অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৩৩ জন ভিজিটর

বিয়ে করুন, সাবলম্বী হোন.........

লিখেছেন লাবিব আহসান বৃহস্পতিবার ৩১ মার্চ ২০২২
আহমদ ছফা ছিলেন চিরকুমার। এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'সারাজীবন বিয়ে করলেন না; এর কারণ কি?' জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'আদতে বিয়ে করার সাহস করে উঠতে পারি নি। বারবার মনে হয়েছে- বিয়ে করে বউকে নিয়ে থাকব কোথায়? খাওয়াব কি?'
তাঁর লেখা বিখ্যাত উপন্যাস 'অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী'কে তাঁর আত্মজৈবনিক উপন্যাস হিসেবে গণ্য করা হয়। এখানে তিনি তাঁর জীবনে আসা দুজন নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা অকপটে বর্ণনা করেছেন। সেই সঙ্গে বিয়ে করতে না পারার কারণ হিসেবে এই আতঙ্কটির কথাই বারবার উল্লেখ করেছেন।
আহমদ ছফার এই আতঙ্ক যে নিতান্তই অমূলক ছিল, তার যুৎসই একটা জবাব পেতে আমরা একটু ঘুরে আসতে চাই বাংলা সাহিত্যের আরেক দিকপাল আবুল মনসুর আহমদের জীবনের একটি ছোট্ট ঘটনা থেকে। বয়সের পরিসংখ্যানে আবুল মনসুর আহমদ আহমদ ছফার ঠিক পঁয়তাল্লিশ বছরের বয়োজ্যেষ্ঠ।
ঘটনাবহুল জীবনের অধিকারী এই মানুষটির জীবনে তখন নিদারুণ অর্থনৈতিক সংকট চলছে। ৮৫ টাকা বেতনের সাংবাদিকতার চাকরি ছেড়ে কলকাতা থেকে নিজ শহর ময়মনসিংহ চলে এসেছেন ওকালতি করতে। কিন্তু বিধি বাম! ময়মনসিংহে তাঁর ওকালতি জীবন শুরু হলো নিদারুণ নৈরাশ্যের মধ্য দিয়ে।
এক মাস, দুই মাস, তিন মাস এমনকী চার মাস চলে যায়; মক্কেলের দেখা নেই। ২৮ টাকা মাসিক ভাড়া দিয়ে তিনি ময়মনসিংহ শহরে একাকী একটি কক্ষে জীবন কাটান। স্ত্রী-পুত্ররা থাকে গ্রামের বাড়ি ত্রিশালে। খরচের ভয়ে সঙ্গে এনে রাখতে পারেন না। ফলতঃ তাঁকে নিজেই রান্না-বান্না করে খেতে হয়। এক পর্যায়ে সেই রুম ছেড়ে ৮ টাকা ভাড়ার একটি রুমে গিয়ে উঠতে হলো।
একদিনের কথা। আবুল মনসুর আহমদ রাতের রান্না উঠিয়েছেন; ভাত আর ডিম ভাজি। এমন সময় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন প্রবীণ মোখতার, তাঁর পিতৃতুল্য মুরব্বি খান সাহেব আলী। তিনি তাঁকে রান্না করতে দেখে বললেন-
'নিজে নিজে রান্না করে খাচ্ছ যে! বউমাকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসো না কেন?'
আবুল মনসুর আহমদ বললেন-
'ওদের নিয়ে এসে খাওয়াব কি? ওকালতির অবস্থা তো আপনি জানেন।'
খান সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন-
'আমি তোমাকে জেনেই এ কথা বলছি বাছা! রিজিকের মালিক তুমি নও, আল্লাহ। বউমা আর ছেলেদের ত্রিশাল রেখে এসেছ বলে আল্লাহ সেখানে ওদের রিজিক পাঠাচ্ছেন। ময়মনসিংহ নিয়ে এলে আল্লাহ তোমার কাছে ওদের রিজিক পাঠাবেন। আমার কথা বিশ্বাস কর।'
ঘটনাটির সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্টটা এখানেই। আবুল মনসুর আহমদের সেই পিতৃতুল্য মুরব্বি যে সহজ সত্যিটা বুঝতে পেরেছিলেন, আমরা তথাকথিত অতি উচ্চ শিক্ষিতরা এত বছর পরে এসেও সেই সহজ সত্যিটা উপলব্ধি করতে পারি না। কেবল নামকাওয়াস্তে আল্লাহর উপর ভরসা করি আর নিজেদেরকেই রিজিকের সবচেয়ে বড় মালিক ভেবে বসে থাকি।
ঘটনার পরের অংশটি ব্যক্ত করা ভীষণ জরুরি। আবুল মনসুর আহমদের নিজের জবানিতেই শোনা যাক- 'আমি তাঁর পরামর্শ মতো কাজ করিলাম। দিনে দিনে বুঝিলাম- খান সাহেবের কথা একেবারে মিথ্যা নয়। রোজগার বাড়িতে লাগিল। মক্কেল বেশ বাড়িল। অবশ্য মক্কেল যত বাড়িল, মেহমান বাড়িল তার চেয়ে অনেক বেশি।...তবুও খোদার ফজলে একরকমে চলিয়া যাইত। এইখানেই খান সাহেবের কথার সত্যতা আরো বেশি করিয়া ঠিক প্রমাণিত হইল।' [তথ্যসূত্রঃ আত্মকথা- আবুল মনসুর আহমদ, পৃষ্ঠা- ৪১৬]
কাজেই যারা আহমদ ছফার মতো আর্থিক দায়িত্ব নেওয়ার ভয়ে বিয়ে করার সাহস পাচ্ছেন না, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে আবুল মনসুর আহমদের জীবনের এই ঘটনাটি। অর্থাৎ, এখন আপনার হবু স্ত্রীর খোরপোষ পাঠানো হচ্ছে আপনার হবু শ্বশুরের পকেটে। যখন তিনি আপনার কাছে চলে আসবেন, তখন আপনার পকেটে পাঠানো হবে।
এ ব্যাপারে সবচেয়ে বড় মোটিভেশনটা দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তিনি বলেছেন- 'তোমাদের মধ্যে যাদের স্বামী নেই এবং যাদের স্ত্রী নেই, তাদের বিয়ে দিয়ে দাও। তারা যদি অভাবী হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করবেন।' [সূরা নূর- ৩২] আয়াতের এই অংশটি আবার পড়ুন- 'তারা যদি অভাবী হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করবেন।'
নবিজির ভাষ্যমতে- তিন ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহ নিজের উপর অবধারিত করে নেন। তাদের একজন হলো সে, যে নিজের চরিত্র হেফাজতের জন্য বিয়ে করে। [তিরমিজি, মেশকাত] ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন- 'তোমরা বিয়ে করার মাধ্যমে স্বাবলম্বন সন্ধান কর।' [তাফসিরে ইবনে কাছির- (৬/৫১)] সবচাইতে চমকপ্রদ উক্তিটি করেছেন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)- 'আমি ঐ ব্যক্তিকে দেখে আশ্চর্য হই, যে ধনী হতে চায় অথচ বিয়ে করে না।'

ইসলাম বিয়ে সাবলম্বন
০ টি মন্তব্য      ২০৬ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: