অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২০ জন ভিজিটর

খোকার মৃত্যু...

লিখেছেন লাবিব আহসান বৃহস্পতিবার ১১ অগাস্ট ২০২২
খোকার যখন মৃত্যু হলো, তখন ঘড়িতে বাজে রাত তিনটা একুশ। বাইরে অবিরাম ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। টিনের চাল থেকে বৃষ্টির যে শব্দ আসছে, তাকে রিমঝিম না বলে বলা যেতে পারে ঝমঝম শব্দ। যেন কোনো কল্পলোকের সূরলহরী সৃষ্টি হয়েছে এই বিষণ্ণ রজনীতে। যেন মেঘেদের রাজ্যেও পৃথিবীর এই শোক গিয়ে হাজির হয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে বিষণ্নতা।
আচ্ছা, রিমঝিম বৃষ্টি আর ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে কি বিশেষ কোনো পার্থক্য আছে? শফিক ভাবতে চেষ্টা করছে। যার একমাত্র শিশুপুত্র কিছুক্ষণ আগে পৃথিবী ছেড়েছে, শূন্য করে দিয়েছে কোল, তার মস্তিষ্ক এ ধরনের তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে ভাবার কথা নয়। শফিক কেন মাথা ঘামাচ্ছে বুঝতে পারছে না। তার মস্তিষ্ক কি তবে শোক ব্যাপারটিকে গ্রহণ করতে এখনও প্রস্তুত নয়? তুচ্ছ ভাবনা দিয়ে ব্যস্ত রাখার এ-ই কি কারণ?
ভাবনার দেয়াল ভেঙ্গে ফেলল শফিক। এই মুহূর্তে অনেকগুলো কাজ তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাকে যেকোনো মূল্যে শক্ত থাকতে হবে। তার স্ত্রী রেবা ঘন ঘন মূর্ছা যাচ্ছে। তাকে সামলাতে হবে। খোকার নিথর, নিস্পন্দ ছোট্ট দেহটি পড়ে আছে বিছানায়। তার দাফনের ব্যবস্থা নিতে হবে। ভোর হবার আরও দেরি আছে। ৪৭ দিন আগে এমন একটি মুহূর্তেই পৃথিবীতে এসেছিল খোকা। তার চলে যাবার মুহূর্তটি কাকতালীয়ভাবে আগমনের মুহূর্তের সাথে মিলে গেছে।
রেবার দিকে তাকিয়ে গভীর মমতা অনুভব করল শফিক। তার স্ত্রীর মাতৃ সত্ত্বাটি জগতের সমস্ত মায়া আর সোহাগ নিয়ে ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হচ্ছিল। কিন্তু তাকে থেমে যেতে হলো অঙ্কুরেই। খোকা ছিল তাদের বহুল আরাধ্যের সন্তান। দীর্ঘ ছয় বছর নিঃসন্তান থাকার পর তার আগমন শফিক-রেবার সংসারে আনন্দের কল্লোলিত আজদাহা ঢেউ প্রবাহিত করে দিয়েছিল। সেদিন যেন দ্বিতীয় জন্ম হয়েছিল রেবার।
শফিক গভীর বিস্ময় নিয়ে লক্ষ্য করেছে- মা হবার আগের রেবা আর পরের রেবার মধ্যে পার্থক্য আকাশ-জমিন। তার চেনা-জানা রেবা সে নয়। খোকা এসে তার পুরো জীবনচিত্র পাল্টে দিয়েছে। তাকে সাজিয়ে-গুজিয়ে তুলেছে মাতৃত্বের প্রগাঢ় আড়ম্বরে। একটি ক্ষীণতর অস্তিত্বধারী মানবসন্তান একজন মায়ের জীবনকে এতটা প্রভাবিত করতে পারে, শফিক আগে তা কখনও খেয়াল করেনি। একটি শিশু হলো স্রষ্টার সৃষ্ট এক আশ্চর্য জীবন্ত পুতুল। এই পুতুল হাসলে বাবা-মা হাসে, কাঁদলে বাবা-মা কাঁদে।
এটির কাছাকাছি ধরনের উক্তি একজন বিখ্যাত লেখক করেছিলেন। লেখকের নাম এই মুহূর্তে শফিকের মনে পড়ছে না। মনে পড়ার কি খুব প্রয়োজন আছে? সে এবার নিজের উপর প্রচন্ড বিরক্ত হলো। শিশুপুত্রের লাশ পড়ে আছে সামনে, স্ত্রী মূর্ছিত; আর সে কী সব ঠুনকো ভাবনা ভাবছে! নিজেকে দ্রুত গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করল শফিক। হাতে সময় বড়ো নেই। আদরের ধনকে চিরদিনের জন্য কবরে রেখে আসার ব্যবস্থা নিতে হবে। দেরি করা ঠিক হবে না। লাশ দাফনে দেরি করতে নিষেধ করেছে ইসলাম।
শফিক এবার খোকার দিকে তাকাল। তার মনে হলো- খোকার হৃৎস্পন্দন স্তিমিত হয়ে গেছে; এই তথ্যটি ভুল, মিথ্যা। এখনও বেঁচে আছে জাদুমনি, দিব্যি ঘুমাচ্ছে। ওর কচি কচি ফর্সা কোমল হাতজোড়া কি একবার নড়ে উঠল? না, সব চোখের ভুল, বিভ্রান্তি। মানুষ কঠিন ডিলিউশনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় চোখের দৃষ্টি কি বিভ্রান্ত হয়? মেডিকেল সায়েন্স কি বলে? শফিক নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। তার শরীর, মন একসঙ্গে ভেঙে পড়তে চাইল যেন!
সকালেও মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। খোকার জন্য খননকৃত ছোট্ট কবরটাতে পানি জমে গেছে। শফিক ছাতা মাথায় ধরে দাঁড়িয়ে আছে পাশে। আনমনা হয়ে কবরের দিকে তাকিয়ে আছে। যে সন্তানকে ওর মা এক মুহূর্তের জন্যও কারও হাতে দিতে চাইত না পড়ে যাবার ভয়ে, সে নিরালায় ঘুমিয়ে থাকবে এই পানিপূর্ণ কবরে! শফিকের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে একটি মহাসত্য যেন আবরণ উঠিয়ে নিলো তার মর্মচক্ষুর সামনে থেকে। তার মনে হলো- পরকালে বিশ্বাস আবারও খোকার সঙ্গে দেখার হবার একটি আশা তার সামনে ঝুলিয়ে রেখেছে, একজন নাস্তিক বাবার সামনে সে আশা নেই।

গল্প ছোটোগল্প
০ টি মন্তব্য      ১২৯ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: