অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২০ জন ভিজিটর

মুখোশ উন্মোচন...

লিখেছেন জিবরান মঙ্গলবার ০৫ জুলাই ২০২২
জনসম্মুখে আমার মেয়েকে চড় বসিয়ে দিলো আলিফের মা। ঠিক তার পরক্ষণেই তিনি কর্কশ কন্ঠে মিমি অর্থাৎ আমার মেয়েকে বলে উঠলো,
"তোদের মতো রাস্তার মেয়েদের কারণে আজ আমার ছেলের মতো বোকা ছেলেগুলো খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কি মনে করিস নিজেকে? প্রেম করবি আর অতি সহজেই আমার ছেলেকে তোর গলায় ঝুলিয়ে দিবো? জীবন এতো সহজ না। আর আলিফ শোন! আর কোনোদিন যদি এই মেয়ের সাথে তোকে দেখি তাহলে ভুলে যাবি আমি তোর মা। তুই এখনো এদের চালাকি বুঝিস নি? আরে এরা টাকার জন্যই তোদের মতো ছেলেদের পিছনে ঘুরে বেড়ায়।"
আমি দূর থেকে খেয়াল করছি আলিফের মায়ের কথা শুনে আমার মেয়ে স্থিরচিত্তে দাঁড়িয়ে লজ্জায় টুপ টুপ করে নিজের চোখের অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে। পার্কের মানুষগুলো যেভাবে ও'র দিকে তাকিয়ে আছে তাতে বোধহয় বোঝাই যাচ্ছে তারা এই দৃশ্য মঞ্চ নাটক এর মতোই বেশ ভালো ভাবে উপভোগ করছে। এই অবস্থায় যেখানে আমারও লজ্জায় মাটি খাওয়া উচিৎ ছিল সেখানে আমার কোনো অনুভূতিই হচ্ছে না।
নিজের মা'কে থামানোর বারংবার চেষ্টা করেও সফল হচ্ছে না আমার মেয়ের প্রেমিক খ্যাত আলিফ ছেলেটি।
"মা! তুমি এসব কি বলছো? তুমি যেরকম ও'র সম্পর্কে ভাবছো মিমি সেরকম মেয়ে নয়।"
পুনরায় ছেলেটির মা ওকে ধমক দিয়ে বলে উঠলো,
"তুই চুপ থাক! যেখানে আমি কথা বলছি সেখানে আমি তোর কোনো কথা শুনতে চাই না। আর এই মেয়ে! তোমার বাবার আসার কথা ছিল নাহ? কই সে? নাকি নিজের মেয়েকে এভাবে একা ছেড়ে দিয়েছে নষ্টামি করার জন্য?"
মহিলার এই কথা শোনার পর আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না বরং ধীরপায়ে তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম।
আমাকে দেখে আলিফের মা অনেকটা অবাক নয়নেই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এভাবে তাকানোর কারণটাও অস্বাভাবিক কিছু নয় কেননা আমি যে তার বহু পরিচিত একজন মানুষ। মূলত বহু বছর আগে আমি তার স্বামীর ব্যবসায়িক পার্টনার ছিলাম কিন্তু বেশ কিছু কারণে আমি তাদের থেকে সরে এসেছিলাম।
তবুও আমি তাকে পরিচিত হওয়ার সুযোগ না দিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে তার ছেলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
"আচ্ছা তুমি আমার মেয়েকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে কতদিন তার পিছনে ঘুরেছিলে?"
আমার প্রশ্ন শুনে সে কিছুটা হকচকিয়ে উঠলো। তার মুখমন্ডল দেখে আমি অবলোকন করতে পারছি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে সে এই মুহূর্তে প্রস্তুত নয়। পরক্ষণেই আবার জিজ্ঞেস করলাম,
"আমার মেয়ে কি তোমায় আগে প্রেম প্রস্তাব দিয়েছিলো নাকি তুমি নিজেই আগে তাকে প্রেম প্রস্তাব দিয়েছো?"
এই প্রশ্ন শুনেও আলিফ ছেলেটি চুপচাপ মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে আছে। আমি আর নিজের রাগকে প্রশমিত করতে না পেরে সজোরে ছেলেটির গালে চড় বসিয়ে দিয়ে বলে উঠলাম,
"কথা বলছিস না কেন বেয়াদবের বাচ্চা? আমার মেয়ে তোর পিছনে ঘুরেওনি এমনকি তোকে আগে প্রেম প্রস্তাবও দেয়নি তাহলে তোর মায়ের সাহস হয় কি করে আমার মেয়েকে নষ্টা এবং রাস্তার মেয়ে বলার? আমি চাইলে এখনি তোর থেকেও ভালো ঘরের ছেলের নিকট আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দিতে পারি। কিন্তু আমি আমার মেয়েকে শুধুমাত্র ভালোবাসি বলেই তার মতামত কে গুরুত্ব দিয়ে এখানে এসেছিলাম, নাহলে তোদের মতো দুই টাকার অহংকারী পরিবারের সাথে আমার মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।"
আমার এমন আচরণে সকলেই হতভম্ব হয়ে স্থিরদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
পরমুহূর্তেই আমি আমার মেয়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,
"তুই কি এখনো এই ছেলেকে বিয়ে করতে চাস?"
আমার কথা শুনে সে নিজের অশ্রু বাঁধ আরো কিছুটা বিসর্জন দিয়ে কিছুক্ষণ অন্তর চোখেমুখে এক কঠোর ভাব এনে বললো,
"না বাবা! তুমি এখনি বাসায় চলো, আমি আর এখানে একমুহূর্ত থাকতে চাইনা।"
এই বলেই সে দ্রুতগতিতে প্রস্থান করলো পার্কের এই জায়গাটি থেকে। যেখানে আমার মেয়ে আর থাকতে ইচ্ছুক নয় সেখানে আমার কি কাজ? অনেকটা রহস্যময়ী হাসি দিয়ে আমিও মিমির পিছু পিছু চলে আসলাম। আমি জানি আলিফ এবং ও'র মা আমাদের চলার পথে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
আমার একমাত্র মেয়ের আবদার আমি কোনো কালেই অপূর্ণ রাখিনি বরং ছোটবেলা থেকে মিমি যা চেয়েছে তাই দিয়েছি এবং ও'র মতামতকে আমি সর্বদাই গুরুত্ব দিয়েছি। তাই বলে খারাপ কিছুর প্রশ্রয় আমি কখনোই দেই নি বরং সবসময় পাশে বসিয়ে ওকে বুঝিয়েছি। সেদিন বেশ ইতঃস্তত ভঙ্গিতে আমার পাশে এসে মিমি বললো,
"বাবা একটা কথা ছিল! আসলে আমি একটা ছেলেকে পছন্দ করি আর ছেলেটিও ভালো চাকরি করে। যেহেতু তুমি আমাকে একদিন বলেছিলে কোনো ছেলেকে পছন্দ হলে অবশ্যই নিঃসংকোচে তোমাকে জানাতে তাই আর কি..."
আমি নির্লিপ্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,
"হুম বুঝলাম! কিন্তু তুমি কি তার সাথে শুধুই টাইম পাস করতে চাও নাকি বিয়ে করে পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হতে চাও?"
উৎফুল্ল স্বরে সে বললো,
"অবশ্যই বিয়ে করতে চাই বাবা।"
"তাহলে তার বাবা অথবা মা'কে আমার সাথে একদিন দেখা করিয়ে দাও।"
সেদিনের সেই কথোপকথনের ভিত্তিতেই আজকের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
রাতে আমি মিমিকে একান্তে ডেকে নিয়ে বলি,
"আমি তোমার জন্য একটি ছেলে দেখেছি, ছেলেটি বেশ ভদ্র এবং মার্জিত পাশাপাশি ভালো বেতনের একটি চাকরিও করে। যদি তোমার মতামত থাকে তাহলে...!"
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই আমার মেয়ে বলে উঠলো,
"আমি রাজি বাবা! তুমি যা করার করতে পারো।"
আমি জানি সে অনেকটা অভিমানের রেশ ধরেই আমাকে সম্মতি দিয়েছে তবুও আমি আর এই সুযোগ মিস করার চেষ্টা করলাম না। অনেকটা ঘরোয়া ভাবেই মিমির বিয়ে দিলাম।
মিমির বিয়ের দুইবছর পর হঠাৎই কোনো এক অপরাহ্নে আমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে এক নারী কন্ঠস্বর আমাকে দাঁড়াতে বললো। তার কথায় আমি থমকে দাঁড়াতেই কৌতূহল বসত পেছনে তাকাই। পেছনে আলিফের মা'কে দেখে আমার তেমন কোনো অনুভুতি হলো না। তিনি আমার সামনে এগিয়ে এসে বেশ নমনীয় স্বরে বললেন,
"কেমন আছেন ভাই? জানি আপনি সেই ঘটনার পর থেকে আমার উপর খুবই অসন্তুষ্ট। সেদিনকার ঘটনার পর থেকে আমার নিজের প্রতি নিজেরই প্রচুর ঘৃণার জন্ম নিয়েছে। আলিফের সাথে আমি নিজের পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করিয়েছি ঠিকই কিন্তু সেই মেয়ে উল্টো আমার ছেলের নিকটই আমাকে খারাপ বানায় প্রতিনিয়ত। এখন আফসোস হচ্ছে, যদি আপনার মেয়েকে আমার ঘরে নিয়ে আসতাম তাহলে এরকম ঘটনার সাক্ষী হয়তো কখনোই হতাম না।"
আমি সামান্য মুচকি হেসে বললাম,
"আমার মেয়েও যে আপনার ছেলের সংসারে গিয়ে ঐ মেয়ের মতো আচরণ করতো না তারও কি কোনো গ্যারান্টি আছে? তবে আপনি সেদিনকার ব্যবহারের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন আপনার পরিবারে আমার মেয়ে যদি যেতো তাহলে আমার মেয়ে অন্তত কখনোই সুখী হতো না। আপনাকে ধন্যবাদ জানাই একারণে যে বিয়ের আগেই আপনি নিজের মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন এবং আমার মেয়েকে একটি বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। আজ তাহলে আসি। আসলে আমার মেয়ের শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছি তো তাই একটু তাড়া আছে।"
এই বলেই সাথে সাথে আমি পূর্বের গন্তব্যে হাঁটা দিলাম। হয়তো তিনি আফসোসের দৃষ্টিতে আমার পথের দিকে তাকিয়ে আছেন। যা আমার কাছে সত্যিই অনেক মধুর।

মুখোশ গল্প সাহিত্য
০ টি মন্তব্য      ১৮১ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: