অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ১৯ জন ভিজিটর

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকের প্রথম ভোর

লিখেছেন আফগানী বৃহস্পতিবার ৩১ মার্চ ২০২২

 

১৯৭৬ সালে মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীমের নেতৃত্বে ১৯৭৬ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার (বিআইসি) কায়েম হয়। আমি তখন তরুণ সাংবাদিক। দৈনিক আজাদের স্টাফ রিপোর্টার। আমি ছিলাম বিআইসির চল্লিশজন ট্রাস্টির মধ্যে নবীনতম ও নয় নম্বর সদস্য। সেন্টারের প্রেরণায় তখন সাহিত্য-সংস্কৃতি-অর্থনীতি বিষয়ক কয়েকটি সংগঠন গড়ে ওঠে। তার একটি ছিল ইসলামিক ইকনোমিক্স রিসার্চ ব্যুরো (আইইআরবি)। সেন্টারের এলিফ্যান্ট রোড অফিসের একটি কক্ষে মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীমের সভাপতিত্বে ইসলামী অর্থনীতি বিষয়ে আইইআরবি-র উদ্যোগে সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবার সকালগুলিতে নিয়মিত আলোচনা চক্র অনুষ্ঠিত হতো। ঢাকা ও আশ-পাশ থেকে আগ্রহীগণ শরিক হতেন। কখনো অর্থনীতির বড় বড় পন্ডিতগণও সে সভায় যোগ দিতেন। সেখান থেকেই ইসলামী অর্থনীতি ও ইসলামী ব্যাংকিং-এর একটি নিউক্লিয়াস গড়ে উঠতে থাকে। আমি বিআইসির মূলত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক নানা কাজে সক্রিয় ছিলাম। অর্থনীতির ছাত্র না হয়েও ব্যক্তিগত আগ্রহে আমি আইইআরবির অর্থনীতি বিষয়ক অনুষ্ঠানগুলিতে যোগ দিয়েও উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করি। সেখান থেকেই ইসলামী অর্থনীতির সাথে ইসলামী ব্যাংকিং চিন্তা আমার মাথায় কাজ করতে থাকে। 

 

১৯৭৪ সালে প্রথম ছাব্বিশটি দেশের অন্যতম হিসাবে বাংলাদেশের পক্ষে অর্থমন্ত্রী তাজুদ্দীন আহমদ ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সনদ স্বাক্ষর করে। ১৯৭৫ সালে আইডিবি প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন হিজরী চৌদ্দ শতক উদযাপনের বিশ্বময় উদ্দীপনা শুরু হয়েছে। এ সময় ১৯৭৮ সালে সেনেগালে ওআইসি পররাষ্ট্র মন্ত্রী সম্মেলন বসে। সম্মেলন থেকে সদস্য দেশগুলির ব্যাংক ব্যবস্থা ইসলামী পদ্ধতিতে পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মুসলিম জাহানে ইসলামী ব্যাংকিং বিস্তারের আন্দোলন তখন থেকে নতুন গতি পায়। 

 

১৯৭৯ সালে ইউএই-র বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ মোহসিন দুবাই ইসলামী ব্যাংকের আদলে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং চালুর সুপারিশ করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক ততপর হয়। চৌদ্দশ হিজরীর পহেলা মুহররম ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর কেন্দ্রিয় ও বানিজ্যিক ব্যাংকের একদল কর্মকর্তা পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম খালেদ ও সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজের প্রিন্সিপাল এম আযীযুল হকের নেতৃত্বে ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ ফর ইসলামিক ব্যাংকিং ইন বাংলাদেশ’ গঠন করেন। (১৯৮২ সালের মার্চ মাসে এই ‘গ্রুপ’টি ‘বাংলাদেশ ইসলামিক ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন’ (বিবা) নামে পুনর্গঠিত হয়। তারা তাদের পরিসরে ইসলামী ব্যাংকিং বাস্তবায়নের পাটাতন তৈরির কাজ করেন। 

 

১৯৮০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা পরিচালক এ এস এম ফখরুল আহসান বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংকের কাজ সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশে অনুরূপ ইসলামী ব্যাংকিং চালুর পক্ষে সুপারিশ করেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিতে ইসলামী ব্যাংকিং চালুর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়। এ সব উদ্যোগের পাশাপাশি আই.ই.আর.বি., বিবা, সোনালী ব্যাংক ট্রেনিং ইন্সটিটিউট (পরে স্টাফ কলেজ), বায়তুশ শরফ ইসলামিক রিসার্চ ইন্সটিটিউট, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, বিআইবিএম প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান সেমিনার, কর্মশালা, ওরিয়েন্টেশন ও প্রশিক্ষণ কোর্স এবং আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ১৯৮২ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিবা বিভিন্ন ব্যাংকের ২১১ জন মধ্য পর্যায়ের নির্বাহী ও কর্মকর্তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমি, সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজ, জনতা ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও কৃষি ব্যাংক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ওরিয়েন্টেশন কোর্স আয়োজন করে। বিবা ছাড়াও আইইআরবি, বিআইবিএম, সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজের ট্রেনিং র মাধ্যমে মোট ৩১১ জন ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। বিবা ইসলামী ব্যাংকিং-এর নীতি-পদ্ধতি নিয়েও কাজ করে।  

 

১৯৮০ সালে দেশে বেসরকারী খাতে ব্যাংক চালুর সিদ্ধান্ত হয়। মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক লশকর ও আলহাজ মফিজুর রহমানের নেতৃত্বে ক’জন উদ্যোক্তা বাংলাদেশে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ব্যাংক অব ঢাকা লিমিটেড’ নামে ইসলামী ব্যাংক কায়েমের জন্য অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৮১ সালের ২৩ এপ্রিল সে আবেদনে প্রাথমিক অনাপত্তি দেয়। তখন ৭১ মতিঝিল মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় রিয়ার এডমিরাল এম এ খানের চারতলা ভবনের নিচতলায় আবদুর রাজ্জাক লশকরের ইস্টার্ন রিগ্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের বানিজ্যিক অফিসটিকে ব্যাংকের প্রকল্প অফিস হিসেবে ব্যবহার করে সেই নামে ব্যাংকের পরিচিতি ও প্যাড ছেপে ব্যাংক কায়েমের শর্ত পুরনের চেষ্টা শুরু হয়। ইতোমধ্যে দেশে কয়েকটি বেসরকারী ব্যাংক চালু হয়। কিন্তু ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় আট কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি বিলম্বিত হয়। 

 

ইসলামী ব্যাংকিং তখনো দুনিয়ার কোথাও পদ্ধতিগত বড় সাফল্য দেখায়নি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় খাতের কোন ব্যাংকেও ইসলামী ব্যাংকিং আদৌ চালু হয়নি। এ অবস্থায় দেশের ভেতর উদ্যোক্তা সংগ্রহ কঠিন হলে দেশের বাইরে উদ্যোক্তা তালাশ শুরু হয়। বিদেশী উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ তখন তেমন আকর্ষণীয় ছিল না। সে পটভূমিতে বিদেশী উদ্যোক্তাদের আস্থা অর্জনের জন্য জনাব আবদুর রাজ্জাক লশকরের নেতৃত্বে জনাব মুহাম্মদ ইউনুছ ও জনাব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনসহ ক’জন দেশী উদ্যোক্তা নিজ খরচে দেশের বাইরে সফর করে উদ্যোক্তা সংগ্রহের জন্য চেষ্টা করেন। দেশি-বিদেশি কিছু মহান ব্যক্তির সহায়তায় শেষ পর্যন্ত আইডিবিসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ১১টি ইসলামী ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারী সংস্থা এবং সৌদী আরবের দু’জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সত্তুর ভাগ যোগান দিতে রাযী হন। তাদের মধ্যে আলরাজি কোম্পানীর সোলেমান আল-রাজী একাই ত্রিশ ভাগ দায়িত্ব নেন।  বাংলাদেশ সরকার পাঁচভাগ, এবং ১৯ জন বাংলাদেশী ব্যক্তিত্ব, ৪টি বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান মিলে পনেরো ভাগ যোগান দেন। বাকি দশ ভাগ রাখা হয় পাবলিক শেয়ার হিসাবে। ফলে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক স্বপ্ন থেকে বাস্তবে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর জনাব নূরুল ইসলাম এ সাফল্যকে ‘একদল নিবেদিত ও অনুপ্রাণীত ব্যক্তির ঐকান্তিক শ্রমের পূর্ণতার প্রতীক’  হিসাবে অভিহিত করেন।

 

বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৮২ সালের জানুয়ারীতে প্রস্তাবিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামী ব্যাংক অব ঢাকা লিমিটেড’কে ইসলামী পদ্ধতিতে ব্যাংক ব্যবসা পরিচালনার জন্য ‘লেটার অব ইনটেন্ট’ দেয়। ১৪ জুন ব্যাংকের ‘কনভেনর’ জনাব আবদুর রাজ্জাক লশকর ব্যাংকের প্রথম কর্মকর্তা হিসেবে জনতা ব্যাংক ওয়াসা শাখার সিনিয়র অফিসার জনাব আবদুর রাজ্জাকের নিয়োগপত্র স্বাক্ষর করেন। ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৭৫ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় মাসুদ রাজা এন্ড কোম্পানির মালিকানাধীন রাজা ভবনে প্রস্তাবিত ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ব্যাংক অব ঢাকা লিমিটেড-এর অফিস ভাড়া নেয়া হয়। সে ভবনের দোতলা ও তিন তলায় ছিল বহুজাতিক ঔষধ কোম্পানি ফাইসন্স-এর অফিস। চতুর্থ তলায় মাসুদ রাজা এন্ড কোম্পানির নিজস্ব দফতর। তিন তলার উত্তর দিকের কিছু অংশ ব্যাংকের জন্য প্রথমে খালি করে নতুন অফিসে ছোট পরিসরে ব্যাংকের প্রস্তুতির  কাজ শুরু হয়। 

 

ব্যাংকের কাজ শুরুর জন্য প্রধান নির্বাহী নিয়োগে সমস্যা দেখা দেয়। ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী হওয়ার জন্য জেনারেল ম্যানেজার বা আরো উপরের পদমর্যাদা শর্ত ছিল। কিন্তু নতুন ধারার এ ব্যাংকের সাফল্য নিয়ে তখন অনেকেরই সন্দেহ ছিল। বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করা হয়। সবাই বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে তো কিছুই জানি না! কিছু বুঝিও না! আপনারা আগে শুরু করুন। আমরা দেখে সিদ্ধান্ত নেবো। কেউ বা বলেন, আপনারা কি বলেন তা বুঝি না! কোন ব্যাংকের দায়িত্বরত এমডি বা জেনারেল ম্যানেজারকে না পেয়ে তখন সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজের প্রিন্সিপাল জনাব এম আযীযুল হককে সামনে রেখে ইসলামী ব্যাংকের কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত হলো। কিন্তু তিনি তখন এসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদন চাওয়া হলো। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে রীতিমাফিক প্রধান নির্বাহী নিয়োগের শর্তে জনাব এম আযীযুল হককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে ব্যাংকের কাজ শুরুর জন্য বিশেষ বিবেচনায় অনুমতি দেয়। জনাব এম আযীযুল হক সোনালী ব্যাংকে পঁচিশ বছর কর্ম জীবন শেষ হতে অল্প ক’দিন বাকি থাকায় পঁচিশ বছরের চাকুরির সুবিধাদি ছেড়ে ইসলামী ব্যাংকের প্রয়োজনে পদত্যাগ করে ১৯৮৩ সালের ১ মার্চ দেশের প্রথম ইসলামী ব্যাংকের প্রথম প্রধান নির্বাহীর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব নেন। সে দিনই অফিসার পদে যোগ দেন জনাব মোহাম্মদ শাহাবউদ্দীন মোল্লা। 

 

১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ জয়েন্ট স্টক কোম্পানীসমূহের রেজিস্ট্রারারের অধীনে সমসংস্থাভুক্ত একটি কোম্পানি বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিরূপে নিবন্ধিত হয়। ১৯৮৩ সালের ২৭ মার্চ ইসলামী পদ্ধতিতে ব্যাংকিং লেনদেন পরিচালনার জন্য ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-এর নামে বাংলাদেশ ব্যাংক লাইসেন্স ইস্যু করে। ২৮ মার্চ ক্যাশিয়ার পদে সোনালী ব্যাংকের জনাব মোহাম্মদ শামসুল আলম ও ২৯ মার্চ জনাব এনাজউদ্দীন আহমদ এবং নিরাপত্তা প্রহরী পদে জনাব মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ভূইয়া যোগ দেন। ২৯ মার্চ পর্যন্ত আলহাজ্জ মফিজুর রহমান ব্যাংকের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড নামে রেজিস্ট্রেশনের পর ব্যাংকটির জন্য একটি অর্থবহ চমৎকার মনোগ্রাম তৈরী করেন দেশের খ্যাতিমান শিল্পী ও ক্যালিগ্রাফার জনাব সবিহউল আলম।

 

লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী ১৯৮৩ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে কার্যক্রম শুরুর বাধ্যবাধকতার কারণে ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ বুধবার সকাল নয়টায় ব্যাংকের রেজিস্টার্ড অফিসে পঁচাত্তর মতিঝিল বানিজ্যিক এলাকায় রাজা ভবনের তৃতীয় তলার উত্তর পাশের অপরিসর হলরুমে অনাড়ম্বর পরিবেশে অনানুষ্ঠানিকভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম ইসলামী ব্যাংকটির উদ্বোধন করা হয়। 

 

ইসলামী ব্যাংকের এই অনানুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্য কোন দাওয়াত পত্র ছাপা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ব্যাংকের যাত্রা শুরুর ঘোষণা প্রচার করা হয়। কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি মৌখিক দাওয়াতে ঘরোয়া অনুষ্ঠানে জমায়েত হন। সেদিনই প্রথম শাখার প্রথম ব্যবস্থাপক হিসাবে অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে রূপালী ব্যাংক নওয়াবপুর শাখার জনাব মতিনউদ্দীন আহমদ বারো ভূইয়া যোগ দেন। (পরে তিনি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের এমডি ছিলেন।)

 

ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক লশকরের সভাপতিত্বে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে ভাইস চেয়ারম্যান জনাব মোহাম্মদ মফিজুর রহমান মেহমানদের স্বাগত জানান। অন্যান্যের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের নির্বাহী সহ-সভাপতি জনাব কফিলউদ্দীন মাহমুদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও বাংলাদেশ ইসলামিক ব্যাংকারস এসোসিশনের সভাপতি জনাব এম খালেদ, বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর ডাইরেক্টর জেনারেল জনাব এ.এফ.এম. ইয়াহিয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা পরিচালক জনাব এ.এস.এম. ফখরুল আহসান শুভেচ্ছা বক্তৃতা করেন। 

 

এ অনাড়ম্বর ঐতিহাসিক তাতপর্যমন্ডিত অনুষ্ঠানে প্রবীণ সাংবাদিক ‘দৈনিক দেশ’-এর সম্পাদক জনাব সানাউল্লাহ নূরী ও দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক জনাব আখতারুল আলম, বায়তুশ শরফের পীর সাহেব মওলানা আবদুল জব্বার, মওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, ঢাকার কালেক্টর অব কাষ্টমস জনাব শাহ আব্দুল হান্নানসহ ঢাকার কিছু বিশিষ্ট নাগরিক উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রথম ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী জনাব এম. আযীযুল হক। 

 

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর নামে এই ব্যাংকে প্রথম এই ব্যাংকে আল ওয়াদিয়া নীতির ভিত্তিতে প্রথম একটি চলতি হিসাব খোলেন ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব জনাব এএফএম ইয়াহিয়া। এ হিসাবটির মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম ইসলামী শরীয়াভিত্তিক ব্যাংকের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়। এ দিন ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ মোট ৪৯টি চলতি হিসাবে ৩৫ লাখ ১৩ হাজার পাঁচশো ৯ টাকা জমা হয়।

 

প্রথম দিনের হিসাব গ্রাহকদের মধ্যে ছিলেন আলহাজ্জ মফিজুর রহমান, ধানমন্ডীর মসজিদ-আত্-তাকওয়া সোসাইটি, জনাব এম আযীযুল হক ও মিসেস জাহানারা হক, জনাব মুহাম্মদ ইউনুছ, এডভোকেট মুজাম্মেল হক, ইঞ্জিনীয়ার মুস্তফা আনওয়ার, জনাব মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক লশকর, আকসা শিপিং, জনাব এম এ রশিদ চৌধুরী, হাফিজ ফয়েজ মোহাম্মদ, জনাব মোঃ আবদুর রাজ্জাক, জনাব মোহাম্মদ হোসেন, জনাব শফিউদ্দীন দেওয়ান, জনাব আহমদ হোসেন, জনাব নূরুল ইসলাম মজুমদার, জনাব মুহাম্মদ ইসমাইল হুসাইন, জনাব এস.ডি আলম ও জনাব এবিএম ফজলুল হক চৌধুরী। 

 

একজন সাংবাদিক হিসাবে আমি ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আইডিবির জন্ম পরবর্তি নিভিন্ন তাত্বিক প্রস্তুতি ও প্রায়োগিক বাস্তবায়নের কাজগুলির শুধু পর্যবেক্ষক ছিলাম না। নানা কাজে নানাভাবে অংশ নিয়ে কাছে থেকেই এসব অর্জনের সাক্ষী হয়েছি। ইসলামী ব্যাংকের মূলধনে যেসব দেশী-বিদেশি উদ্যোক্তা অংশ নিয়েছেন তার বাইরে বিরাট জনগোষ্ঠী ও কর্মীদল এর বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছেন। 

 

এ ব্যাংকের উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনে দেশী বা বিদেশী কারোরই আর্থিক লাভের ফিকির ছিল না। বরং তাদের অংশগ্রহণের পেছনে মূল প্রেরণা ছিল বিশ্বের এক দশমাংশ মুসলিম জনঅধ্যুষিত এ এলাকার মুসলিম জনগণের হালাল লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি। ব্যাংকের অন্যতম উদ্যোক্তা জাকিউদ্দীন আহমদ আত্মজীবনীতে লিখেছেন: ‘মূলত আবদুর রাজ্জাক লশকরের অনুরোধেই আমি ও মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ইসলামী ব্যাংকের স্পনসর হই। তিনি আমাদেরকে বললেন, ‘মনে করুন ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য এ টাকা আপনারা আল্লাহর পথে দান করছেন। এটি সদকায়ে জারিয়া। সুদ ছাড়া ব্যাংক চলতে পারবে এটা তখনো অকল্পনীয়। ব্যাংক সফল না হলে পুরা টাকা হারিয়ে যাবে। তবু আমরা ভাবলাম একটা মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি। এ টাকা সদকা হিসেবে আল্লাহর পথেই যাবে। ... আবদুর রাজ্জাক লশকর ইসলামী ব্যাংকের অনেক বড় স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। মফিজুর রহমান ছিলেন বিরাট প্রেরণাশক্তির অধিকারী। তাদের কথা শুনে শুনে আমরা উদ্বুদ্ধ হয়েছি। মোহাম্মদ ইউনুস ব্যাংকের জন্য স্থানীয় উদ্যোক্তা যোগাড় করতে বড় অবদান রেখেছেন। এছাড়া মোহাম্মদ মালেক মিনার, মোহাম্মদ হোসেন, নূরুয্যামান, হাজী বশিরউদ্দীন, অধ্যাপক আবদুল্লাহ, ইঞ্জিনীয়ার মোস্তফা আনোয়ার, দাউদ খান, ফজলুল হকসহ সকলেই এই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা ও অগ্রগতির জন্য পরিশ্রম করেছেন।’ 

 

তখন পাঁচ লাখ টাকা যোগান দেয়ার মতো দেশীয় উদ্যোক্তা যোগাড় করা সহজ ছিল না। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি বোঝার জন্য অনেককে বলেছি: যে ধরনের লোক ব্যাংক বানায় আপনি তেমন বড় লোক নন। কীসের আশায় এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় অংশ নিয়েছেন? তাদের প্রায় সকলের জবাব ছিলো জাকিউদ্দীন আহমদের মতো। দুনিয়ায় এ ব্যাংক সফল না হলেও হাশরে তারা তাদের এ বিনিয়োগের প্রতিদান আশা করেছেন। 

 

ব্যাংকের অন্যতম উদ্যোক্তা মোহাম্মদ হোসেন ছিলেন নর্থব্রুক হল রোডে স্পেয়ার পার্টেস-এর ব্যবসায়ী। যশোরে তার একটা অল্পবৃহত কোল্ডস্টোরেজ ছিল। তিনি আমার প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আযান শুনে সাড়া দিয়েছি। মানুষকে সুদের গুনাহ ও অভিশাপ থেকে মুক্ত করার এ চেষ্টা। এ ব্যাংক সফল হলে ব্যবসায়িরা হালাল ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ পাবেন। এ আযান শুনে মনে হলো কষ্ট করে হলেও লাখ পাঁচেক টাকা জোগাড় করতে পারব। আমরা যদি িইসলামী পদ্ধতির ব্যাংকের ছোট একটা মডেল তৈরি করতে পারি, তা-ই অন্যদের উদ্বুদ্ধ করবে। যদি ব্যাংক না হয় তবে দুনিয়াতে পাঁচ লাখ টাকা ফেরত পাব না কিন্তু আখিরাতে আল্লাহর কাছে এ উদ্যোগে সাড়া দেয়ার অছিলায় মাফ পাওয়ার আশা করি।’ 

 

এটাই ছিল সেন্টিমেন্ট। ব্যাংকের স্পন্সর আবদুর রাজ্জাক লস্কর, মফিজুর রহমান, মওলানা আবদুল জব্বার, হাজি বশিরউদ্দিন, মোহাম্মদ ইউনুছ, মোশাররফ হোসেন, মুহাম্মদ হোসেন, নাসির উদ্দিন, এম এ রশীদ চৌধূরী, নূরুয্যমান, একেএম ফজলুল হক, শফিউদ্দীন দেওয়ানসহ দেশীয় উদ্যোক্তাদের অনেকেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। বিদেশী উদ্যোক্তাদের মধ্যেও দুবাই ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাঈদ আহমদ লুতাহ, কুয়েত ফাইন্যান্স হাউসের চেয়ারম্যান আহমদ বা’যী আল-ইয়াসিন, ওআইসির সাবেক সহকারী মহাসচিব ফুয়াদ আবদুল হামীদ খতীবসহ অনেকেই আমাদের মাঝে নেই। ইসলামী ব্যাংকের সব ভালো কাজ তাদের জন্য সদকায়ে জারিয়াহ হবে, ইনশাআল্লাহ।

 

- মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান 

সাবেক এমডি, ইসলামী ব্যাংক। 


০ টি মন্তব্য      ৬১ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: