অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৩৪ জন ভিজিটর

ইতিহাসের হৃদয় হতে....(১)

লিখেছেন লাবিব আহসান রবিবার ০৩ জুলাই ২০২২
জেনারেল জিয়ার পরনে খাঁকি পোশাক নেই, চোখে নেই সেই চিরাচরিত কালো চশমা। তিনি বসে আছেন সফেদ পাঞ্জাবী পরে। মনে মনে ভীষণ উদ্বিগ্ন। কিন্তু মুখের চামড়ায় তার প্রমাণ নেই। সেখানে অদ্ভুত এক স্নিগ্ধতা। চরিত্র হিসেবে তিনি এমনই। ভিতরের বিধ্বস্ত রূপটি বাইরের কাউকে বুঝতে দেন না। বিস্ময়কর দক্ষতায় সকলের থেকে আড়াল করে রাখেন দিনের পর দিন।
পাশে খানিকটা দূরে বসে আছেন তাঁর স্ত্রী খালেদা খানম পুতুল। তিনি তখনও 'বেগম খালেদা জিয়া' হয়ে ওঠেন নি। তাঁকে যথেষ্ট বিচলিত দেখাচ্ছে। স্বামীর জীবন নিয়ে তিনি শঙ্কিত। কারণ তাদেরকে কার্যত গৃহবন্দী করে রেখেছে ৩ নভেম্বর বিপ্লবের নায়ক জেনারেল খালেদ মোশাররফের পাঠানো সৈন্যরা। জেনারেল জিয়াকে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন খালেদ। সেনাবাহিনীতে এখন তিনিই সর্বেসর্বা।
খালেদা খানম দূরে বসে মাঝে মাঝে স্বামীর উপর চোখ রাখছেন। বুঝতে চেষ্টা করছেন স্বল্পবাক অথচ বুদ্ধিদীপ্ত এই মানুষটির মনোভাব। কি খেলা করছে তাঁর চোখে? মনে পড়ছে ১৫ বছর আগের স্মৃতি। সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসার জিয়া থাকেন করাচী। একবার দেশে এসে খালেদার মা তৈয়বা মজুমদারকে বললেন- 'খালাম্মা, আমি আপনার জামাই হতে চাই।' মা লাজুক মুখে হাসলেন কেবল। এই হাসির অর্থ- 'কথাটা বলতে এতদিন লাগল কেন বাছা!'
তিনবার কবুল বলে তরুণ সেনা অফিসার কমলের গলায় আজীবনের জন্য ঝুলে পড়লেন পুতুল। তিনি তখনও জানেন না- যে তরুণের সঙ্গে জীবনের যাত্রা শুরু করলেন, সে একদিন বাংলাদেশের রাজনীতির ঐতিহাসিক চরিত্র হয়ে উঠবে। তিনি এ-ও জানলেন না- সময় একদিন স্বয়ং তাঁকেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির প্রধান কর্ণধার হিসেবে অধিষ্ঠিত করবে। আর দশজন সাধারণ বধূর মতো শুরু হলো পুতুলের সংসার জীবন।
জেনারেল জিয়াকে যে বাসায় গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে, সেটির অবস্থান ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। তাঁকে ঘিরে রাখা খালেদ মোশাররফের সৈন্যদের তখনও জানবার কথা নয়- ইতোমধ্যেই খেলার মোড় ঘুরে গেছে। রাজনীতির দাবাখেলায় হেরে গেছেন খালেদ মোশাররফ, উঠে এসেছে জেনারেল জিয়াউর রহমানের নাম। তখন পর্যন্ত এই তথ্যটি জানেন না স্বয়ং জিয়াউর রহমানও। তবে তাঁর বাসার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগ মুহূর্তে একটি বুদ্ধিমানের কাজ করেছিলেন তিনি। বন্ধুবর কর্ণেল তাহেরের সাহায্য চেয়ে রেখেছিলেন।
সেনানিবাসে ঘটে গেছে পাল্টা অভ্যত্থান। সেটি রূপ নিয়েছে সিপাহী বিপ্লবে। সৈন্যদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলগুলো স্লোগান তুলতে তুলতে ছুটে আসছে জেনারেল জিয়ার বাসভবনের দিকে। তাদের চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস। লক্ষ্য একটাই- সেনাপ্রধানকে মুক্ত করতে হবে। প্রকৃত পরিস্থিতি অনুধাবন করার সঙ্গে সঙ্গে সটান পালিয়ে গেল খালেদ মোশাররফের সৈন্যরা। কিন্তু জেনারেল জিয়া ব্যাপার কিছু বুঝতে পারছেন না। সৈন্যদের হৈ-হুল্লোড় শুনে করিডোরে বেরিয়ে এলেন তিনি। পিছনে তাঁর স্ত্রী।
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিতে বিচিত্র এক কাণ্ড করে বসলেন ইতিহাসের সাহসী এ চরিত্রটি। অফিসারদের একজন এগিয়ে এসে বলল-
'স্যার, আমরা আপনাকে নিতে এসেছি। আপনি আসুন।'
জেনারেল জিয়া তখন বললেন-
'দেখ! আমি এখন রিটায়ার করেছি। আমি কিছুর মধ্যে নাই। আমি কোথাও যাব না। কিছুই বুঝতে পারছি না আমি।'
অফিসার বলল-
'স্যার, আমরা আপনাকে আবার আর্মি চিফ বানাতে চাই। দোহাই আল্লাহর! আপনি আসুন।'
বেগম জিয়া পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বললেন-
'দেখুন ভাই! আমরা রিটায়ার করেছি। আমাদের নিয়ে টানাটানি করবেন না। দয়া করে আমাদের ছেড়ে দিন।'
জেনারেল জিয়া কিংবা বেগম জিয়ার কেউই তখন পর্যন্ত অনুধাবন করতে পারেন নি- ভাগ্য তাদেরকে তখন টানছিল ক্ষমতার মসনদের দিকে আর তারা যেন ক্ষমতার মসনদ থেকেই পালাতে চাইছিলেন। অনাগত সময়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সেনাপ্রধান, প্রেসিডেন্ট আর প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার। হায়রে বিচিত্র ইতিহাস!
অতঃপর সিপাহীরা জেনারেল জিয়াকে জোর করে ধরে চ্যাংদোলা করে কাঁধে উঠিয়ে নিলো। তারপর এগিয়ে চলল অপেক্ষমান জিপের দিকে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের আকাশ-বাতাস তখন স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত- 'জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ/ সিপাহী-জনতা ভাই ভাই।' সময়টি ৭ নভেম্বর দিবাগত রাত, ১৯৭৫ সাল। বেগম জিয়া তখনও করিডোরে দাঁড়িয়ে। তিনি উৎকণ্ঠা আর আনন্দের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে দৃশ্যটি অবলকন করে অপূর্ব এই মুহূর্তটির সাক্ষী হয়ে রইলেন চিরদিনের জন্য।

ইতিহাস জেনারেল জিয়া
০ টি মন্তব্য      ১১৫ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: