অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৪২ জন ভিজিটর

জীবনানন্দের জীবন থেকে...(২য় অংশ)

লিখেছেন লাবিব আহসান বুধবার ২০ জুলাই ২০২২
বয়সের হিসেবে জীবনানন্দ দাশ নজরুলের ঠিক ছিয়ানব্বই দিনের বয়োজেষ্ঠ্য। দুজন বেড়ে উঠেছেন দুই বাংলায়; একজন পশ্চিমে, অন্যজন পূর্বে। দুজনের ধর্মও দুই; একজন মুসলমান, অন্যজন ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী। দুজনের বেড়ে ওঠার চালচিত্রেও খুঁজে পাওয়া যায় বৈচিত্র্য। একজন বেড়ে উঠেছেন পরিবারছুট হয়ে এখানে-ওখানে অবহেলা-অনাদরে। অন্যজনের বেড়ে ওঠা সেই হাঁসছানার মতো করে, যে সারাক্ষণ তার মায়ের পিছু পিছু ঘুরে বেড়ায় বাধ্য ছেলে হয়ে।
স্বভাব-বৈশিষ্ট্যেও দুজন দুই মেরুর। নজরুল চঞ্চল, অস্থির এবং ভীষণ রকম বহির্মুখী স্বভাবের। অন্যদিকে, জীবনানন্দ শান্তু, চুপচাপ এবং মুখচোরা ধরনের মানুষ। দুজনের মধ্যে বড়ো পার্থক্যটি তৈরি হয় তাঁদের লেখনীর ঢঙে। একজন ভেঙ্গে ছারখার করার প্রয়াসে লিখে যান হরদম, অন্যজন নিরালম্বভাবে কবিতায় নির্মাণ করে চলেন প্রকৃতির শৈলী। আরও একটি ব্যবধান আছে দুজনের। নজরুল যে সময়ে কবিতা লিখে জেল খাটছেন, কাঁপিয়ে দিচ্ছেন ব্রিটিশ শাসনের ভিত, হয়ে উঠেছেন তারকা লেখক, তখন অবধি জীবনানন্দের নাম মানুষ জানেই না!
বিংশ শতাব্দীর বিস্ময়কর এক চরিত্র জীবনানন্দ দাশ। জন্মের বছরেই আক্রান্ত হলেন ভয়ঙ্কর জুভেনাইল জন্ডিসে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিলেন বায়ু পরিবর্তনের জন্য। যেতে হবে সুদূর দিল্লী, আগ্রা, দার্জিলিং। নিম্নমধ্যবৃত্ত বাবা-মায়ের পক্ষে এ বড়ো দুশ্চিন্তার ব্যাপার। অনেকে পরামর্শ দিলেন হাল ছেড়ে দেবার; এক সন্তান গেলে আরও সন্তানের জন্ম হবে। কিন্তু মা কুসুমকুমারী দাশ কারও কথা শুনলেন না। তিনি কষ্টে-শিষ্টে টাকা জোগাড় করে আদরের ধনকে নিয়ে চললেন দিল্লী।
এই মা একদিন কবিতা লিখেছিলেন- ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হবে?’ হয়তো তিনি ততদিনে স্বপ্ন বুনে ফেলেছিলেন- তাঁর এই ছেলে একদিন সত্যি সত্যিই কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হবে। তিনি যখন সন্তানকে কোলে নিয়ে এই স্বপ্নটি বুনছিলেন, তখন একটি শতাব্দী ঘাট ছাড়ছে আর এগিয়ে আসছে নতুন এক শতাব্দী। কোনো লুপ্ত নক্ষত্রের মতো হয়তো শিশু বয়সেই হারিয়ে যেতেন জীবনানন্দ। কিন্তু কুসুমকুমারী দাশ তাঁকে হাজির রাখলেন বিংশ শতাব্দীর তীক্ষ্ণ, তীব্র সব বিস্ময়ের মুখোমুখি করবার জন্যে।
জীবনানন্দের মা কুসুমকুমারী জানলেন না- তাঁর এই ছেলে জগতের যাবতীয় অনাদর, অবহেলা, উপেক্ষা, ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে তাঁর পঞ্চান্ন বছরের নাতিদীর্ঘ জীবনটি শেষ করবে ট্রামের নিচে চাপা পড়ে। তাঁর জীবনের দুর্দশার সূচনা হলো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাশ করার পরপরই। কোথাও চাকরি হয় না। কিছুদিন বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতার সুযোগ পেলেও কোনোটাই স্থায়ী হলো না। পকেটের নিদারুণ টানাপোড়েন। খাবারের সংকট। তাঁর মেসের জানালা দিয়ে পাশের বাসার একটি টেবিল দেখা যায়। সেই টেবিলে সাজানো খাবার দেখে দেখে লিখতে থাকেন গল্প, উপন্যাস, কবিতা। আহারে!
এই তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে যুক্ত হলো জীবনের আরেক সংকট। যে নারীকে বিয়ে করলেন, সে নারীর সঙ্গে তাঁর মনের ব্যবধান যোজন যোজন। ফলে দাম্পত্য জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য মুখ থুবড়ে পড়ল। জাগতিক নানাবিধ সংকটে আপতিত হয়ে তিনি আশ্রয় নিলেন লেখালেখির। সংকট ছিল আরও একটি। যুবক বয়স থেকে পছন্দ করতেন তাঁর দুঃসম্পর্কের এক কাকাতো বোনকে; নাম শোভনা। একদিন এসে আবিষ্কার করলেন- শোভনার হৃদয়ের ধারেকাছেও তাঁর জন্য কোনো জায়গা গড়ে ওঠেনি। কেবল তিনি ভালোবেসে গেছেন একা একা।
জীবনানন্দ যখন দাম্পত্য আর কর্মজীবনের নিদারুণ ব্যর্থতার ঘানি টানছেন, হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরছেন একটা চাকরি, তখন প্রকৌশলী পাত্রের সাথে শোভনার বিয়ে হচ্ছিল অত্যন্ত ধুমধামে। জীবনানন্দের জীবনে যখন কালো অন্ধকার, শোভনার বিয়ের মঞ্চ তখন নানান আলোকসজ্জায় সজ্জিত। তার পাত্রের নাম ইঞ্জিনিয়ার সুহৃদ মজুমদার। শোভনার তখনও জানবার কথা নয়- সময়ের অবিশ্রান্ত পথচলায় একদিন মুছে যাবে ‘ইঞ্জিনিয়ার সুহৃদ মজুমদার’ নামটি আর পৃথিবীর কোটি পাঠক-পাঠিকা মানসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে একটি নাম- ‘জীবনানন্দ দাশ।’
প্রেম, সংসার সবকিছু তখন তাঁর হাতছাড়া। প্রবল আশাহীনতায় মানুষ খড়কুটো ধরে বাঁচতে চেষ্টা করে। জীবনানন্দ লেখালেখিকে ধরে বাঁচতে চাইলেন। কিন্তু আফসোস! তিনি চেয়ে চেয়ে দেখলেন- যে লেখালেখির জন্য সবকিছুকে বাজি ধরেছেন, সেই লেখালেখির জগতেও তাঁর কোনো স্থান নেই। সমসাময়িক লেখকদের প্রায় সবাই তাঁকে অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্যে জর্জরিত করতে লাগল। যে নজরুল ছিলেন তাঁর অন্যতম সমসাময়িক, তিনি তখন খ্যাতির শীর্ষে। একদিন তাঁর সামনে জীবনানন্দের আলাপ তোলা হলো, তিনি ভ্রুক্ষেপই করলেন না।
আর রবীন্দ্রনাথ? তিরিশের দশকের সেই গোড়ার দিকে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভ্রমণ করে বেড়াচ্ছেন। রাজকীয় অতিথি হিসেবে ফ্রান্স থেকে ইতালি হয়ে জার্মানী, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন। সর্বত্র তাঁর লালগালিচা সংবর্ধনা হচ্ছে। বিভিন্ন বড়ো বড়ো অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন। জীবনানন্দ দাশ তখন বেকারত্বের দগ্ধতার যন্ত্রণা বুকে নিয়ে মেসের বিছানার ছাড়পোকা মারছেন। রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের কেউই তখনও জানেন না- এই অবহেলিত, অখ্যাত কবির নাম একদিন তাঁদের সমান্তরালে উচ্চারিত হবে।
জীবনানন্দ দাশের জীবনের যে দিকটা আমাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে, তা হলো- লেগে থাকার অধ্যবসায়। চাকরি জীবনে ব্যর্থতা, বেকারত্বের দগ্ধতা, পছন্দের মানুষের প্রত্যাখ্যান, দাম্পত্য জীবনে অশান্তি, সাহিত্য জগতের তাচ্ছিল্য; কোনোকিছুতেই তিনি তাঁর প্যাশনকে ছেড়ে দেন নি। এমনকি সেই সময়ের পাঠকরা তাঁর কবিতাকে ‘দুর্বোধ্য’ আখ্যা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলেছিল। কিন্তু তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন- একটা সময় অবশ্যই আসবে, যখন তাঁর লেখা মানুষ প্রবল আদরে ধুলি থেকে বুকে তুলে নিবে। এখানেই জীবনানন্দের অনন্যতা।
 
তথ্যসূত্র:
১. হৃদয়ের শব্দহীন জ্যোৎস্নার ভিতর- বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
২. বিক্ষিপ্ত অর্ধশতক- অশোক মিত্র।
৩. জীবনানন্দ ও তার কাল- হরিশংকর জলদাস।
৪. একজন কমলালেবু- শাহাদুজ্জামান।
 
 
 

জীবনানন্দ দাশ সাহিত্য
০ টি মন্তব্য      ৯৩ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: