অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৩৬ জন ভিজিটর

যিলহজ্ব মাস: একটি সম্মানিত ও মহিমান্বিত মাস...

লিখেছেন জিবরান মঙ্গলবার ০৫ জুলাই ২০২২
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন-বিধান! জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন মুমিন তার জীবন পরিচালনা কীভাবে করবেন, তা বলে দিয়েছেন ইসলাম। প্রতিটি সেক্টরে আপনি ইসলাম অনুযায়ী পরিচালনা করতে পারবেন। দিনক্ষণও ঠিক করে দিয়েছেন ইসলাম! আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মাস, তারিখ গণনার একটি নেযাম তৈরি করে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আছে,
“ নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গননায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।” [সূরা তাওবাহ ৩৬]
আল্লাহ প্রদত্ত মাস হলো বারোটি। মাসের দিনক্ষণও আল্লাহ প্রদত্ত! এই মাস ঊনত্রিশে হবে নাকি ত্রিশে হবে— ঠিক করে দেন আল্লাহ তা’আলা! এখানে মানুষের কোন দখল নেই। মাস শেষ হলেই আল্লাহ তা’আলা চাঁদের মাধ্যমে জানিয়ে দিবেন। নতুন চাঁদ উদয় হলেই নতুন মাসের গণনা শুরু। এই বারো মাস থেকে চারটি মাসকে করেছেন সম্মানিত ও মহামান্বিত। তার বিশেষ কারণও রয়েছে। হাদিসে আছে,
“আল্লাহ যেদিন আসমান যমীন সৃষ্টি করেন, সেদিন যেভাবে যামানা ছিল তা আজও তেমনি আছে। বারমাসে এক বছর, তার মধ্যে চার মাস সম্মানিত। যার তিন মাস ধারাবাহিক যথা যিলকক, যিলহজ্ব ও মুহাররম আরেকটি হল রজব মাস যেটি জামাদিউস সানী ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী।”[ সহিহ বুখারী- ৪৬৬২]
সম্মানিত মাসসমূহের মধ্যে রয়েছে যিলহজ্ব মাস! আজকে আলোচনা করবো এই মাস নিয়ে। হাদিসে আছে, সাবধান! তোমাদের এই মাস (যিলহজ্ব) সর্বাপেক্ষা উত্তম (সম্মানিত)। [ইবনে মাজাহ ৩৯৩১] এই মাস কেন সম্মানিত? এই মাসে কী এমন গুরুত্বপূর্ণ দিন বা আমল রয়েছে, যার জন্য সম্মানিত মাসগুলোর মধ্যে অন্যতম? সব তুলে ধরা হবে ইন শা আল্লাহ!
ইব্রাহিমী উদ্দীপনায় উজ্জীবিত হওয়ার মাস :
ইব্রাহিম আ.-র ত্যাগ তিতিক্ষার কথা অজানা নয় কারোর! একমাত্র আল্লাহর জন্যই ছিলো ভালোবাসা, আল্লাহর জন্যই ছিলো শত্রুতা। সবকিছুর উপরে ছিলেন আল্লাহর মোহাব্বত। আল্লাহর হুকুমকে মান্য করতে গিয়ে নিজের মোহাব্বতের ছেলে ইসমাইল আ.-কে কুরবানি দিতে দ্বিধাবোধ করেন নি। জনবিচ্ছিন্ন মরুভূমিতে আদুরের স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে আসতে কোন দ্বিধা করেন নি। এটা মূলত ছিলো আল্লাহর পরিক্ষা!
পবিত্র কুরআনে এরশাদ ফরমান, অতঃপর সে যখন পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহীম তাকে বলল, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি? সে বলল, পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন! আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে সবরকারী পাবেন!
যখন পিতা-পুত্র উভয়েই আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহীম তাকে যবেহ করার জন্যে শায়িত করল। তখন আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে! আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে দিলাম যবেহ করার জন্যে এক মহান জন্তু। [সূরা সাফফাত ১০২-১০৭]
আমরা যে কুরবানি করে আসছি, করছি— এটা ইব্রাহিম আ.-র সুন্নত! আমাদের নিবিজি আসার পরে পূর্বের শরীয়ত রহিত হয়ে গেছে যা আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন তা ছাড়া। এই যে কুরবানি, এটা ইব্রাহিম আ.-র সুন্নাত। আমরা আল্লাহর নির্দেশে এই সুন্নাতকে পালন করি, যাতে ইব্রাহিম আ.-র চেতনায় চেতনাপ্রাপ্ত হই!
নিজেকে রবের নিকট সমর্পণ করে দেওয়ার মাস :
শাহী বালাখানা ছেড়ে, দামী কাপড়চোপড় ফেলে দুটি কাপড় মুড়িয়ে পাগলের মতো ছুটে চলে হাজিরা! তাদের দেখে মনে হয়, তারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন একটি জাতি, দুনিয়ায় হালত সম্পর্কে তারা অবগত নয়, তারা আল্লাহ ছাড়া যেন কিছুই বুঝে না। তাদের তন যদিও বা পৃথিবীতে, মন পৃথিবীতে থাকে না— সাত আসমান পাড়ি দিয়ে আরশে আজীমে! তাদের তৃষ্ণা যেন হাজরে আসওয়াদ। একমাত্র তাদের তৃষ্ণা মেটাতে পারবে হাজরে আসওয়াদের চুমু। সবার মুখে মুখে তালবিয়াহ, লাব্বাইকি সূর।
‘ আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির! আমি হাজির, আপনার কোন শরিক নেই, আমি হাজির! নিশ্চয় সকল প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব আপনারই। আপনার কোন শরিক নেই। (তালবিয়াহ-র অর্থ) সবার মুখে মুখে যখন লাব্বাইকের ধ্বনি মোবাইলে কিংবা টেলিভিশনে শুনি, নিজেকে ধরে রাখা যাই না।
সম্মানিত প্রথম দশক :
এই মাসে রয়েছে এমন দশটি দিন, যে দশকের রজনীর কসম খেয়েছেন আল্লাহ তা’আলা। সুতরাং এই দিবসগুলোকে কে অন্য দিবসের মতো মনে করলে মারাত্মক ভুল করবেন। পবিত্র কুরআনে আছে, “শপথ ফযরের, শপথ দশ রাত্রির!” [সূরা ফাযর ১-২]
এই মাসের প্রথম দশ দিন অতিসম্মানিত ও মহামান্বিত! এই মাসের প্রথম দশ দিনের আমলের সমতুল্য কোন আমল নেই। এমনকি জিহাদও। হাদিসে আছে, যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অন্য কোন দিনের আমল উত্তম নয়। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, জিহাদও কি (উত্তম) নয়? নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, জিহাদও নয়। তবে সে ব্যক্তির কথা ছাড়া যে নিজের জান ও মালের ঝুঁকি নিয়েও জিহাদে যায় এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না। [সহিহ মুসলিম- ৯৬৯]
এই মাসে রয়েছে ইয়াওমে আরফাহ :
এটি একটি মহামান্বিত দিন। এই দিনে আল্লাহ তা’আলা অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। হাদিসে আছে, আরাফার দিনের মতো আর কোন দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার নিকটবর্তী হন এবং বান্দাদের নিয়ে ফিরিশতাদের সাথে গর্ব করেন। আল্লাহ বলেন, কী চায় তারা? [সহীহ মুসলিম হাদীস ১৩৪৮]
এই দিনে নবিজি সা. এবং নবীগণ যে দুয়া করতেন, হাদিসে তা উল্লেখ আছে। আরাফাতের দিনের দু’আই উত্তম দু’আ। আমি ও আমার আগের নাবীগণ যা বলেছিলেন তার মধ্যে সর্বোত্তম কথা। অর্থ “আল্লাহ ছাড়া কোন মাবূদ নেই। তিনি এক, তাঁর কোন অংশীদার নেই, সার্বভৌমত্ব তারই এবং সমস্ত কিছুর উপর তিনি সর্বশক্তিমান”। [তিরমিযি ৩৫৮৫]
এই দিনে দিয়েছিলেন দ্বীন পরিপূর্ণ করার ঘোষণা। আল্লাহ তা’আলা বলেন, আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [সূরা মায়িদাহ ০৩]
এই আয়াতকে উদ্দেশ্য করে এক ইহুদি উমর রা.কে বলেন, হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনাদের কিতাবে একটি আয়াত আছে, যা আপনারা পাঠ করে থাকেন, তা যদি আমাদের ইয়াহূদী জাতির উপর অবতীর্ণ হত, তবে অবশ্যই আমরা সে দিনকে খুশীর দিন হিসেবে পালন করতাম। তিনি বললেন, কোন আয়াত? সে বলল, (অর্থ) “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম”।
উমার রা. বললেন, এটি যে দিনে এবং যে স্থানে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল তা আমরা জানি; তিনি সেদিন ‘আরাফায় দাঁড়িয়েছিলেন আর সেটা ছিল জুমু‘আহ্‌র দিন। [সহিহ বুখারি ৪৫]
হজ্ব ও কুরবানি :
ইসলামের ভিত্তি হলো পাঁচটি। সেই ভিত্তিগুলোর একটা হলো হজ্ব। এই মাসেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হজ্ব করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই মাসকে হজ্বের মাসও বলা হয়। এই মাসে লাখো হাজি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসে হজ্ব করার জন্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হজ্বের মাধ্যমে মানুষকে পবিত্র করেন। কৃত গুনাহগুলো মাফ করে দেন। যে হজ্ব করবে, সে সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া শিশুর মতো। হাদিসে আছে,
“যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্ব করলো এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ হতে বিরত রইল, সে ঐ দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে হজ্জ হতে ফিরে আসবে যেদিন তার মা জন্ম দিয়েছিল। [সহিহ বুখারি ১৫২১]
আরেকটি আমল হলো কুরবানি! কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা বান্দার তাকওয়া পরিক্ষা করেন। কুরবানির মাধ্যমে ফয়দা হয় সামাজিকতা! ধনী গরীবের ভেদাভেদ ভুলে সৃষ্টি হয় একতা। প্রত্যেকে নিজের কুরবানির পশুকে তিনভাগ করেন। তন্মধ্যে একভাগ গরীব-দুঃখীদের জন্য নির্ধারিত। এটা আল্লাহর নির্দেশ। কেননা আল্লাহ তা’আলার নিকট রক্ত-মাংস কিছু পৌঁছাবে না। আল্লাহ তা’আলা শুধু তাকওয়া দেখবেন। কুরআনে আছে,
“এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।” [সূরা হজ্ব ৩৭]
আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে বুঝার এবং আমল করার তাওফিক দিন-আমীন!

যিলহজ্ব
০ টি মন্তব্য      ১৭৯ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: