অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৩৭ জন ভিজিটর

দোয়া কবুলের গল্প......

লিখেছেন লাবিব আহসান বৃহস্পতিবার ১২ মে ২০২২
জীবনের একটা কঠিন সময় পার করছিলাম তখন। চারদিকে নৈরাশ্যের কালোমেঘ। মনে হচ্ছিল- আমি মাঝ সমুদ্রের অতল গভীরে ডুবে যাচ্ছি। ভেসে থাকবার মতো কোনো অবলম্বন নেই। সে সময়টাতে আমি অনেকাংশেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলাম। কথা বলে হালকা হতে পারব; এমন মানুষের সংখ্যাও ছিল হাতেগোনা। আমাকে গার্ডিয়ানশিপ করার মতো তেমন কেউই ছিল না বলতে গেলে।
 
ফলতঃ আমার জীবন অনিবার্যভাবে মোড় নিচ্ছিল নিকষ এক অন্ধকারের দিকে। পৃথিবীর বৃহৎ কারাগারে বন্দি হয়ে পড়ার চাইতেও ভয়াবহ হলো বুকের ক্ষুদ্র কারাগারের কয়েদি হওয়া। যে বিভীষিকাময় সময় আমাকে ধেয়ে নিয়ে চলছিল আশাহীনতার অভয়ারণ্যে, সে সময়ের গায়ে সর্পিল ভঙ্গিতে লেপ্টে থাকতে দেখেছি নির্মমতার কৃষ্ণ চাবুক। সময় এবং পারিপাশ্বিকতার প্রভাবে বদলে গিয়েছিল চারপাশের মানুষগুলোও।
 
আমার জনম জনমের পরিচিত নিঃশ্বাসও হয়ে উঠেছিল নিদারুণ অপরিচিত। বুকের উপরে চেপে বসা ভারী জগদ্দলটি যেন ক্রুর হাসি হাসছিল আমাকে দেখে। সবচেয়ে বড় সংকটটা ছিল মানসিক উৎকণ্ঠা। ঠিকঠাক ঘুমাতে কিংবা খেতে পারছিলাম না। উদ্বেগ, আতঙ্ক তখন হয়ে উঠেছিল আমার জীবনাভিধানের নিত্য পরিচিত শব্দযুগল। জীবনকে নিরেট একটা ভারী বোঝা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছিলাম না।
 
জীবন যে মস্ত বড় এক সুযোগের নাম; এই ধারণাটিকেই আমার কাছে হাস্যকর মনে হচ্ছিল। নিজের উপর থেকে কমে আসছিল আত্মবিশ্বাস। এই বিশাল পৃথিবীতে আমার অস্তিত্ব যে কতটাই মূল্যহীন, কেউ যেন জীবনের কলার চেপে ধরে তা জানিয়ে যাচ্ছিল। আলোহীন ভূবনের এক নিঃসঙ্গ মুসাফির হয়ে আমি পথে পথে হেঁটে ফিরছিলাম। প্রকৃতির অনাবিল বুকে নিজেকে সঁপে দিয়ে এক চিলতে সুখের কোমল স্পর্শ পেতে হন্যে হয়ে ঘুরছিলাম চারদিকে। কোথাও কোনো প্রশান্তি নেই।
 
এমনই এক ভয়াবহ দিনের কথা। চট্টগ্রামের একটি গহীন বনাঞ্চল। তখন সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে মাত্র। চারদিকে মাইলের পর মাইলব্যাপী জনমানবহীন। পাখিরা কিচিরমিচির শব্দ তুলে নীড়ে ফিরছে। অপার্থিব এক পরিবেশ। আমি হাঁটছি একটি ছোট খালের পাশ ধরে। দুধারের ছোট ছোট অপরিচিত গাছগুলো মাথা নুইয়ে আছে খালের মৃদু প্রবাহমান পানিতে। এই বিস্ময়কর মুহূর্তটিতে একটি ভাবনা উঁকি দিয়ে গেল আমার মনের আকাশে।
 
মনে প্রশ্ন জাগল- এক চিমটি প্রশান্তি, একটু বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য আমি প্রকৃতির পরম মমতার কোলে আশ্রয় খুঁজে ফিরছি অথচ তার কাছে কেন চাইছি না, যিনি স্বয়ং প্রকৃতির স্রষ্টা? যিনি পৃথিবীর তাবৎ সমস্যার একচ্ছত্র সমাধানদাতা? আমার হৃদয়টা দুলে উঠল। মনে হলো- এই বিস্ময়কর মুহূর্তটিতে এমন একটি অপার্থিব পরিবেশে আমাকে টেনে নিয়ে আসা, আমার মাথায় এমন ভাবনার উদয় ঘটানো কোনো এক শক্তিমান সত্তার বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ।
 
সেই সন্ধ্যায়, সেই মায়াময় প্রকৃতির অপার্থিব সৌন্দর্যের শিশিরবিন্দুতে সিক্ত হয়ে আমার জীবন প্রত্যাবর্তন করল এক ভিন্ন সময়ের দিকে। ঘুটঘুটে অন্ধকারের শেষ প্রান্তে এক চিলতে আলো ঝিলিক দিয়ে উঠতে দেখলাম যেন। আশাবাদী হয়ে উঠল মন। বহুবিদ সমস্যার বোঝা মাথায় নিয়ে দিনের পর দিন পথ চলতে থাকা আমি খালপাড়ের সবুজ দূর্বার উপরেই লুটিয়ে পড়লাম সিজদায়। আল্লাহ প্রেমে টাইটুম্বুর হয়ে উঠল হৃদয়সমুদ্র।
 
এরপর আমি দোয়া কবুলের মুহূর্তগুলো খুঁজে বের করলাম। প্রতিদিন নিয়ম করে নামাজে এবং নামাজের বাইরে প্রত্যেকটি সমস্যা ধরে ধরে দোয়া করতে থাকলাম। মোবাইলের নোটপ্যাডে সমস্যাগুলো লিখে রাখা থাকত সবসময়; পাছে কোনো একটা আল্লাহকে বলতে ভুলে যাই। খুব আনুষ্ঠানিক কোনো দোয়া কখনোই করতাম না। আল্লাহকে বলতাম আমার ভাষায়, একদম আমার মতো করে। বান্দার অব্যক্ত আর্তনাদের ভাষাও যিনি বুঝতে পারেন, তার সামনে আনুষ্ঠানিকতা কেন?
 
দোয়া করার দিনগুলোতেও এক ধরনের দোদুল্যমানতা পেয়ে বসত আমাকে। মনে হত- আমার যে জটিল জটিল সমস্যা, তা কি আদৌ দোয়ার মাধ্যমে সমাধান হবে? দোয়া কি পারবে ভেদ করতে এই কর্কট সমস্যার দুর্ভেদ্য দেয়াল? যদি কিছুমাত্র সম্ভাবনা থাকেও, তবু আমার মতো পাপী বান্দার দোয়া কি কবুল হবে? কত অজস্র ভুলের সমাহার আমার এ ছোট্ট জীবন! তবুও নাছোড়বান্দা মন স্বপ্ন বুনে চলল। কারণ, সেই রুদ্ধশ্বাস সময়গুলো সত্যিই আমার জন্য দুর্বহ হয়ে উঠেছিল।
 
একদিন শেষ রাতে বেরিয়ে পড়লাম দূরের কোনো মসজিদের উদ্দেশ্যে। পৃথিবী তখন নিস্তব্ধ, সমস্ত মানুষ ঘুমে বিভোর। শান বাঁধানো পুকুর ঘাটে অজু করে দাঁড়িয়ে গেলাম নামাজে। দুই নয়নে বাদল নামিয়ে দোয়া করলাম- ‘প্রভু হে, তোমার বান্দার যে কষ্ট হচ্ছে, তা নিশ্চয়ই তুমি দেখতে পাচ্ছো। নিশ্চয়ই তোমার মায়া হচ্ছে। তুমি আমাকে এই কষ্টের সমুদ্র থেকে উদ্ধার করো। আমি আয়েশী জীবন চাই না। আমি চাই না অনেক টাকা-কড়ি। চাই না উচ্চমার্গীয় ক্যারিয়ার। আমি একটি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাহীন জীবন চাই। আমি শান্তিতে ঘুমাতে চাই। প্রভু হে....’
 
আমি তখনও জানি না- আশা এবং নিরাশার মাঝখানে দাঁড়িয়ে করা আমার সেই কঠিন সময়ের দোয়াগুলো সত্যি সত্যিই কবুল হয়ে যাবে। যে সমস্যাগুলোকে আমার কাছে মনে হয়েছিল অবিনশ্বর, কখনোই সমাধান হবার নয়, আল্লাহর কাছে তা এতই ক্ষুদ্র ব্যাপার! আমার হাজারো সমস্যার সমাধান তাঁর কাছে মাত্র দুটি বর্ণ- ‘কুন’! আমার লিস্ট ধরে ধরে করা প্রত্যেকটি সমস্যার উত্তম সমাধান আল্লাহ দিয়েছেন। বিগত ছয় মাস আমি যত সুখী এবং নির্ভাবনার জীবন যাপন করেছি, সমগ্র জীবনে এমনটা খুব কম ঘটেছে। সুতরাং চান, তাঁর কাছেই চান; যার তরে জীবনের সব আয়োজন।

দোয়া জীবনগল্প
০ টি মন্তব্য      ৩৪৪ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: