অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৩ জন ভিজিটর

একটি ইবলিশি ধারণা—উত্তম আমি অধম সে...

লিখেছেন কহেন কবি মঙ্গলবার ৩১ মে ২০২২
 
ফেরেশতাদের সাথে পরামর্শ শেষ করার পরে একজন ফেরেশতা বিভিন্ন স্থান থেকে মাটি এনে আল্লাহর সামনে দিলেন । সেই মাটি ছিলো আঠালো মাটি। তিনি নিজ হাতেই সেই মাটি দিয়ে সৃষ্টি করলেন আদমের অবয়ব। রূহ দিলেন না তখনও আল্লাহ সেই অবয়বের মধ্যে। সেই অবয়বটি চল্লিশ রজনী পর্যন্ত পড়ে থাকলো। ইবলিশ এসে এসে ঘুরে যেতো সেই অবয়বের আশেপাশে। ঘুরে ঘুরে দেখতো। তাচ্ছিল্ল্য করতো। এই তাচ্ছিল্যতেই শুধু সীমাবদ্ধ থাকতো না সে। পা দিয়ে তাতে আঘাত করতো। অবয়বটির মুখ দিয়ে ভেতরে ঢুকতো আর পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে দাম্ভিকতার সাথে বলতো— তুমি কিছুই হওনি। ঝনঝন কিংবা শো শো করে আওয়াজ সৃষ্টির কাজেও তুমি যথাযথ হওনি! আমার আয়ত্তে পেলে তোমাকে আমি নিঃশেষ করে ফেলবো। আমার ওপর যদি তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব-কর্তৃত্ব দেওয়া হয়— তা হলে আমি কখনো তোমার অনুগত হবো না। মানবো না তোমার শ্রেষ্ঠত্ব।
 
অবশেষে আল্লাহ অবয়টির মাঝে রূহ ফুঁকে দিলেন। সৃষ্টি হয়ে গেলেন পৃথিবীর প্রথম মানব। হ্যাঁ, সাঈয়েদুনা আদম আলাইহিস সালামের কথায়-ই বলছিলাম!
এবার আল্লাহ ডাক দিলেন সকল ফেরেশতাকে। বললেন সিজদাহ করো একে। এক এক করে সকল ফেরেশতা নুয়ে পড়লেন সিজদায়। কিন্তু ইবলিশ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো ! করলো না সে সিজদাহ। আত্মম্ভিরতার শিরস্ত্রাণ পরে সে দাঁড়িয়েই রইলো! করলো আল্লাহ আযযাওজ্বাল্লার অবাধ্যতা।
 
আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন— কোন জিনিসটা তোমাকে আদমের প্রতি সিজদাহ হতে বিমুখ রাখলো। অভিশপ্ত ইবলিশ জবাব দিলো; আমি তারচেয়ে শ্রেষ্ঠ। উত্তম। বয়সে সিনিয়র। সৃষ্টিতে সবল। আমি আগুনের তৈরি, আমাকে আগুন থেকে সৃজন করেছেন। তাকে করেছেন মাটি থেকে। মাটির চেয়ে আগুন বেশি শক্তি-সবল।
 
তার এমন আচরণে আল্লাহ ক্রোধান্বিত হলেন। বঞ্চিত হলো সে আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ থেকে। বের করে দিলেন তিনি তাকে । আর তাকে হীন-লাঞ্চিত ও অধমদের অন্তর্ভুক্ত করলেন । পবিত্র কালামুল্লাহ মাজিদে বিষয়টি এভাবেই এসেছে—“বের হয়ে যা এখান থেকে! এখানে থেকে তোর কোনো অহংকারে ডুবে থাকার অধিকার নেই। আসোলে তুই তাদের অন্তর্ভুক্ত, যারা নিজেরা নিজেদেরকে লাঞ্চিত ও অবমাননার মধ্যে রেখে সন্তুষ্ট হতে চায়”।
 
এরপরও সে নমনীয় হলো না। নিজের অবস্থানে রইলো অটল-অবিচল। আর আল্লাহর কাছে চাইলো কিয়ামত অবধি অবকাশ। আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাকে সেই অবকাশ-ও দিলেন। অতঃপর সে আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলো। নিজের হঠকারিতা, আনুগত্যহীনতা, আর অহংকারের দোষে দুষ্ট হওয়ার দায়টা আল্লাহর ওপর চাপিয়ে দিলো। নির্বোধ ইবলিশ যেনো আল্লাহকে এটাই বুঝাতে লাগলো যে, আদমকে সিজদাহ করার হুকুম দিয়ে তুমি আমাকে বিব্রতকর পরিস্থিতে ঠেলে দিয়েছো। আমার আত্মভিমান ও আত্মম্ভিরতায় আঘাত দিয়ে আমাকে এমন অবস্থার মুখোমুখি করেছো ,যার কারণে আমি তোমার অবাধ্য হতে বাধ্য হয়েছি। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, সে আল্লাহকে এভাবেই বললো—আপনি আমাকে যেভাবে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করেছেন, অনুরূপ আমিও এই অবকাশকে কাজে লাগিয়ে সত্য-সরল পথের অধিবাসীদের জন্য ওঁৎপেতে বসে থাকবো। সামনে-পেছনে, ডানে-বামে; সবদিক থেকে এদের ঘিরে ধরবো আমি। যার ফলে এই মানুষদের অধিকাংশকেই তুমি কৃতজ্ঞ পাবে না। তাদেরকেও আমি গোমরাহ করিয়ে ছাড়বো!
 
সে আল্লাহকে আরো বললো— “তুমি যে আমার চাইতে তাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন করেছো, সে কি এর যোগ্য ছিলো? যদি তুমি আমাকে কিয়ামাত অবধি অবকাশ দাও, তা হলে আমি তার সমস্ত সন্তান-সন্তুতির মূলোচ্ছেদ করে দেবো (পথভ্রষ্ট করে ছাড়বো)। সামান্য ক’জনই আমার হাত থেকে নিস্তার পাবে” জবাবে আল্লাহ তাকে বললেন,
“ঠিক আছে, তোকে অবকাশ দেওয়া হলো। তাদের (আদম ও তাঁর সন্তানদের) মধ্যে যারা তোর অনুসরণ করবে, তুইসহ তাদের সবার জন্য জাহান্নামই হবে পূর্ণ প্রতিদান।"
 
 
‘এবার তোর কণ্ঠ দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পারিস পদস্খলিত কর, তোর অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী দ্বারা তাদেরকে আক্রমণ কর এবং তাদের ধনে ও সন্তান-সন্ততিতে শরীক হয়ে যা, আর তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দে।’
 
 
এরপর আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাকে এ-ও বলেন যে,
‘নিশ্চয় আমার বান্দাদের উপর তোর কোন ক্ষমতা-কর্তৃত্ব ফলপ্রসু হবে না।’
সাথে আল্লহ রব্বুল আলামিন আমাদের এটাও জানিয়ে দিলেন যে ইবলিশ মূলত শঠতা আর প্রতারণার জাল বিস্তার করে সেই জালে জড়াতে চেষ্টা করে। সে মূলত প্রতারক।
 
এই যে ইবলিশের এমন হঠকারিতা, এর থেকে আমরা কী বুঝলাম? সোজাকথায় প্রথমত যে বিষয়টি আমরা বুঝতে পারছি, তা হলো হঠকারিতা, একগুঁয়েমী-একদেশদর্শীতা মূলত ইবলিশের স্বভাব। অহংকার, আত্মম্ভরিতা, নিজেকে অন্যের চাইতে শ্রেষ্ঠ মনে করাটা ইবলিশের অন্যতম একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। আর এ-কারণেই সে আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে অপারগ হয়। করে আল্লাহর সাথে বেয়াদবি। নিজের দোষকে ঢাকা দিয়ে, নিজের অন্তরের অহমিকা লুকিয়ে রেখে, নিজের দুর্বলতা স্বীকার না করে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলাটা তথা অন্যায় করে, ভুল করে সেই ভুল বা অন্যায়কে জাস্টিফাই করতে চাওয়া কিংবা করা, এটাও অভিশপ্ত ইবলিশের আরো একটা বৈশিষ্ট্য। এখন আমি যেহেতু মুসলিম। ইসলামের অনুসরণকারী। বাবা আদম আলাইহিস সালামের সন্তান। সেহেতু এসব ইবলিশি বৈশিষ্ট্য হতে আমাকে-আমাদেরকে মুক্ত থাকতে হবে। যেমন এখানে ইবলিশের অহংকার নামক প্রধান যে বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে, সেই অহংকার নিয়েই পবিত্র কুরআনুল কারিমে অনেকগুলো আয়াত আছে। অনেকগুলো আয়াতের মধ্যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, অহংকারীকে আল্লাহ ভালোবাসেন না। আমরা মানুষেরাও বহু বিষয়াদি নিয়ে অহংকারে ডুবে যাই। যেনো চারদিকে-ই আজ দাম্ভিকতার মহড়া! অহংবোধের ছড়াছড়ি সর্বত্র! কেউ কাউকে পাত্তাই দিচ্ছে না! মূল্যায়ন করছেনা একে অন্যকে! জ্ঞান-গরিমা, অর্থ-সম্পদ,পদ-পদবী,নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের গরমে এসবেরর অধিকারীদের কাছে জনতার ভেড়া দায়! সাধারণ জনতা তো পরের বিষয়—স্বাভাবিকভাবে যাঁরা এসবে একটু এগিয়ে, তারা-ই তাদের মতো তথা কিছুটা সমমানের লোকদেরও অনেকক্ষেত্র অবজ্ঞা করছে! এড়িয়ে যাচ্ছে। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখছে! ক্ষুদ্রজ্ঞান করছে। আহা,কী এক নিদারুণ অহংকার! কী বিজবিজে পরিস্থিতি।
 
এই যে এতো অহংকার-এতো বড়াই, পদের বড়াই, টাকার বড়াই সৌন্দর্য-শক্তির বড়াই, বিদ্যে-বংশীয়-সামাজিক এবং আভিভিজাত্যের বড়াই; এগুলো কোনটা আসোলে আমার, কোনটা স্থায়ী? এগুলোর পরিণাম কী? ফলাফল কী? কখনো ভেবে দেখেছি কি?
 
 
এরপর অনেক সময় আমরাও ইবলিশের মতোই আমাদের ভুল কর্মকে, অন্যায়সমূহকে জাস্টিফাই করি খুব দৃঢ়তার সাথেই! এবং আমাদের করা ভুলের দায়ভার চাপিয়ে দিই অপরের ওপর। কোনো নিরিহ মানুষের ওপর। নিরপরাধ ব্যক্তিবর্গের ওপর! ইবলিশ-ও স্বয়ং এইসব কাজ করেছে। আল্লাহর কাছে অবনত হতেও সে রাজি হয় নি। নিজের নির্বুদ্ধিতা, অযথা অহমিকার দায়ভার সে আল্লাহর ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। আল্লাহ এই নির্বোধের এহেন অভিযোগের প্রতি কর্ণপাত-ই করে নি। তাকে তার পথেই ছেড়ে দিয়েছে। সে ভেবেছিলো এটাই তার বীরত্ব! আচ্ছা আমরা অভিশপ্ত ইবলিশের এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের পরিণাম-ফলাফল তো অবলোকন করতেই পারছি—চিরতরেই সে বঞ্চিত হয়ে গেলো আল্লাহর রহমত এবং করুণা হতে। এসব অবলোকন করে কি আমাদের সতর্ক-সচেতন হওয়া উচিত নয়?

ইবলিশি ধারণা
০ টি মন্তব্য      ২৬৯ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: