুজিবের পতনের পর ইসলামী দলগুলোর মধ্যে প্রভাবশালী হয়ে উঠে জামায়াত। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাতেই তাদের কার্যক্রম অব্যাহত ছিলো। জামায়াতের গোপনে তাদের প্রতিটি ইউনিটকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে নেজামে ইসলামী ছিলো আলেম ওলামা ভিত্তিক রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বাইরে দাওয়াত, লোক গঠন বা ইসলামী আদর্শের জন্য লোক প্রস্তুতির কোনো এজেন্ডা তাদের ছিলো না। ফলশ্রুতিতে দেখা গেলো মুজিবের পতনের পর তাদের কোনো কর্মী আর অবশিষ্ট নেই। 

 

আবার খেলাফতে রব্বানী ছিলো জ্ঞানী ও পণ্ডিতদের সংগঠন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে তারা প্রচুর সেমিনার ও পাঠচক্র করতেন। কিন্তু ইসলামের জন্য জীবন দেয়ার উপযোগী লোক তৈরিতে ব্যর্থ হওয়ায় তারাও কর্মীশূন্য হয়ে পড়ে। তারা ইসলামী কম্যুনিজম নামে একটি জগাখিচুড়ী টাইপের আদর্শ দাঁড় করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। 

এবার ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগের (IDL) প্রসঙ্গে আসা যাক। মাওলানা আব্দুর রহীম ছিলেন এর রূপকার। ১৯৭৬ সালে মে মাসে সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ধর্মীয় রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। ঐ বছরই আগস্ট মাসে আইডিএল গঠিত হয়। 

 

১৯৭৬ সালের ২৪ আগষ্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি, নেযামে ইসলাম পার্টি, খেলাফতে রব্বানী পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (IDL) নামে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম গড়ে তোলেন। কেন্দ্রীয় কমিটি ছিলো নিম্নরূপ। 

চেয়ারম্যান - মাওলানা সিদ্দিক আহমদ (নেজামে ইসলাম) 

ভাইস চেয়ারম্যান - মাওলানা আব্দুর রহীম (জামায়াত) 

ভাইস চেয়ারম্যান - এড. সা'দ আহমদ (জামায়াত) 

ভাইস চেয়ারম্যান - মাওলানা আব্দুস সুবহান (জামায়াত) 

সেক্রেটারি - এড. শফিকুর রহমান (ডেমোক্রেটিক পার্টি) 

 

(সা'দ আহমদ ছিলেন কুষ্টিয়ার জামায়াত নেতা। এর আগে তিনি মুসলিম লীগ, অতঃপর আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ৬২ সালে কারাবরণের সময় তিনি সেখানে জামায়াত নেতাদের সাক্ষাত লাভ করেন। মাওলানা মওদূদীর বইগুলো তার চিন্তার জগতে পরিবর্তন আনে। অবশেষে ১৯৬৬ সালে তিনি জামায়াতে যোগ দেন। ৭১-এ তিনি কট্টর স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন। এই কারণে তাকে কারাবরণ করতে হয়। তিনি একটি বই লিখেন মুজিবের কারাগারে পৌনে সাতশ দিন। ইতিহাস অনুসন্ধানীদের জন্য বইটি পড়া আবশ্যক।) 

 

এর মধ্যে ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে জামায়াত আইডিএলের ব্যানারে অংশগ্রহণ করে। আইডিএল ২০ টি আসন লাভ করে। এর মধ্যে জামায়াতের ছিলো ৬ জন। যাই হোক আইডিএলের সাফল্য আইডিএলের নেতাদের ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করে। 

সেই ছয়জন হলেন,

১। মাওলানা আবদুর রহীম, এম.এম (বরিশাল)

২। অধ্যাপক সিরাজুল হক, এম.এ (কুড়িগ্রাম)

৩। মাওলানা নুরুন্নবী ছামদানী, এম.এম (ঝিনাইদহ)

৪। মাষ্টার মোঃ শফিক উল্লাহ, বি.এ বিএড (লক্ষ্মীপুর)

৫। এএসএম মোজাম্মেল হক, আলিম (ঝিনাইদহ) 

৬। অধ্যাপক রেজাউল করিম, এম.এ (গাইবান্ধা) 

 

মাওলানা আব্দুর রহীম ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমীর নির্বাচিত হন। পাকিস্তান আমলে মাওলানা আব্দুর রহীম ১৩ বছর পূর্ব পাকিস্তানের আমীর ছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি নিখিল পাকিস্তানের নায়েবে আমীর মনোনীত হন। আর এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের আমীর হন অধ্যাপক গোলাম আযম। ১৯৭১-এ পট পরিবর্তনের ফলে মাওলানা আব্দুর রহীম আর এদেশে আসতে পারেননি। আর তাছাড়া তিনি নায়েবে আমীরের দায়িত্বও পালন করছিলেন। 

 

১৯৭৪ সালে তিনি পাকিস্তান জামায়াত থেকে ইস্তফা দিয়ে নিজ দেশ বাংলাদেশে ফিরে আসেন ও বাংলাদেশ জামায়াতে যোগ দেন। তখন জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান। জামায়াত আন্ডারগ্রাউন্ডে একটিভ ছিলো। পরের বছর মাওলানা আব্দুর রহীম আমীর নির্বাচিত হন ও দুই বছর আন্ডারগ্রাউন্ড জামায়াতের আমীর ছিলেন।  

 

১৯৭৬ সালে মাওলানা আব্দুর রহীম জামায়াতের হয়ে আইডিএল গঠন করেন। আইডিএল কোনো দল ছিলো না, এটি ছিলো একটি জোট। ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র চালুর সুবাদে জামায়াত আবারো প্রকাশ্যে কাজ করার চেষ্টা শুরু করে। 

১৯৭৯ সালে জামায়াত আবার প্রকাশ্যে সংগঠন ও রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই উপলক্ষে ইডেন হোটেলে তিনদিনব্যাপী রুকন সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। রুকন সম্মেলনে নানান বিষয়ে চুলছেরা বিশ্লেষণ শেষে জামায়াত রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।  

 

এরপর একদিন সংগ্রাম অফিসে অধ্যাপক গোলাম আযমের উপস্থিতিতে এড. সা'দ আহমদ বলেন, জামায়াত ও আইডিএল দুইটি প্রতিষ্ঠানই রাজনীতির ময়দানে থাকলে বিভ্রান্তি হতে পারে। জামায়াত এই ক'বছর যেভাবে আমাদের চার দফার তিন দফা নিয়ে কাজ করেছে সেভাবে লোক তৈরির কাজ করে যাওয়া উচিত। আর রাজনীতি আইডিএলের মাধ্যমেই হওয়া দরকার। গোলাম আযম বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেন, কিছুদিন আগে সম্মেলনে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তার বাইরে এখন নতুন কথা গ্রহনযোগ্য হবে না। তখন সা'দ আহমদ বলেছেন, আমাকে রুকন সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিলে আমি এই বিষয়টি নিয়ে রুকনদের কনভিন্স করতে পারতাম।

 

এডভোকেট সা'দ আহমদ বিষয়টি নিয়ে নানা স্থানে বলছেন। প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও গোলাম আযম এই বিষয়কে গুরুত্ব দিলেন। তিনি একান্তে মাওলানা আব্দুর রহীমকে বললেন, সা'দ ভাইকে থামানো উচিত। এর প্রেক্ষিতে মাওলানা আব্দুর রহীম সা'দ আহমদ সাহেবের কথার পক্ষেই যুক্তি দিলেন। গোলাম আযম এটিকে সিরিয়াস সাংগঠনিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত এর সমাধান চাইলেন। তিনি কর্মপরিষদের মিটিং ডাকলেন।

১২ জন কর্মপরিষদের মধ্যে ১০ জন সা'দ আহমদ সাহেবের প্রস্তাবের বিরোধীতা করলেন। বাকী মাওলানা আব্দুর রহীম ও পাবনার মাওলানা আব্দুস সুবহান প্রস্তাবকে সমর্থন করলেন। এই নিয়ে উভয়পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হলো। এর প্রেক্ষিতে কর্মপরিষদ শুরা সদস্যদের মতামত নেয়ার প্রয়োজন অনুভব করলো। 

 

তখন রমজান মাস চলছিল। দুই মাস আগে রুকন সম্মেলন হয়ে গেল। এর মধ্যে এখন সারাদেশ থেকে শুরা সদস্যদের ঢাকায় আসার ঘোষণায় অনেকেই অবাক হয়েছিল। কিন্তু শুরা মিটিং-এ যোগ দিয়ে তারা এর গুরুত্ব অনুধাবন করলেন। এডভোকেট সা'দ আহমদ শুরা মেম্বার না হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু তিনি এই প্রস্তাব অনানুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করে দুইজন কর্মপরিষদকে কনভিন্স করেছেন তাই তাঁকে শুরার সম্মেলনে দাওয়াত দেওয়া হয়। 

শুরার সদস্য ছিল ৪২ জন। এর মধ্যে মাস্টার শফিকুল্লাহ অসুস্থ থাকায় হসপিটালে ছিলেন। শুরায় প্রথমেই সা'দ আহমদ সাহেব তাঁর প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তিনদিন ধরে শুরার অধিবেশন চলে। যাদের কথা ছিল তারা কথা বলেন। সবশেষে দেখা গেল শুরার মধ্যে মাওলানা আব্দুর রহীম ও মাওলানা আব্দুস সুবহান ছাড়া বাকি সবাই রুকন সম্মেলনের সিদ্ধান্তের ওপর ইস্তেকামাত ছিলেন।        

 

মাস্টার শফিকুল্লাহর মতামত হাসপাতালে গিয়ে নেওয়া হয়। অবশেষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয় আগের সিদ্ধান্তই বহাল থাকবে। গোলাম আযম ইতেকাফে যান। সেখানে থেকেই মাওলানা আব্দুর রহীমকে রিকোয়েস্ট করে চিঠি লিখেন তিনি যাতে শুরার সিদ্ধান্ত মেনে নেন। মাওলানা আব্দুর রহীম মসজিদে এসে গোলাম আযমের সাথে দেখা করেন। দীর্ঘ আলোচনা শেষে মাওলানা তার সিদ্ধান্তেই অটল থাকেন।  

 

দুইজন বাদে বাকী শুরা সদস্যদের মতামত ছিল, আইডিএল থাকবে জোট হিসেবে (যেভাবে আছে)। আর জামায়াত তার নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হবে। জামায়াতের এজেন্ডা কখনোই আইডিএলে বাস্তবায়ন করা যাবে না। অতএব শুরায় জামায়াত নিজ নামে কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে অধিকাংশ শুরা মেম্বার মত দেন। 

 

জামায়াতের শুরার এই মতামত মেনে নিতে পারেননি মাওলানা আব্দুর রহীম। ওনার সহযোগী হিসেবে ছিলেন এড. সা'দ আহমদ, মাওলানা আব্দুস সুবহান এবং আরো কয়েকজন রুকন। এভাবেই তিনি জামায়াত থেকে চলে যান। তিনি ভেবেছেন আইডিএলের মাধ্যমে সহজে ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। 

 

ইদানিং অনলাইনে বিভিন্ন লেখকের লেখায় দেখলাম বলা হচ্ছে মাওলানা আব্দুর রহীম জামায়াতের কর্মকান্ড ও লক্ষ্য উদ্দেশ্যের সাথে বিরোধ করে বেরিয়ে গেছেন। অনেকে বলছেন মাওলানা মওদূদীর সাথে বিরোধে জড়িয়ে জামায়াত ত্যাগ করেছেন। অনেকে বলেন গণতন্ত্র ইস্যুতে বের হয়েছেন। এগুলো সঠিক নয়। উনি জামায়াত থেকে বের হয়েও গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও নির্বাচন করেছেন। 

 

আবার কেউ কেউ শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযমের চরিত্র হনন করে বলতে চান মাওলানাকে অধ্যাপক সাহেব জামায়াত থেকে বের করে দিয়ে তাঁর অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ সবই অবান্তর, বিদ্বেষপ্রসূত ও অজ্ঞতাপ্রসূত।


০ টি মন্তব্য      ১৫৯ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: