অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৪ জন ভিজিটর

মহান মুজাহিদ ইমাম ইবনে তাইমিয়া...

লিখেছেন জিবরান মঙ্গলবার ০২ অগাস্ট ২০২২

 

জিহাদ ও মুজাহিদদের ফযিলত সম্পর্কিত প্রচুর নস [১] আছে। আর এটাও প্রমাণিত যে জিহাদ হলো বান্দার সকল ঐচ্ছিক (নফল) কর্মসমূহের মধ্যে সর্বত্তম। জিহাদই হল পুর্নাঙ্গ ভালোবাসার প্রমাণ। কারণ প্রেমিক তাই ভালোবাসে যা তার প্রিয়জন ভালোবাসে, আর ঘৃণা করে যা তার প্রিয়জন ঘৃণা করে। সে তাঁর বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করে আবার তাঁর শত্রুর সাথে শত্রুতাও করে। সে যেমন তার প্রিয়জনের সন্তুষ্টির উপর থাকে সন্তুষ্ট, তেমনি তাঁর রাগের সাথে হয় রাগান্বিত। তিনি যা আদেশ করেন সেও তা আদেশ করে, আবার তিনি যা নিষেধ করেন সে তাও নিষেধ করে। [২]


আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের মধ্যকার ভালোবাসা কেমন হওয়া উচিত তাঁর বর্ননা এর চাইতে সুন্দর হতে পারে না। সত্যিকারের প্রেমিক তাঁর প্রিয়জনের চোখেই দুনিয়া দেখতে শুরু করে। তার পছন্দ-অপছন্দের সাথে নিজের পছন্দ-অপছন্দ মিলিয়ে দেয়। প্রিয়ার পছন্দ মতো নিজেকে গোছাতে শুরু করে দেয়। একসময় যে যেন তার মধ্যেই বিলীন হয়ে যায়। হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহ সুবহানা ওয়া তা’আলা বলেন, “…আমার বান্দা সর্বদা নফল ‘ইবাদাত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকবে। এমন কি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্র বানিয়ে নেই যে, আমিই তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমিই তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমিই তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে।…” [৩]


আল্লাহ তা’আলার এই মুক্তোঝড়া কথাগুলো যেন মুমিন আর তাঁর মধ্যকার চুড়ান্ত মিলনকে নির্দেশ করছে। ইমামের মতে আল্লাহর রাহে জিহাদ ছাড়া আর কিছুই এই অবস্থা এতটা কার্যকরীভাবে আনতে সক্ষম নয়। কারণ প্রেমিক যেভাবে সবকিছু ছেড়ে প্রিয়ার কাছে ছুটে আসে তেমনি সত্যিকারের বান্দাই তো আল্লাহর সাথে মিলিত হবার জন্য শাহাদাতের তামান্নায় জিহাদের ময়দানে ছুটে বেড়ায়। আর শাইখুল ইসলাম জিহাদকে সকল নফল ইবাদতের মধ্যে সর্বত্তম বলেছেন। তাহলে চিন্তা করে দেখুন যে ব্যাক্তি সর্বদা এই নফল ইবাদতে রত আছে সে আল্লাহর কতটা নিকটবর্তী হয়ে গেছে?


ইমাম ইবনে তাইমিয়া আরও বলেন, ‘জিহাদের ফযিলত বর্ননা করে এমন নসের সংখ্যা অগনিত। ইসলামের বিদ্বানগণ একমত হয়েছেন যে জিহাদ হজ্জ ও উমরাহ এবং নফল সালাত ও সিয়াম হতেও উত্তম। জিহাদের এতো বেশী ফযিলত হবার কারণ হলো জিহাদকারী নিজে এবং অন্যান্য মানুষজনও এর দুনিয়া ও আখিরাতের উপকারীতা লাভ করে। তাছাড়া এটা প্রকাশ্য ও গোপন সকল প্রকার নেক আমলের সমষ্টিও; যেমন ভালোবাসা, ইখলাস, ঈমান, জীবন ও সম্পত্তির মায়া ত্যাগ, সবর, যুহদ ও বেশী বেশী আল্লাহকে স্মরণ করা ইত্যাদি। জিহাদ ব্যাতিত অন্য কোন কিছুতেই এতো বেশী আমলের সম্মেলন ঘটে না।’ [৪]


এসব কারণেই হয়তো রাসুলুল্লাহ সঃ বলেছেন, “সকল কাজের মূল হলো ইসলাম, স্তম্ভ হলো নামায এবং সর্বোচ্চ শিখর হলো জিহাদ।” [৫]


আল্লাহর রাসুল সঃ কে জিজ্ঞেস করা হলো এমন আমল সম্পর্কে যা জিহাদের সমান হতে পারে। আল্লাহর রাসুল সঃ পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “তুমি কি এতে সক্ষম হবে যে, মুজাহিদ যখন বেরিয়ে যায়, তখন থেকে তুমি মসজিদে প্রবেশ করবে এবং দাঁড়িয়ে ‘ইবাদত করবে এবং আলস্য করবে না, আর সিয়াম পালন করতে থাকবে এবং সিয়াম ভাঙ্গবে না?”
এমনকি তিনি বারবার উপস্থিত লোকদের বলেও দিচ্ছেন যে তারা এমন কাজ করতে পারবে না। [৬]


এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ইমাম ইবনে তাইমিয়া শুধুমাত্র জিহাদের ফযিলত বর্ননা করেই ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি এমন স্বল্প সংখ্যক ইমামদের মধ্যে অন্যতম যিনি নিজেও সশরীরে জিহাদ করেছেন। তার পুরো জীবনে একাধিকবার জিহাদের সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং প্রত্যেকবারই তিনি শত্রুদের বিরুদ্ধে এমনই বীরত্ব দেখিয়েছেন যে তার সাহসীকতা লোকমুখে প্রবাদবাক্যের ন্যায় ছড়িয়ে পড়েছিল।


হাফিয ইমাম বাযযার রহঃ বলেন, শাইখুল ইসলাম মানুষের মাঝে সবচায়ে বাহাদুর, সুদৃঢ় ও শক্তিশালী অন্তরের অধিকারী ছিলেন…যুদ্ধে শত্রুকে তার চেয়ে বেশী অপদস্থ করতে আর কাউকে দেখিনি। তিনি আল্লাহর পথে নিজের অন্তর, জিহ্বা ও হাত দ্বারা জিহাদ করতেন। এতে কোন নিন্দুকের নিন্দাকে মোটেও ভয় করতেন না।


শাইখুল ইসলাম যখন যুদ্ধের ময়দানে ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করতেন তখন পাগড়ীর মাথা থুতনির নীচের দিকে পেচিয়ে নিতেন এবং বড় বীর বাহাদুরের ন্যায় শত্রুর ভেতর প্রবেশ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। তিনি প্রশিক্ষন প্রাপ্ত দক্ষ সৈনিকের ন্যায় ঘোড়ার পিঠে স্থির হতে বসতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে এমন ভীষণ জোরে তিনি ‘আল্লাহু আকবার’ বলে ধ্বনি দিতেন যার ফলে শত্রুদের ওপর বীড় বিক্রমের আক্রমণের চেয়েও বেশী মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসতো। তিনি শত্রুদের মাঝে এমন বাহাদুর ব্যাক্তির মতো প্রবেশ করতেন যার অন্তরে মৃত্যুর ভয় মোটেও নেই। [৭]


শুধুমাত্র জিহাদ এলেই যে শাইখুল ইসলাম তাতে যোগ দিতেন তা কিন্তু নয়। তার সময়ে মুসলিম সমাজ এমনকি তৎকালীন মামলুক সুলতানকে পর্যন্ত জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিলেন তিনি। এর একটি সংক্ষিপ্ত বর্ননা দেয়া যাক।


তাতারীদের বিরুদ্ধে জিহাদে শাইখুল ইসলামের অবদান


তাতার নেতা গাযানের নেতৃত্বে তাতার (মঙ্গোল) সৈন্যের এক বিশাল দল মুসলিম বিশ্বকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। তাতারিরা এর আগ পর্যন্ত অমুসলিম ছিল। কিন্তু ১২৯৫ সালে ক্ষমতায় এসে গাযান তার সৈন্য-সামন্ত নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করার দাবি করে। এই গাযান হলো হুলাকু খান এর নাতির ছেলে, অর্থাৎ হুলাকু খান ছিল তার পরদাদা। যাই হোক, গাযান নিজেকে মুসলিম জাতির অভিভাবক দাবি করে তৎকালীন মামলুক সুলতানকে নিজের বশ্যতা স্বীকার করতে বলে। কিন্তু মামলুক সুলতান তা প্রত্যাখ্যান করলে মাত্র চার বছরের মধ্যে (১২৯৯-১৩০৩) সে সিরিয়াতে তিনবার আক্রমন করে বসে।


তাতারীদের শক্তি সামর্থ্য দেখে মুসলিম সমাজ ও মামলুক সুলতান পর্যন্ত ভয় পেয়ে গিয়েছিল। এদিকে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া তাতারীদের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দিয়ে বসেন। তিনি সকলকে জিহাদের প্রতি ডাকতে থাকেন। কারণ গাযান ও তার দলকে তিনি মুসলিম মনে করতেন না অথবা তাদের খারেজি হিসেবে গন্য করতেন। তিনি মামলুক সুলতান কালাউনের সাথেও কয়েকবার দেখা করে তাকে তাতারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে বলেন।


হাফিয ইবনে কাসির বলেন ইমাম ইবনে তাইমিয়া সুলতানকে এ বলে শাসিয়েছিলেন যে, আপনার যদি সিরিয়ার প্রয়োজন থাকে তবে সিরিয়াবাসীর দুর্দিনে তাদের রক্ষার্থে এগিয়ে আসুন। আর যদি আপনি না আসেন তবে আমরা সিরিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করে নিজেরাই একজন সুলতান নিযুক্ত করবো, যিনি এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা করবেন। [৮]


তিনি সুলতান ও তার বাহিনী ও জনসাধারনকে তাতারীদের বিরুদ্ধে বিজয়ের সুসংবাদ এতোই গ্যারান্টি সহকারে দিচ্ছিলেন যে তাকে বলা হতে লাগলো, ‘আপনি ইনশাআল্লাহ বলুন’। তিনি উত্তরে বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ নিশ্চিতভাবে, সন্দেহমূলকভাবে নয়’।


শুধু সুলতান নয়, শাইখুল ইসলাম সুলতানের সৈন্য ও সিরিয়াবাসীদেরও জিহাদের প্রতি প্রচণ্ড উৎসাহী করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি কুরআনের আয়াত, হাদিস, রাসুলের সীরাহ ও সিরিয়াবাসীদের ইতিহাস বর্ননা করে লোকদের মনোবল শক্তিশালী করে তুলছিলেন।


তাতারীরা যেহেতু নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করছিল তাই বহু মুসলিম তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে ইততস্থবোধও করছিল। কিন্তু শাইখুল ইসলাম তাদের এই বলে বোঝালেন যে, ‘তোমরা এমনকি যদি আমাকেও তাতারীদের কাতারে দেখতে পাও এবং আমার মাথায় যদি কুরআনও থাকে তবুও আমাকে হত্যা করে ফেলবে’। ইবনে তাইমিয়ার কথা শুনে জনসাধারনেরা সম্বিত ফিরে পেয়েছিল।


যুদ্ধে শাইখুল ইসলাম ও মুসলিমরা সাহসীকতা, বিশ্বাস আর ইয়াকিনের সাথে লড়াই করে তাতারীদের ভয়ানকভাবে কচুকাটা করেছিলেন। এমনকি দেখা যায় সকাল বেলা তাতারদের রশি বেঁধে এক এক করে গর্দান উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তাতারীদের হাতে লাখো মুসলিম হত্যার প্রতিশোধে এটা সত্যিকার অর্থে খুব কমই ছিল।
---
১। নস হলো একটি আরবি শব্দ। কুরআন, হাদিস, সাহাবা কিংবা সালাফদের বক্তব্য বোঝাতে এক কোথায় নস শব্দটি প্রয়োগ করা হয়।
২। মাজমু’ ফাতাওয়া, 10/57-58
৩। সহিহ বুখারি, ৬৫০২
৪। Ibn Taymiyyah Expounds on Islam, pg. 611
৫। সুনানে তিরমিযী, ২৬১৬
৬। সহিহ বুখারি ২৭৮৫; সহিহ মুসলিম, ৪৭৬৩
৭। আলিয়্যাহ ফি মানাকিব ইবনে তাইমিয়াহ, পৃষ্ঠা ৬৭-৬৮
৮। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৫:৬৩৪


ইমাম ইবনে তাইমিয়া ইমাম মহান মুজাহিদ
০ টি মন্তব্য      ১৮৯ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: