অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২২ জন ভিজিটর

অবরুদ্ধ এ সময়ে......

লিখেছেন লাবিব আহসান বৃহস্পতিবার ১৮ অগাস্ট ২০২২
বাংলাদেশ যে মোটামুটি একটা ভয়ঙ্কর সংকটের দিকে এগিয়ে চলেছে, তা বোঝার জন্য বোদ্ধা হবার প্রয়োজন নেই। হঠাৎ জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সেই সংকট সূচনার চোরা ফাঁদ। বলা হচ্ছে—আইএমএফ থেকে ঋণ নেয়ার স্বার্থেই এটি করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। আইএমএফ ঋণ দেয়ার শর্ত হিসেবে জুড়ে দিয়েছে জ্বালানি তেলে ভর্তুকি প্রত্যাহার। আবার বলা হচ্ছে—পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি পণ্যের মূল্যের পার্থক্যজনিত পাচার রোধ করার জন্য বাড়ানো হয়েছে তেলের দাম।
তবে তেলের মূল্য বৃদ্ধির পিছনে যে কারণটিই ক্রিয়া করুক না কেন, এটি যে দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড মারাত্মকভাবে ভেঙ্গে দিতে যাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একটি দেহের চালনার জন্য যেমন রক্তের প্রয়োজন, তেমনি একটি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রয়োজন জ্বালানি তেল। রক্তের পরিমাণ একেবারে কমে গেলে যেমন একজন মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না, তেমনই জ্বালানি তেল ছাড়া একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। জ্বালানি তেলের এখনও পর্যন্ত কোনো শক্ত ও বিশাল পরিসরে ব্যবহারযোগ্য বিকল্প আবিষ্কার হয়নি।
দেশের অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে জ্বালানি তেল কতটা আন্তঃসম্পর্কযুক্ত, একজন সচেতন নাগরিক মাত্রই তা জানবার কথা। বিমান শিল্পের কথাই ধরুন! বিমান ওড়াতে যে জ্বালানি ব্যবহৃত হয়, তার নাম ‘জেট ফুয়েল।’ কেরোসিন পরিশোধনের মাধ্যমে এটি উৎপাদন করা হয়। আবার এই কেরোসিনের উৎস হলো খনিজ তেল। পরিবহন শিল্প তথা বাস, ট্রাক ও অন্যান্য পরিবহনগুলো ডিজেল, পেট্রোলের উপর নির্ভরশীল। এই ডিজেল, পেট্রোলও কিন্তু খনিজ তেল থেকেই উৎপাদিত হয়! ফলে পরিবহন শিল্পের কস্টিং বেড়ে যাবে।
যানবাহনের ইঞ্জিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সচল ও কর্মক্ষম রাখতে ব্যবহার করা হয় 'লুব্রিকেটিং ওয়েল'। এটাও খনিজ তেল থেকে উৎপাদন করা হয়। বাংলাদেশের কৃষি শিল্পে ট্রাক্টর একটি অনিবার্য যান। অতি অল্প সময়ে, স্বল্প পরিশ্রমে অধিক পরিমাণ জমি চাষের জন্য ট্রাক্টর এক বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখে চলেছে। কৃষকদের জীবনকে সহজ করে দিয়েছে ট্রাক্টর। এই ট্রাক্টরে যে জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়, সেটাও খনিজ তেল থেকে উৎপাদিত। তার মানে, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনে কতটা প্রভাব ফেলবে, ভেবেছেন!
না, ‘জ্বালানি তেল নামা’ এখনো শেষ হয়নি। আমরা কল্পনাও করতে পারি না, প্রতিদিন এই তেলের উপর আমরা কতটা নির্ভরশীল! খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা; প্রথম মৌলিক প্রয়োজন। এই খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা হয় সার। পোকামাকড়ের হাত থেকে ফসল বাঁচাতে ব্যবহৃত হয় কীটনাশক। সার ও কীটনাশকের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোন উপাদান মুখ্য ভূমিকা রাখে, বলতে পারেন? এটিও কিন্তু খনি থেকে প্রাপ্ত তেল।
আমরা প্রতিদিন যেসব জিনিসপত্র ব্যবহার করি, তার একটি বড়ো অংশ প্লাস্টিকের তৈরি। প্লাস্টিক তৈরি করা হয় কোথা থেকে জানা আছে? সেই খনিজ তেল থেকেই। আমরা অনেকেই পলিয়েস্টার কাপড়ের পোশাক পরিধান করে থাকি। এই পলিয়েস্টার কাপড়ও খনিজ তেল থেকে উৎপাদন করা হয়। তেলের মূল্য বৃদ্ধি এসব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়াও বাংলাদেশ খাদ্য ও শিল্পপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এসব পণ্য বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এসব পণ্যে পরিবহন খরচ বেশি গুণতে হবে। সেই ভার বইতে হবে অভাগা জনগণকে।
দেশের সবগুলো শিল্পকারখানার পণ্য উৎপাদন, পরিবহন কিংবা বাজারজাতকরণে জ্বালানি তেলের ব্যবহার অনিবার্য। ফলে এটির মূল্য বৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবীভাবে বাড়িয়ে দেবে উৎপাদিত শিল্পপণ্যের চাহিদা। অর্থনীতির নিয়ম হলো—যখন জনগণের আয় না বেড়েও পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তখন মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। জনগণের হাতে যে অর্থ থাকে, সেটির একটি বড়ো অংশ পণ্যের পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে অন্যান্য খাতে ব্যয় করার মতো অর্থের পরিমাণ কমে আসে। সবমিলিয়ে এ কথা নির্দিধায় বলে দেওয়া যায়—নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অশুভ সময় অপেক্ষা করে আছে।

বাংলাদেশ দ্রব্যমূল্য
০ টি মন্তব্য      ১১৩ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: