অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২২ জন ভিজিটর

মৌচাকের সেলগুলো ষড়ভুজাকৃতি কেন?

লিখেছেন লাবিব আহসান রবিবার ২১ অগাস্ট ২০২২
মৌমাছিদের আবাস মৌচাক নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে কিছু বিস্ময়কর তথ্যের মুখোমুখি হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তারা মৌচাককে একটি অতি উচ্চমার্গীয় স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন হিসেবে আবিষ্কার করেছেন। শুধু তাই নয়, তারা দেখেছেন—একটি মৌচাক নির্মাণে মৌমাছিরা অনুসরণ করে গণিতের নিখুঁত ফর্মূলা।
পৃথিবীর যাবতীয় মৌচাক দেখতে অনেকটা একই আকৃতির; ষড়ভুজের মতো। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা মৌমাছিদের বুদ্ধিদীপ্ত এক ব্যয়সংকোচন-নীতির পরিচয় পেয়েছেন। অর্থাৎ মৌমাছিরা তাদের পরিশ্রমলব্ধ মূলধন অপচয়ের হাত থেকে রক্ষা করার ব্যাপারেও পূর্ণ সচেতন থাকে।
সাধারণত মৌচাক তৈরি হয় মোম থেকে। আর মোমের উৎস হলো মৌমাছিদেরই তৈরিকৃত মধু। প্রতি ১ আউন্স মোম তৈরিতে প্রায় ৪ আউন্স মধু প্রয়োজন হয়। আর ১ কেজি মধু সংগ্রহ করতে মৌমাছিকে প্রায় ৯০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়, বসতে হয় কমপক্ষে ৪০ লাখ ফুলের উপর।
তাই মৌমাছিরা মৌচাক নির্মাণে মোম খরচ করে অত্যন্ত বুঝে-শুনে। যথেষ্ট হিসেব-নিকেষ করতে হয় তাদের। কম মোম খরচ করে বেশি মধু সংরক্ষণ করার মতো স্টোরেজ তৈরি করতে তারা থাকে বদ্ধপরিকর। এই হিসেবটি করতেই মূলত তারা আশ্রয় নেয় গণিতের। জ্যামিতির নিখুঁত ছকে তৈরি করে মৌচাকের প্রতিটি সেল।
একটু বুঝিয়ে বলা যাক! জ্যামিতি সম্পর্কে যাদের নূন্যতম ধারণা আছে, তারা জানেন—যেকোনো বহুভুজেরই ক্ষেত্রফল থাকে। একটি ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল হতে পারে ১ বর্গ একক। একটি চতুর্ভুজের ক্ষেত্রেও হিসেবটি তাই। একটি পঞ্চভুজের ক্ষেত্রফলও হতে পারে ১ বর্গ একক। এখন এই বহুভুজগুলোর পরিসীমা কেমন হবে?
একই ক্ষেত্রফলের একটি ত্রিভুজের পরিসীমা হবে ৪. ৫৬ একক। একটি বাহু বাড়ালে তৈরি হবে বর্গ; যার পরিসীমা হবে ৪ একক। আরও একটি বাহু বাড়িয়ে পঞ্চভুজ বানালে তার পরিসীমা হবে ৩. ৮১ একক। অর্থাৎ বাহুর সংখ্যা যত বাড়ানো হবে, একই ক্ষেত্রফলে পরিসীমা তত কমতে থাকবে। আর পরিসীমা যত কম হবে, মোম তত কম লাগবে।
সহজ কথায় বলা যায়—মৌচাকের সেলগুলোর সংখ্যা বাড়ানো হলে মোমের খরচ কমে আসবে এবং বাড়বে মধু সংরক্ষণের জায়গা। সর্বোচ্চ বাহুর বহুভুজ হলো বৃত্ত। সেই বিবেচনায় মৌচাকের সেলগুলো হওয়া উচিত ছিল বৃত্তাকার। কিন্তু বৃত্তাকার সেলের আশেপাশে বিরাট ফাঁকা জায়গা থেকে যায়। এই ফাঁকা জায়গাকে মোম দিয়ে ভরাট করা মানে মোমের বিরাট অপচয়। আবার যদি ফাঁকা রেখে দেওয়া হয়, তাহলে ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
পঞ্চভুজ বা সপ্তভুজ আকৃতিতে গেলেও বৃত্তের মতোই সমস্যা দেখা দেয়। অর্থাৎ মাঝখানের ফাঁকা জায়গাগুলো পূরণ হয় না। আর যদি চতুর্ভুজ বা পঞ্চভুজকে বেছে নেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে মোমের খরচ বেড়ে যায় অনেক বেশি। সেলগুলোও তেমন মজবুত হয় না। সবদিক বিবেচনা করলে দেখা যায়—ষড়ভুজ আকৃতিই সকল দিক থেকে ভারসাম্যপূর্ণ। এখন প্রশ্ন জাগে—মৌমাছির মতো একটি সামান্য পতঙ্গের মস্তিষ্কে এই জটিল গাণিতিক হিসেব কে ঢুকিয়ে দিলেন?
মৌমাছিকে মধু সংগ্রহের জন্য পাড়ি দিতে হয় হাজার হাজার মাইল পথ। কত বিচিত্র ফুল থেকে কত বিচিত্র স্বাদের মধু যে সংগ্রহ করে আনে! এই সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও সে তার আবাসস্থলের ঠিকানা ভুলে যায় না। সূর্যের সঙ্গে একটি কৌণিক দূরত্ব পরিমাপ করে ঠিক ঠিক ফিরে আসে তার চিরন্তন আবাসে। কোন সে শক্তিমান সত্ত্বা, যিনি অতি তুচ্ছ এই পতঙ্গের মস্তিষ্কে লাগিয়ে রেখেছেন দিক নির্ণয়ের প্রাকৃতিক কম্পাস?
একটি মৌচাকের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে রানী মৌমাছির কাঁধে। তাই রানী মৌমাছির মৃত্যুর পর খুব দ্রুত আরেকজন রানীর প্রয়োজন হয়। সাধারণত সবগুলো লার্ভা একই রকম খাবার পায়। কিন্তু যারা রানী মৌমাছি প্রার্থী, তাদের দেওয়া হয় অত্যন্ত পুষ্টিমানের খাবার। একে বলা হয় ‘দ্য রয়্যাল জেলি।’ এতে হাই-প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ, সুগার, অ্যামাইনো অ্যাসিড; সবরকম খাবারের এক সুষম মিশ্রণ থাকে।
এরপরের নির্বাচন প্রক্রিয়া আমাদের মতোই সংঘাতপূর্ণ। সেই লার্ভা থেকে প্রথম যে রানী মৌমাছি প্রার্থী পূর্ণাঙ্গ মৌমাছিতে রূপান্তরিত হয়, সে খুব স্বাভাবিকভাবে অন্য সব প্রার্থীকে হত্যা করে। আর একাধিক মৌমাছি বের হলে চলে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ। ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকে, যতক্ষণ কেবল একজনই টিকে থাকে। এভাবে শেষ পর্যন্ত যে টিকে থাকতে পারে, সে-ই রানীর আসনে বসে। সারাজীবন তার জন্য বরাদ্দ থাকে ‘দ্য রয়্যাল জেলি।’
মৌমাছিদের বিশাল সমাজে নেতৃত্বের এই ব্যবস্থাপনা করছেন কে? এসকল জিজ্ঞাস্যের জবাবে মন অজান্তেই বলে ওঠে—কেউ একজন নিশ্চয় আছেন, যিনি দৃশ্যকল্পের অন্তরাল থেকে নিয়ন্ত্রণ করছেন সবকিছু। পারিপার্শ্বিক এ সমস্ত বিস্ময়গুলো সেই অদেখা সত্ত্বার প্রতি আমাদের বিশ্বাসের ভিতকে মজবুত করে। সেই বিশ্বাসের ডানায় ভর করেই আমরা এগিয়ে চলি আগামী জীবনের পথে।

বিজ্ঞান মৌমাছি গণিত
০ টি মন্তব্য      ১৪৯ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: