অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৩ জন ভিজিটর

আমার আম্মা আমার মুর্শিদ......

লিখেছেন লাবিব আহসান বৃহস্পতিবার ২১ জুলাই ২০২২
বুঝতে শেখার পর থেকেই আম্মাকে একজন প্রবল ব্যক্তিত্বশালীনী নারী হিসেবে দেখে এসেছি। আমাদের পরিবারের পুরুষ আত্মীয়-স্বজন, যারা সম্পর্কে আম্মার গায়রে মাহরেম; তারা তাঁকে অত্যন্ত সমীহ করে চলতেন। আত্মীয়তার সুবাদে কুশল বিনিময়ের প্রয়োজনে আম্মা যখন পর্দার অন্তরাল থেকে তাদের সঙ্গে কথা বলতেন, তখন তারা প্রতিটি কথা বলতেন মেপে মেপে হিসেব করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। তাদের কথায় মিশে থাকত প্রগাঢ় শ্রদ্ধা।
 
এর অর্থ কিছুতেই এই নয়- আম্মা কঠোর প্রকৃতির মহিলা ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমলপ্রাণ সরলা প্রকৃতির নারী। কিন্তু গায়রে মাহরেম আত্মীয়দের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের সময় তাঁর এমন ইস্পাতদৃঢ় ব্যক্তিত্ব স্বতস্ফূর্তভাবেই প্রতিভাত হয়ে উঠত। এর ফলে সেই পুরুষ আত্মীয়রা সম্মুখে তো নয়-ই, আড়ালেও তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করার সাহস করে উঠতেন না। তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে নিয়ে কোথাও আলোচনা উঠলেও শ্রদ্ধায় বিগলিত হতেন সবাই।
 
পর্দার বয়স হবার পর থেকেই আম্মা তাঁর কাজিন; বিশেষত চাচাতো, মামাতো, খালাতো, ফুফাতো ভাইদের সঙ্গেও দেখা করা থেকে বিরত থাকতেন। অথচ তাঁর এই পূর্ণাঙ্গ পর্দা মেনে চলার অভ্যাস আত্মীয়-স্বজনের হক্ব আদায়ের প্রশ্নে নূন্যতম বাঁধা হয়ে দাঁড়াত না। তারা কেউ বাড়িতে এলে মেহমানদারিতে কোনো ঘাটতি হত না। আম্মার পর্দার ব্যাপারে তাদের কোনো অভিযোগ তো থাকতোই না বরং সেখানে জায়গা করে নিতো শ্রদ্ধা আর সমীহ। এ সম্ভবত আল্লাহর বিধান মেনে চলারই একটি পুরষ্কার।
 
বিয়ের পর যখন আম্মা তাঁর শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ আমার দাদাবাড়িতে চলে এলেন, তখনও সেখানে পূর্ণাঙ্গ পর্দার প্রচলন গড়ে ওঠেনি। এমনকি গ্রামের মহিলারাও পর্দার এই পূর্ণাঙ্গ রূপটি সম্পর্কে একপ্রকার অন্ধকারেই ছিলেন। বলা যায়- আম্মাই প্রথম আমার দাদাবাড়িতে এবং গ্রামে পূর্ণাঙ্গ পর্দার গোড়াপত্তন করেন। সবাই বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করে- পর্দা একজন নারীকে জগত-সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় না, আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে উদাস করে তোলে না বরং তা মেনেও এসব দায়িত্ব পালন করা যায়।
 
আমার দাদাবাড়ি এবং আমাদের গ্রামে নারী-পুরুষের অবাধ গল্প-গুজব, হাসি-তামাশাকে খুব ঋণাত্মক দৃষ্টিতে দেখা হত না। দেশের আর সব অঞ্চলের মতোই দেবর-ভাবীর ঠাট্টা-মশকরা, শালী-দুলাভাইয়ের দুষ্টুমিকে দেখা হত ভীষণ স্বাভাবিক একটি ব্যাপার হিসেবে। যেন এটাই সৌন্দর্য্য! আম্মা সেখানে এক ব্যতিক্রমী প্রতিমূর্তিতে আবির্ভূত হলেন। কাজেই যে পুরুষরা বাড়ির অন্যান্য মহিলাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে গল্প-গুজব, হাসি-তামাশা করে যেত, তারা আম্মার অবস্থানস্থলের ছায়া মাড়ানোরও হিম্মত করে উঠত না।
 
ছোটোবেলা থেকে আম্মার প্রবল ব্যক্তিত্বশালীনী জীবনযাপন পদ্ধতি দেখে নারীদের ব্যাপারে এমন একটি ধারণা নিয়েই আমি বেড়ে উঠলাম। আমার কল্পনায় নারীত্বের যে ছবিটি আঁকা হয়ে রইল, তা হলো তার প্রবল পরাক্রমশালীনী ব্যক্তিত্ব, প্রগাঢ় আত্মমর্যাদাবোধ। আমার কাছে তখন নারী মানেই যার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে বাইরের যে কোনো পুরুষ ঠকঠক করে কাঁপবে। নারী মানেই পর্দাবৃত এমন এক প্রতিমূর্তি, যার সামনে দাঁড়িয়ে পুরুষ তার অজান্তেই মাথা নিচু করে ফেলবে।
 
কিন্তু যখন একটু বড়ো হলাম, চিনতে শুরু করলাম বাইরের বিশাল পৃথিবী, তখন আমার কল্পনার সেই নারীরূপটি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম- নারীত্বের মর্যাদাকে অবলীলায় ধুলায় লুটিয়ে দিতে নারীরাই যেন প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। পুরুষদের কাছে নিজেদের করে তুলেছে সহজলভ্য। ব্যক্তিত্বের দৌর্বল্য, আত্মমর্যাদাবোধের সংকট নারীদের সৌকর্যের সিংহাসন থেকে নামিয়ে নিয়ে এসেছে পুরুষের পদতলে। গল্প-গুজব, হাসি-তামাশার মাধ্যমে লম্পট পুরুষরা নারীদের গড়িয়ে নিচ্ছে এক নিকষ অন্ধকারের দিকে।
 
অসাধু পুরুষরা সেই নারীদের কাছে গিয়েই সুযোগ নিতে চেষ্টা করে, যাদের ব্যক্তিত্ব দুর্বল। যাদের ব্যক্তিত্বের দেয়াল দুর্ভেদ্য নয়, লম্পট পুরুষরা অনায়াসেই পেরিয়ে যায় সে দেয়াল। একজন প্রবল পরাক্রমশালীনী আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্না নারীর কাছে গিয়ে কোনো পুরুষ হাসি-তামাশার মাধ্যমে সুযোগ নিতে চেষ্টা করবে; এমন ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। এখানে কৃতিত্ব কিংবা ব্যর্থতার অনেকাংশই বর্তায় নারীর কাঁধে; তিনি কীভাবে তাঁর ব্যক্তিত্বকে উপস্থাপন করছেন। একজন পুরুষ সুযোগ পাবে কিনা, তা নির্ভর করছে- একজন নারী সুযোগ দিবেন কিনা, তার উপর।
 
বনু মুস্তালিকের যুদ্ধে উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রা.) ভুলক্রমে কাফেলা থেকে পিছিয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে ছেড়েই অনেক দূর চলে গিয়েছিল রাসূল (সা.) এর নেতৃত্বাধীন মূল কাফেলা। পিছনে কিছু ছাড়া পড়ল কিনা, তা খুঁজে নিয়ে আসার দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল সাফওয়ান বিন মুয়াত্তাল (রা.) এর উপর। তিনি সে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন- স্বয়ং উম্মুল মু’মিনীন ছাড়া পড়েছেন! এরপরের অনেকটা পথ কেবল দুজন মিলেই পাড়ি দিতে হলো। অথচ কেউ কারও দিকে তাকালেন না; এমনকি কথাও বললেন না। এখানে কৃতিত্ব কি কেবল সাফওয়ান (রা.) এর? আয়েশা (রা.) এর প্রবল ব্যক্তিত্ব কি এখানে ভূমিকা রাখেনি?
 
আম্মা তাঁর জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামকে মেনে চলার ব্যাপারে পর্দার মতোই আপোষহীন ছিলেন। আমাদেরকেও সারাজীবন সে শিক্ষাই দিয়ে গেছেন। মাত্র ৩৮ বছরের জীবন পেয়েছিলেন। আজ থেকে ৯ বছর আগের এই দিনে পৃথিবী ছেড়েছেন তিনি। অথচ আজও প্রতি মুহূর্তে আমি আম্মার উপস্থিতি টের পাই। আম্মা সারাক্ষণ আমার অস্থিত্বজুড়ে থাকেন। আমার নামাজের প্রতিটি দোয়া, প্রতিটি সূরা, প্রতিটি তাসবীহ তাঁর শেখানো। প্রতি ওয়াক্ত, প্রতি রাকাত নামাজে আম্মা আমার সাথে মিশে থাকেন। মসজিদ থেকে বেরিয়ে আমি বিহ্বল চোখে তাকাই উদার আকাশের বুকে। ঐ যে মিটিমিটি করে জ্বলছে তারাটা, ওটাই কি আমার আম্মা?

আম্মার স্মৃতি
০ টি মন্তব্য      ১৩০ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: