অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৮ জন ভিজিটর

সৌদি রাজতন্ত্রের ভবিষ্যত.....

লিখেছেন লাবিব আহসান রবিবার ২১ অগাস্ট ২০২২
১.
সৌদি আরবের রাজনীতিতে মুহাম্মদ বিন সালমানের উত্থান মূলত ২০১৫ সালের প্রারম্ভে। জানুয়ারি মাসে বাদশাহ আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। এরপর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন সালমান বিন আবদুল আজিজ। মসনদে বসেই পুত্র মুহাম্মদকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পণ করেন। অথচ তার তেমন কোনো সামরিক অভিজ্ঞতাই ছিল না।
একই বছরের এপ্রিল মাসে সৌদি রাজনীতিতে ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে অধিষ্ঠিত হন মুহাম্মদ বিন নায়েফ। আর প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের পাশাপাশি ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্সের দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয় মুহাম্মদ বিন সালমানকে। বলাই বাহুল্য, মুহাম্মদ বিন সালমান ছিলেন প্রচন্ড উচ্চাভিলাষী। কাজেই তার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চর্চার পথে একমাত্র বাঁধা মনে করলেন মুহাম্মদ বিন নায়েফকে।
বিন নায়েফও ছিলেন না কোনো সাধারণ চিজ। দীর্ঘ সময় তিনি সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এফবিআই আর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড থেকে। সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সবসময়ই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন মুহাম্মদ বিন নায়েফ। যোগাযোগ ছিল সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ)-এর সাথেও।
অত্যন্ত দক্ষতাসম্পন্ন এই সৌদি রাজপুত্র নিজ যোগ্যতাবলে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন। সৌদি আরবের জনগণের সাথে মিশে যান, হয়ে ওঠেন জাতীয় বীর। ফলে মুহাম্মদ বিন সালমান তাকে নিজের ভবিষ্যত রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য হুমকি বলে বিবেচনা করতে শুরু করেন। যেকোনো মূল্যে তাকে থামিয়ে দেওয়াই হয়ে ওঠে তার একমাত্র লক্ষ্য।
২০১৫ সালের মার্চে বিন নায়েফকে পাশ কাটিয়ে ইয়েমেন যুদ্ধ শুরু করেন বিন সালমান। পরের বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সাথে নায়েফের মিটিং আটকে দেওয়া হয়। তার এসকল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হন সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ মুহাম্মদ বিন যায়েদ। দুজন মিলে এগিয়ে যেতে থাকেন দৃপ্ত পদভারে।
২.
পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাস বিবেচনা করলে দেখা যায়—আরব উপদ্বীপ সবসময়ের জন্যই আলোচনা ও গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। হাল আমলের রাজনীতিতেও তারা মধ্যপ্রাচ্যের মোড়ল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু উমাইয়া বংশের পতনের পর বৈশ্বিক রাজনীতির পাদপ্রদীপ থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়েছিল সৌদি আরব।
সুগঠিত রাষ্ট্রকাঠামোর অনুপস্থিতিতে স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করছিল বিভিন্ন গোত্রের প্রধানরা। উপদ্বীপের আশেপাশে বসবাসরত গোষ্ঠীগুলো ছোটোখাটো বিষয়েই জড়িয়ে পড়ছিল সংঘর্ষে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের উত্থানের পর এটি চলে যায় তাদের দখলে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের আগ পর্যন্ত আরব উপদ্বীপ তাদের অধীনেই ছিল।
ক্রমাগত এই গোষ্ঠীকলহ আর বিচ্ছিন্নতার ইতিহাসকে সঙ্গী করেই উত্থান ঘটে সৌদ বংশের। পুরো উনবিংশ শতাব্দীজুড়ে সৌদ বংশ চেষ্টা করে আরব উপদ্বীপে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করতে। শেষমেষ তাদের চেষ্টা সফল হয় উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে। এরপরের ইতিহাস একচ্ছত্রভাবে সৌদ বংশের হাতে নির্মিত।
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে পরাক্রান্ত সেই রাজবংশের মধ্যে শুরু হয় অভ্যন্তরীন ক্ষমতা দখলের ভয়াবহ লড়াই। লড়াইয়ে অবতীর্ণ সৌদ বংশের তৃতীয় প্রজন্মের দুই প্রিন্স। একদিকে বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজের ৬ষ্ঠ সন্তান মুহাম্মদ বিন সালমান। অন্যদিকে ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মদ বিন নায়েফ। হাল রাজনীতির অন্যতম পরাক্রমশালী রাষ্ট্রটির ভবিষ্যত শাসনভার ঝুলতে থাকে ভাগ্যের সুতায়।
৩.
মুহাম্মদ বিন নায়েফ তার বিরুদ্ধে চলতে থাকা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের আভাস নানাভাবে টের পাচ্ছিলেন। ২০০৯ সালে আল-কায়েদার বোমা হামলায় আহত হয়েছিলেন তিনি। ফলে ক্রমাগত স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছিল। প্রায়ই ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে হতো তাকে। ধীরে ধীরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও উপস্থিতি কমে আসছিল। একবার বারাক ওবামার সাথে এক মিটিংয়ে ঝিমুতে দেখা গিয়েছিল তাকে।
২০ জুন, ২০১৭। তখন মধ্যরাত। মুহাম্মদ বিন নায়েফকে রাজপ্রাসাদে ডেকে পাঠানো হলো। কারণ, বাদশাহ সালমান তার সাথে দেখা করতে চান। প্রাসাদে প্রবেশের সময়ই তার দেহরক্ষীদের নিরস্ত্র করা হলো একে একে। বিন নায়েফ বুঝে ফেললেন আসন্ন বিপদের কথা। রাজপ্রাসাদের এক কর্মকর্তা তার সামনে পদত্যাগপত্র নিয়ে এলো। বিন সালমানপন্থীরা তাকে পদত্যাগ করতে মোটামুটি বাধ্য করল।
বাদশাহ সালমান তাকে ক্রাউন প্রিন্সের পদের পাশাপাশি সরিয়ে দিলেন অন্যান্য সকল রাজনৈতিক পদ থেকে। এলিগিয়েন্স কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট আর বাদশাহ সালমানের ডিক্রিতে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে অধিষ্ঠিত হলেন মুহাম্মদ বিন সালমান। একজন আরবের ডি-ফেক্টো লিডার হিসেবে যাত্রা শুরু হলো তার। কিন্তু ক্রমে ক্রমে নিজের প্রকৃত চেহারা দেখাতে শুরু করলেন তিনি।
ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে ভয়াবহ এক মানবিক সংকট তৈরির পিছনে মূল দায় তার । তিনি ইয়েমেনকে ঠেলে দেন আরেকটি গৃহযুদ্ধের দিকে। সমালোচকদের কঠোর হাতে দমন করতে তার জুড়ি নেই। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হলো সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া। এছাড়াও সৌদির অভিজাতদের হোটেলে বন্দি করে অর্থ গ্রহণেরও অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়—মুহাম্মদ বিন সালমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যত খুব বেশি সুখকর হবে না। ম্যাকিয়াভেলির লেখা ‘দ্য প্রিন্স’ অনুযায়ী তিনি সৌদি আরবের স্থিতিশীল রাজনীতির ধরন বদলে দেওয়ার মাধ্যমে ঝুঁকিতে ফেলেছেন নিজেকে। এমনকি ঝুঁকিতে ফেলেছেন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে। আগামীর সৌদি রাজনীতি কোন পথে যাচ্ছে, প্রবল আগ্রহ নিয়ে তা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

সৌদি আরব বিন সালমান
০ টি মন্তব্য      ২২৪ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: