অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৩৭ জন ভিজিটর

আমাদের নায়কেরা.....

লিখেছেন লাবিব আহসান বুধবার ১০ নভেম্বর ২০২১

ছোটবেলায় বিটিভিতে বাংলা সিনেমা দেখা একটা নেশার মতো ছিলো। সম্ভবত বাংলাদেশের খুব কম তরুণ-তরুণীই আছে, যারা শৈশব-কৈশোরে এই নেশার কাছে পরাজিত হয় নি। যেদিন সিনেমায় নায়কের বিপরীতে অনেক ক'জন ভিলেন থাকতো, সেদিন আমরা মহা উৎকণ্ঠায় পড়ে যেতাম- 'এতো জন গুণ্ডাকে নায়ক একা কিভাবে সামলাবে! হে আল্লাহ, তুমি রক্ষা করো।'  সিনেমায় অধিকাংশ সময়ই দেখা যেতো নায়িকাকে গুণ্ডারা তুলে নিয়ে যাচ্ছে আর নায়িকা তারস্বরে চেঁচাচ্ছে, 'বাঁচাও..বাঁচাও...।' ঠিক এমন সময় অতিমানবীয় ভঙ্গিতে নায়ক উড়ে এসে পড়তো গুণ্ডাদের বুকে। আমরা প্রাণ ফিরে পেতাম- 'যাক বাবা! নায়ক চলে এসেছে। আর কোনো ভয় নেই।'

 

 

নায়কের সঙ্গে গুণ্ডাদের অনেকক্ষণ 'ডিশুম ডিশুম' চলার এক পর্যায়ে গুণ্ডারা ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে পালিয়ে যেতো আর নায়ক ঠোঁটের এক কোণের রক্ত মুছতে মুছতে এসে দাঁড়াতো নায়িকার সামনে। নায়িকা তখনও নায়কের সঙ্গে পরিচিত হয় নি। সে বিনয়ে গলে গিয়ে বলতো, 'আপনি না থাকলে আজ আমার সর্বনাশ হয়ে যেতো। আপনাকে কি বলে যে ধন্যবাদ....'। নায়িকাকে কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে নায়ক তখন গদগদ কণ্ঠে  বলতো, 'এ কিছু না। এ তো আমার কর্তব্য ছিলো।' তারপর হতো চোখাচোখি, মন দেয়া নেয়ার পালা এবং এরপরই গান- 'এতো দেখি তবু সাধ মেটে না যেন/ জীবনের শুরুতে আসো নি কেন....?' এ ছিলো বাংলা সিনেমার এক অতি পরিচিত এবং চিরন্তন দৃশ্য। 

 

 

মজার ব্যাপার হলো, এরকম সিনেম্যাটিক দৃশ্য আজ হতে কয়েক সহস্র বছর পূর্বেও সংঘটিত হয়েছিলো। তবে সেই দৃশ্যের নায়ক আজকের দিনের নায়কদের মতো করেন নি। করেছিলেন কিছু ব্যতিক্রমী আচরণ, যা কেয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য এক অবিস্মরণীয় শিক্ষা হয়ে টিকে আছে। সেই দৃশ্যের নায়কের নাম মুসা (আ.)। সে দৃশ্যের বর্ণনা দেয়া হয়েছে পবিত্র কুরআনের সূরা আল ক্বাসাসে। কুরআনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নবি হলেন হযরত মুসা (আ.)।

এ সূরায় আল্লাহর সাথে তুর পাহাড়ে সাক্ষাতের আগে তিনি যে জীবন অতিবাহিত করেছেন, সে ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। চলুন, প্রবেশ করি সেই সিনেম্যাটিক দৃশ্যে। 

 

 

মুসা (আ.) রুদ্ধশ্বাসে মিশর থেকে ছুটে চলেছেন মাদাইয়ানের দিকে। কারণ, তাঁর মাথার উপরে ঝুলছে হত্যা মামলা। ভুলক্রমে ঘুসি মেরেছিলেন এক ব্যক্তিকে।  বেচারা এতেই পটল তোলা সারা! কত শহর, বন্দর, নগর, মাঠ, ঘাট নদী পেরিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি। একপর্যায়ে এসে পড়লেন বিশাল এক ধূ ধূ মরুর বুকে। আল্লাহর সাহায্যে পেরিয়ে এলেন মরুভূমিও। উপনীত হলেন মাদাইয়ানে। সেখানে কিছু জলাশয় দেখতে পেয়ে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন এবং পানি পান করে তৃপ্ত করলেন তৃষিত পরান। এমন সময় দেখতে পেলেন কিছু লোক পশুকে পানি পান করাচ্ছে আর দুই নারী দূরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে কিন্তু সুযোগ পাচ্ছে না। লোকগুলো নারীদ্বয়কে জলাশয়ের কাছেই ভিড়তে দিচ্ছে না। 

 

 

এরপরে মুসা (আ.)- এর সঙ্গে তাদের যে কথোপকথন হলো, স্বয়ং কুরআন তার বর্ণনা দিচ্ছে, 'মুসা বললো, "তোমাদের কী ব্যাপার? তারা বললো, "আমরা আমাদের পশুগুলোকে পানি পান করাতে পারছি না, যতোক্ষণ ঐ লোকগুলো তাদের পশুগুলোকে নিয়ে সরে না যায়। আর আমাদের পিতা খুবই বৃদ্ধ।'" [সূরা ক্বাসাসঃ ২৩] মুসা (আ.) তাদের কথা শুনে বুঝলেন, তারা নিদারুণ অসহায় দুই নারী।  তিনি আর কথা বাড়ালেন না। তাদের পশুগুলোকে ভিড় সরিয়ে পানি করালেন এবং তাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন। এরপর মহিলাদ্বয়ের ধন্যবাদ দেবার সামান্যতম সুযোগও না দিয়ে দূরে গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলেন এবং দোয়া করলেন, "হে আমার প্রভু! চলার পথে আপনি আমার জন্য যা-ই রেখেছেন, নিঃসন্দেহে আমার সেটারই প্রয়োজন।" [সূরা ক্বাসাসঃ ২৪]

 

কী অনন্যসাধারণ এক দৃষ্টান্ত দেখুন! তিনি মহিলাদেরকে সাহায্য করার পরও তাদের কাছে নিতান্ত ধন্যবাদ পাবার আশা পর্যন্ত করছেন না। কারণ তিনি প্রশংসার জন্য সাহায্য করেন নি। না তিনি ধন্যবাদের অপেক্ষা করেছেন আর না কোনো অতিরিক্ত বাক্য বিনিময় করেছেন। বরং কাজটি করেছেন নিছক আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর কাছেই এর মূল্যায়নের প্রত্যাশা করেছেন। মেয়েদের সাথে নয়, বরং আল্লাহর সঙ্গে কথা বলতেই তিনি বেশি উদগ্রীব। বাংলা সিনেমার নায়কের মতো মেয়ে দু'জনের সঙ্গে ভাব জমিয়ে বসেন নি। আমরা সাধারণত কাউকে ছোটখাটো সাহায্য করলেও প্রতিদানে মনের গোপন কোণে কিছু পাবার প্রত্যাশা রেখেই দেই। মুসা (আ.) কিন্তু সেটা করেন নি। 


ইতিহাস মুসা আঃ
০ টি মন্তব্য      ২২১ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: