অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৪৪ জন ভিজিটর

বিনা অনুমতিতে জিহাদ দোষনীয়

লিখেছেন আফগানী সোমবার ৩০ মে ২০২২

 

কাদেসিয়ার যুদ্ধ ও মাদায়েন থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর পার্সিয়ান সৈন্যদের আর কোনো আশা থাকলো না। তারা পাহাড়ে পালিয়ে গেল। আর এদিকে সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা.-এর নেতৃত্বের পারস্যের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ন শহর মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে চলে এলো। উমার রা.-এর নির্দেশে সা'দ রা. সেনাবাহিনীকে বিশ্রাম ও শহর গঠনে নিয়োজিত করেছিলেন। বহু মানুষ মুসলিম হচ্ছে। তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হলো। নতুন প্রাশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলো। 

 

এদিকে এক পার্সিয়ান কমান্ডার হরমুজান রামহরমুজে পার্সিয়ান মুশরিকদের একত্রিত করেছে। সেখানে তারা পার্সিয়ান শাসন কায়েম করেছে। উমার রা.-এর নির্দেশে সা'দ রা. হরমুজানের বিরুদ্ধে নুমান ইবনে মুকরিনকে নেতা বানিয়ে বাহিনী পাঠালেন। অন্যদিকে উমার রা. বসরার প্রশাসক আবু মুসা আশআরি রা.-কে নির্দেশ দিলেন সাহল ইবনে আদির নেতৃত্বে একটি বাহিনী হরমুজানের বিরুদ্ধে প্রেরণ করতে। মুসলিম বাহিনীকে ঠেকাতে হরমুজান এগিয়ে এলো। তার সাথে নুমান ইবনে মুকরিনের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের বিজয় দান করেন।  হরমুজান তুস্তার পালিয়ে যায়। 

 

নুমানের বাহিনী সাথে সাহলের বাহিনী এসে মিলিত হয়। মিলিত বাহিনীর নতুন কমান্ডার হন আবু সাবরা ইবনু আবি রুহম। তুস্তারে দীর্ঘদিন অবরোধ করে অবশেষে চূড়ান্ত লড়াইয়ে লিপ্ত হয় দুই পক্ষ। এই যুদ্ধে মুসলিমদের প্রসিদ্ধ বীর বা'রা ইবনু মালিক এবং মাজযাহ ইবনু সাওর হরমুজানের নিক্ষিপ্ত তীরে শাহদাতবরণ করেন। অবশেষে হরমুজানকে মুসলিমরা কোণঠাসা করে ফেলে। সে উমার রা.-এর সাথে দেখা করার বিনিময়ে আত্মসমর্পন করে লড়াই ছেড়ে দেবে বলে জানায়। আবু সাবরা রাজি হন।

 

গণিমতসহ একটি প্রতিনিধি দলকে উমার রা.-এর নিকট মদিনায় পাঠানো হলো। তাদের সাথে হুরমুজানকেও পাঠানো হলো। মদিনায় প্রবেশ করে হরমুজান তার সেনা কমান্ডারের রাজকীয় পোষাক পরিধান করলো। অলংকারগুলো পরলো। আভিজাত্য নিয়ে সে উমার রা.-এর নিকট দেখা করতে চাইলো। ইরাক থেকে আগত প্রতিনিধিদল প্রথমে উমার রা.-কে তার বাড়িতে খোঁজ করলো। বাড়ি থেকে জানানো হলো তিনি কুফার প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করার জন্য মসজিদে নববীতে অবস্থান করছেন। এরপর তারা মসজিদে গিয়েও উমার রা.-কে দেখতে পেলেন না। ইতোমধ্যে উমার রা. কুফার প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করে  মসজিদের পাশে ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। সামনে বাচ্চারা খেলা করছে দেখে তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা দেখিয়ে দিল উমার রা. পাশে ঘুমিয়ে আছেন। 

 

হরমুজান উমারের ঘর, মসজিদ ইত্যাদি দেখে ভীষণ অবাক হলো! যার নামে সারা দুনিয়া কাঁপছে সেই উমারের বাসা কিংবা দপ্তরের অবস্থা খুবই সাধারণ। হরমুজানকে নিয়ে প্রতিনিধি দল উমার রা.-এর সামনে পৌঁছলে হরমুজান অত্যন্ত অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো এটাই কি তোমাদের উমার? এতো মাটিতে শুয়ে আছে! হরমুজান অত্যন্ত অবাক হলো।    

 

লোকজনের কোলাহলে উমার রা.-এর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি উঠে বসলেন এবং বললেন, এই লোকটিই কি হরমুজান? প্রতিনিধিদল বললেন, হ্যাঁ। উমার রা. তাকে ভালোভাবে দেখলেন। আমি আল্লাহর কাছে আগুন থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি এবং তারই কাছে সাহায্য চাই। আলহামদুলিল্লাহ্‌! যিনি ইসলামের মাধ্যমে এই লোককে ও তার সাহায্যকারীদের অপমানিত করেছেন। 

 

হরমুজানকে নিয়ে আসা লোকেরা উমার রা.-কে বললেন, সে পার্সিয়ান কমান্ডার। আপনার সাথে কথা বলতে এসেছে। উমার রা. বললেন, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত তার সাথে কথা বলবো না যতক্ষণ না সে তার এসব সাজসজ্জা খুলে ফেলে। অবশেষে সে তার পোষাক ও অলংকার খুলে নিল। তাকে একটি সাধারণ পোষাক পরিয়ে আবার উমার রা.-এর সামনে আনা হলো। সে যুদ্ধের জন্য ইসলামকে দায়ি করে এবং তাকে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করে দেওয়ার আবেদন করলো। উমার রা. রেগে যান। এরপর সে চালাকির আশ্রয় নেয়। সে মনে করে নিয়েছে যে, তাকে এখন হত্যা করা হবে। তাই সে পানি চেয়েছে। পানি হাতে নিয়ে সে উমার রা.-এর দিকে তাকিয়ে বললো, আমার ভয় হচ্ছে আমি খেতে গেলে আপনি আমাকে হত্যা করবেন। উমার রা. বললেন, তুমি পানি খাও, পানি খাওয়ার আগে তোমাকে হত্যা করা হবে না। এটা শুনে সে পানি না খেয়ে রেখে দিল।

 

সে আবারো উমার রা.-এর কাছে মুক্তি ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করে। কিন্তু উমার রা. বললেন, আমি তো আমার বা'রা ও মাজযাহের খুনীকে কখনো নিরাপত্তা দিতে পারি না। এভাবে বহুক্ষণ চেষ্টা চালিয়েও যখন নিরাপত্তা পেল না তখন সে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়। এবার উমার রা. তাকে নিরাপত্তা দিতে বাধ্য হলেন। তিনি তাকে ক্ষমা করে দিলেন ও মদিনায় থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। এই হরমুজানই পরে উমার রা. হত্যা ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত ছিল এবং এই কারণে হরমুজানকে হত্যা করা হয়।  

 

এদিকে বাহরাইনের শাসক ছিলেন আ'লা ইবনে হাদরামি রা.। তার সাথে সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা.-এর প্রতিযোগিতা ছিল। সা'দ রা. কাদেসিয়ার যুদ্ধ ও মাদায়েনের অভিযান দিয়ে বিখ্যাত হয়ে গেলেন। তাঁর প্রশংসা সারা আরবে ছড়িয়ে পড়েছিলো। আ'লা ইবনে হাদরামি রা. কাদেসিয়ার চাইতেও দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করতে চেয়েছেন। যাতে তিনিও বড় বিজয়ের অংশীদার হন। 

 

এই লক্ষ্যে তিনি বাহরাইনে সৈন্য সমাবেশ করলেন। বাহরাইন থেকে নৌবাহিনী গঠন করে বিশাল সমুদ্র পার করে তাদের পারস্য পাঠালেন। এই অভিযানে সেনানায়ক ছিলেন খুলাইদ ইবনে মুনজির। এই অভিযানে উমার রা.-এর অনুমতি ছিল না। আরবদের সমুদ্রে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নেই বলে তিনি অভিযানের জন্য অনুমতি দেননি। কিন্তু আ'লা ইবনে হাদরামি রা. অনুমতি ছাড়াই অভিযান প্রেরণ করলেন। তিনি ভেবেছেন পার্সিয়ানরা এই আক্রমনের ব্যাপারে মোটেই প্রস্তুত নয়। অতএব তাদের বিরুদ্ধে অতর্কিত হামলা চালিয়ে তিনি বড় বিজয় অর্জন করলে উমার রা. খুশি হবেন। 

 

মুসলিমরা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইরানের ইসতাখার গিয়ে পৌঁছালো। যা এখন সিরাজ নামে পরিচিত। পার্সিয়ানরা মুসলিমদের পেছনে গিয়ে তাদের সমস্ত নৌযান ধ্বংস করে দেয়। এতে বেকায়দায় পড়ে মুসলিমরা। সেনাপতি খুলাইদ জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলেন এবং ধৈর্য ও নামাজের সাথে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে বলেন। প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে জয়লাভ করলেও মুসলিমরা পার্সিয়ানদের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যায়। চারদিক থেকে ঘেরাও দিয়ে তারা সৈন্য সমাবেশ করলো। তাউসে আটকে পড়লো খুলাইদ ও তার বাহিনী।

 

খলিফা উমার রা. এই অভিযানের ব্যাপারে অবগত হলেন। তিনি আ'লা ইবনে হাদরামি রা.-কে পদচ্যুত করলেন এবং তাঁকে কঠিন শাস্তি দিলেন। কঠিন শাস্তি হলো তাঁর প্রতিযোগী সা'দ রা.-এর অধীনে কাজ করার জন্য তাঁকে ইরাকে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। আর বসরার গভর্নরকে জানালেন, আ'লা ইবনে হাদরামি একদল সৈন্য নিয়ে অভিযানে বের হয়েছে। এই অভিযানে আমার অনুমোদন ছিল না। আমার মনে হয়, মহান আল্লাহও তাতে রাজি ছিলেন না। পার্সিয়ানরা ওই সেনাদলকে আটকে রেখেছে। আমার আশংকা হয়, কোনো সাহায্য না ফেলে তারা পরাজিত হবে ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আপনি তাড়াতাড়ি লোকজন নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। ওরা নিশ্চিহ্ন হওয়ার আগেই তাদের কাছে পৌঁছুন। 

 

নির্দেশ পেয়ে বসরার গভর্নর আবু সাবরার নেতৃত্বে বিশাল বাহিনী পাঠিয়ে দেন। আবু সাবরা তার বাহিনী নিয়ে তাউসের দিকে অগ্রসর হলো। দ্রুত যাওয়ার ও সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য তারা শহর এলাকার মধ্যে দিয়ে না গিয়ে নদীর তীর দিয়ে গিয়েছিলেন। তারা কারো বাধা পাননি। অবশেষে তারা যখন তাউসে পৌঁছলেন তখন মুশরিকদের সব প্রস্তুতি শেষ। শুধু খুলাইদ ও তার বাহিনীর ওপর আক্রমণ করা বাকী ছিল। 

 

আবু সাবরার নেতৃত্বে প্রায় বার হাজার সৈন্য পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে হামলা করলো। প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে বিজয় আসে মুসলিমদের। এই বিজয়ে খুলাইদ ও তার বাহিনী মুক্ত হয়।


০ টি মন্তব্য      ৯৯ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: