অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৩ জন ভিজিটর

হাল না ছাড়ার গল্প......

লিখেছেন লাবিব আহসান মঙ্গলবার ১৯ জুলাই ২০২২
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির ক্লাসরুম। যিনি ক্লাস নিচ্ছেন, তার নাম মার্ক গর্ডন। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের প্রবাদতুল্য শিক্ষক। সমগ্র ক্লাস মিলিয়ে সর্বসাকুল্যে ১৫ জন ছাত্র-ছাত্রী। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পিএইচডি করতে এসেছে। মার্ক গর্ডন একে একে সকলের নাম-ধাম জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন। সবাই বসে বসেই নিজেদের পরিচয় দিলো।
কেবল একজন ছাত্র পরিচয় দেয়ার সময় দাঁড়িয়ে গেল। মার্ক জিজ্ঞেস করলেন- ‘তুমি দাঁড়িয়ে কথা বলছ কেন? বসে কথা বলতে কি তোমার অসুবিধা হয়?’ পরিচয় দেয়ার সময় দাঁড়িয়ে যাওয়া সেই একমাত্র ছাত্রটি ছিল বাংলাদেশী। তাঁর নাম হুমায়ূন আহমেদ। পরবর্তী সময়ে বাংলা কথাসাহিত্যের বাঁকবদল তাঁর হাত ধরেই ঘটবে; ইতিহাস তখনও তা জানে না।
মার্ক গর্ডন ক্লাস নিতে শুরু করলেন। ক্লাসে একটা ঝড় বয়ে গেল। শেষে বললেন- ‘আজ সহজ ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনা করলাম। প্রথম ক্লাস তো, তাই!’ হুমায়ূন আহমেদ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন- ‘বলে কী এই লোক!’ তিনি ক্লাসের কিচ্ছু বুঝতে পারেন নি। মার্ক গর্ডন ক্লাসে যে গ্রুপ থিউরি ব্যবহার করেছেন, তিনি সে সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করার জন্য পাশের ছাত্রটিকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘তুমি কি কিছু বুঝতে পারলে?’ সে বিস্মিত হয়ে জবাব দিলো- ‘বুঝব না কেন? এসব তো খুবই এলিমেন্টারি ব্যাপার!’ হুমায়ূন আহমেদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। তিনি নিয়মিত ক্লাসে যান। হা করে মার্ক গর্ডনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিছুই মাথায় ঢোকে না। সবকিছু মাথার উপর দিয়ে চলে যায়।
দিন দিন পরিস্থিতি জটিল হতে থাকল। আত্মবিশ্বাস নেমে এলো শূন্যের কোঠায়। তিনি একগাদা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বই জোগাড় করলেন। পড়তে লাগলেন দিন-রাত। কাজের কাজ কিছুই হয় না। তাঁর ইনসমনিয়া হয়ে গেল। চোখ থেকে ঘুম হয়ে গেল উধাও। হোটেল গ্রেভার ইনের লবিতে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকেন। আর মনে মনে বলেন- ‘সর্বনাশ!’
মিড-টার্ম পরীক্ষা এসে গেল। সব মিলিয়ে ১০ টি প্রশ্ন। প্রতিটির উত্তর করতে হবে। হুমায়ূন আহমেদ দেখলেন- তিনি মাত্র একটি প্রশ্নের অংশবিশেষের উত্তর জানেন। কাজেই খাতায় কিছু না লিখে মাথা নিচু করে বসে রইলেন। এক ঘন্টা পর সাদা খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে এলেন পরীক্ষার হল থেকে। পরদিনই রেজাল্ট হলো। দেখা গেল- সবচেয়ে বেশি নাম্বার পেয়েছে এক অন্ধ ছাত্র। আর বাংলাদেশের হুমায়ূন আহমেদ পেয়েছেন শূন্য।
মার্ক গর্ডন তাঁকে ডেকে পাঠালেন। সেসময় মার্কের সঙ্গে তাঁর যে কথোপকথন হলো, তা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। পৃথিবীর যে কোনো দেশের যে কোনো ভগ্নহৃদয় মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেষণা হবে এই কথোপকথনটি। মার্ক গর্ডন বিস্মিত কণ্ঠে বললেন-
‘তোমার ঘটনা কি বল তো?’
‘কোয়ান্টাম মেকানিক্সে আমার কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না। এই হায়ার লেভেলের কোর্স আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘বুঝতে পারছ না, তাহলে ছেড়ে দিচ্ছ না কেন? ঝুলে থাকার মানে কী?’
‘আমি ছাড়তে চাই না।’
‘তুমি বোকামি করছ। তোমার গ্রেড যদি খারাপ হয়, যদি গড় গ্রেড সি চলে আসে, তাহলে তোমাকে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যেতে হবে। গ্র্যাজুয়েট কোর্সের এ-ই নিয়ম।’
‘এই নিয়ম আমি জানি।‘
‘জেনেও তুমি এই কোর্সটা চালিয়ে যাবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘তুমি খুবই নির্বোধের মতো কথা বলছ।’
‘হয়ত বলছি। কিন্তু আমি কোর্সটা ছাড়ব না।’
‘কারণটা বল।’
‘একজন অন্ধ ছাত্র যদি এই কোর্সে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেতে পারে, আমি পারব না কেন? আমার তো চোখ আছে।’
‘তুমি আবারও নির্বোধের মতো কথা বলছ। সে অন্ধ হতে পারে কিন্তু তার এই বিষয়ে চমৎকার ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। সে আগের কোর্স সবগুলো করেছে। তুমি কর নি। তুমি আমার উপদেশ শোন। এই কোর্স ছেড়ে দাও।’
তিনি জোর দিয়ে বললেন-
‘না, আমি ছাড়ব না।’
হুমায়ূন আহমেদ সত্যি সত্যিই কোর্সটি ছাড়লেন না। নিজে নিজে অঙ্ক শিখলেন, গ্রুপ থিওরি শিখলেন, অপারেটর অ্যালজেব্রা শিখলেন। একসময় অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন- কোয়ান্টাম মেকানিক্স তিনি বুঝতে শুরু করেছেন। তাঁর উপলব্ধি হলো- ‘মানুষের অসাধ্য কিছু নেই’; এই প্রবাদটি সম্ভবত ভুল নয়। ফাইনাল পরীক্ষায় বসলেন। এবার তিনি জানেন- তাঁকে আটকানোর কোনো পথ নেই। রেজাল্টে দেখা গেল- তিনি ১০০ তে ১০০ পেয়েছেন।
এই একটি মাত্র পরীক্ষা দিয়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচিত হয়ে গেলেন হুমায়ূন আহমেদ। রেজাল্টের পর মার্ক গর্ডন তাঁকে একটি চিঠি লিখে মেইল বক্সে রেখে দিলেন। টাইপ করা একটি চিঠি। তাতে লেখা ছিল- ‘তুমি যদি আমার সঙ্গে থিওরিটিক্যাল কেমিস্ট্রিতে কাজ কর, তাহলে আমি আনন্দিত হব।’ সেই মার্ক গর্ডন, যিনি একদিন তাঁকে কোর্সটি ছেড়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। হুমায়ূন আহমেদ সেদিন হাল ছেড়ে দিলে এই সুন্দর দিনটি তাঁর জীবনে কি কখনও আসতো?

হুমায়ূন আহমেদ কথাসাহিত্যিক হোটেল গ্রেভার ইন ১০০ তে শূন্য পেলাম
০ টি মন্তব্য      ১৫৬ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: