অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৩৬ জন ভিজিটর

শিক্ষকজীবনে দাওয়াহ’র সুযোগ.....

লিখেছেন লাবিব আহসান বৃহস্পতিবার ১৮ অগাস্ট ২০২২
বাংলাদেশে ক্যাডেট কলেজ শিক্ষাপদ্ধতির গোড়াপত্তন হয়েছিল স্বাধীনতারও বেশ আগে, ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের হাত ধরে। সামরিক শাসক হিসেবে শাসনভার গ্রহণের পর তিনি সমগ্র পাকিস্তানে বইয়ে দিয়েছিলেন সামরিক হাওয়া। তাঁর আমলেই উপমহাদেশের বিশাল আয়তনের তৎকালীন অখন্ড দেশটিতে শুরু হয়েছিল খাকি পোশাকধারীদের একচ্ছত্র দাপট। পড়াশুনার সঙ্গে সামরিক সংস্কৃতির মিশেল ঘটানোর এই প্রচেষ্টা তাদের সেই দাপটে যুক্ত করেছিল নতুন হাওয়া।
প্রশ্ন হলো—এ ধরনের খাকি চত্ত্বরের ধারণা আইয়ুব খান কোথায় পেয়েছিলেন? হ্যাঁ, তিনি ক্যাডেট কলেজের মডেলটি ধার করেছিলেন উপমহাদেশের এককালের প্রভুরাষ্ট্র ব্রিটিশদের কাছ থেকে। সেখানে লর্ড, ব্যারন, ডিউক, নাইট প্রমুখ অভিজাত পরিবারের ছেলেদের ‘ডিসিপ্লিনড জেন্টলম্যান’ বানানোর জন্য এক ধরনের এলিট বোর্ডিং স্কুল আছে। এই স্কুলগুলোরই অনেকটা সামরিকায়ন হলো বর্তমান ক্যাডেট কলেজগুলো। তাদের কাজ দেশের জন্য চৌকস ও দক্ষ নাগরিক সরবরাহ করা।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ টি ক্যাডেট রয়েছে। এই ভূ-খন্ডে প্রতিষ্ঠিত তৃতীয় ক্যাডেট কলেজটির নাম মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ। কথাশিল্পী শাহাদুজ্জামান পড়েছেন এই ক্যাডেট কলেজে। কঠিন রুটিনে বাঁধা জীবন। সেই রুটিনে বাঁধা দিনগুলো নিয়ে তিনি একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস লিখেছেন, নাম—‘খাকি চত্ত্বরের খোয়ারী’। আমি যে কথাশিল্পীর জীবনগল্প বলছি, তাঁর হাতেই সৃষ্টি হয়েছে কর্নেল তাহেরকে নিয়ে লেখা ‘ক্রাচের কর্নেল’ এবং জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা ‘একজন কমলালেবু’র মতো বিখ্যাত উপন্যাস।
সপ্তম শ্রেণির ছোট্ট বালক শাহাদুজ্জামান যেদিন প্রথম মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের সেই খাকি চত্ত্বরে গিয়ে প্রবেশ করলেন, সেদিনই তাঁর বেশ কয়েকজন বন্ধু জুটে গেল। কিন্তু দিনে দিনে প্রবল ঘনিষ্ঠতা হলো যে ছেলেটির সঙ্গে, তার নাম মিলন। তিনি লক্ষ্য করলেন—মিলন আর সবার মতো নয়, একটু ব্যতিক্রম। সেই ছোট্ট বয়সেই জীবন সম্পর্কে তার ধারণা স্থুল নয়, বৃহৎ। সে চুপচাপ, ভাবুক। স্বল্পবাক অথচ তার নীরবতাই যেন প্রবলভাবে কথা বলে চলে। শাহাদুজ্জামান কেবল মিলনের সঙ্গেই তাঁর চিন্তার মিল খুঁজে পেলেন।
আর সবাই যেমন জীবনকে একটা গতানুগতিক জায়গা থেকে দেখত, মিলন সেভাবে দেখত না। সবার চিন্তাই ছিল—খাকি চত্ত্বর থেকে বেরিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিবে অথবা বিশ্ববিদ্যালয় পাস করে ভালো কোনো চাকরীতে যোগ দিয়ে জীবনকে নিরাপদ করবে। মিলন ছিল এ সকল সাধারণ ভাবনার ঊর্ধ্বে। তার কাছে জীবন মানে ছিল এরচেয়েও বেশি কিছু। খাকি চত্ত্বরের ৬ বছরের বন্দিত্ব আর সেনাবাহিনীতে সারাজীবনের স্বাধীনতা বিসর্জন ছিল তার কাছে কল্পনাতীত। কাজেই কলেজের প্রচলিত ধরা-বাঁধা নিয়মের সঙ্গে তার মন বিদ্রোহ করতে শুরু করল।
মিলনের মা মারা গেছেন, সৎ মায়ের জটিল সংসারে বাবার আচরণও রীতিমতো সৎ বাবার মতো। তিনি ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন—ক্যাডেট কলেজ থেকে বেরিয়ে সেনাবাহিনীতে ঢুকতে না পারলে আর কোনোদিন বাড়িতে ঢুকতে দেয়া হবে না। এই হুলিয়া মাথায় নিয়েও মিলন প্রতিদিন যাপন করে চলে কবিতার জীবন। শরীরে চিরদিনের জন্য খাকি পোশাক জড়ানোর কোনো ইচ্ছে তার নেই। নিয়ম করে রাত দশটায় যখন কক্ষের বাতি বন্ধ হয়ে যায়, তখন সে আওড়ায় জীবনানন্দ দাশের কবিতা—‘যে জীবন ফড়িং-এর, দোয়েলের/ মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা।’
শাহাদুজ্জামানকে বন্ধু মিলন একাকী আলাপচারিতায় প্রশ্নবিদ্ধ করে—‘জীবন কি শুধুই জয়ের জন্য? এর বাইরে কি আর কিছুই নেই?’ তার সহপাঠীরা জীবনকে এত ছোটো জায়গা থেকে দেখে, এত উপরিতলে দেখে যে, মিলন নিজেকে তাদের কারও সঙ্গেই মেলাতে পারে না। একটা বিকল্প জীবনের স্বপ্ন সে প্রতিনিয়ত বুনে চলে। কিন্তু কী সেটা; তা তার কাছে অধরা। সে কেবল জানে—একটি গতানুগতিক, অনাড়ম্বর, ঘটনাবিহীন জীবন কাটানোর জন্য সে আসেনি পৃথিবীতে। তার জন্ম হয়েছে অন্য কিছুর জন্য।
একদিন ঘটে গেল এক বিস্ময়কর ঘটনা। কলেজে বাংলা পড়ানোর জন্য এলেন একজন নতুন শিক্ষক; তাঁর নাম রফিক কায়সার। প্রথম দিন ক্লাসে এসেই তিনি বললেন—‘আমি তোমাদের মাইনর লেখকদের লেখা পড়াব না। এটা তোমরা নিজ দায়িত্বে পড়ে নিবে। এর বদলে মেজর লেখকদের লেখা নিয়ে দুইটি বেশি ক্লাস নিবো।’ কেউ কিছু বুঝতে না পেরে হা করে তাকিয়ে থাকল। স্যার খোলাসা করলেন—‘আমি বন্দে আলী মিঞাঁকে নিয়ে কোনো ক্লাস নিবো না। এর পরিবর্তে রবীন্দ্রনাথ কিংবা জীবনানন্দের লেখার উপরে দুইটি ক্লাস বেশি নিবো।’ সবাই নড়েচড়ে বসল। মিলন এবং শাহাদুজ্জামান সবচেয়ে বেশি।
এই শিক্ষক তাদের জীবনের চেয়ে বড়ো এক জগতের সন্ধান দিতে চাইলেন। সবাইকে গতানুগতিক যে দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনকে দেখে, তিনি তার চাইতেও ঊর্ধ্বে উঠে জীবনকে দেখতে বললেন। সিলেবাসে না থাকা সত্ত্বেও একদিন তিনি পড়ালেন জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত কবিতা—‘আট বছর আগের একদিন’। প্রবেশ করলেন কবিতার ভিতর। ছাত্রদের কাছে ব্যাখ্যা করলেন কবিতার মর্মকথা। ক্লাসের ভালো ছাত্ররা বিরক্ত হলো বটে! কিন্তু উজ্জ্বল হয়ে উঠল শাহাদুজ্জামান এবং মিলনের মুখ। তারা যেন এমন একজন শিক্ষকের জন্যই অপেক্ষা করে ছিল এতদিন। যে শিক্ষক পাঠ্যবই নয়, পড়তে শেখাবেন জীবনকে।
এরপরই কাহিনীর গতি মোড় নিলো ভিন্ন দিকে। যোগদানের এক সপ্তাহের মাথায় রফিক কায়সার স্যারের চাকরি চলে গেল। তাঁর প্রিয় দুই শিষ্য ভীষণরকম হতাশ হয়ে পড়ল। ক্যাডেট কলেজ থেকে বিদায় নেওয়ার ঠিক একদিন আগে মধ্যরাতে পাশের রেললাইনে ট্রেনের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করল মিলন। সবাই চলে গেল যার যার নতুন গন্তব্যে। কিন্তু রফিক কায়সার স্যার জানলেন না—তিনি তাঁর অজ্ঞাতেই জন্ম দিয়ে গেলেন বাংলা ভাষার একজন মহান কথাশিল্পীর। তাঁর নাম শাহাদুজ্জামান।
তাঁর সেই এক সপ্তাহের ক্লাস বদলে দিয়েছিল শাহাদুজ্জামানের মন। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন লেখক হবার। একজন শিক্ষকের শক্তির জায়গাটা এখানেই; শিক্ষার্থীর জীবননদীর গতিপথ বদলে ফেলার সক্ষমতা। তার ভাবনাজগতে প্রবেশের বিরল সুযোগ। এজন্যই বলা হয়ে থাকে—একজন শিক্ষক হলেন ভবিষ্যত জাতি নির্মাণের কারিগর। তিনি ইমাম শাবী হয়ে অনায়াসেই নির্মাণ করতে পারেন ইমাম আবু হানিফা। তিনি ইমাম ইবনে তাইমিয়া হয়ে তৈরি করে যেতে পারেন ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রা.)।

শিক্ষাগুরু খাকি চত্ত্বরের খোয়ারি
০ টি মন্তব্য      ১৫৩ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: