অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৫ জন ভিজিটর

সময় থাকতে সময়ের মূল অর্থ খুঁজলাম না.....

লিখেছেন লাবিব আহসান শনিবার ১৪ অগাস্ট ২০২১

সাবেক অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে যখন আমি খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগটি পাই, তখন তিনি মন্ত্রী হিসেবে তাঁর জীবনের শেষ সময়টি অতিবাহিত করছিলেন। তাঁর আগমন উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ফ্যাকাল্টিতে প্রায় এক মাস ধরে নানাবিধ প্রস্তুতি চলছিলো। পুরো বিজনেস বিল্ডিংটাই বলতে গেলে ধুয়ে মুছে ঝকঝকে করে ফেলা হয়েছিলো। রঙ লাগানো থেকে শুরু করে সাজসজ্জার নূন্যতম কমতি যেন না থাকে, কর্তৃপক্ষের সেদিকে ছিলো সজাগ দৃষ্টি। এমনকি তিনি যে প্রোগ্রামটিতে বক্তব্য দিবেন, তার সর্বনিম্ন টিকেট মূল্যই ধরা হয়েছিলো ৫০০ টাকা। 

 

গোটা ফ্যাকাল্টিতেই তখন ঈদ ঈদ ভাব বিরাজ করছিলো। আমি নিঃসঙ্গ প্রকৃতির নির্জনপ্রিয় মানুষ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আনন্দঘন জটলায় না ঘেঁষে একা একা ঘুরে বেড়ানোতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম। একা একা ঘোরার একটা বড় সুবিধা হলো, প্রচুর ভাবার সুযোগ পাওয়া যায়। কেউ ভাবনার মাঝখানে কথা বলে ভাবনায় ছেদ ঘটাতে পারে না। আমি ফ্যাকাল্টি জুড়ে আপন মনে ঘুরে ঘুরে সাজসজ্জা দেখতে লাগলাম। চারদিকে বড়ই সৌন্দর্য! ভেবে ভেবে আকুল হয়ে উঠলাম একজন মানুষের আগমন উপলক্ষে হাজারো মানুষের ছোটাছুটি আর কর্মব্যস্ততা দেখে। মনে হলো, কী সুখের এক জীবনই না তিনি পেয়েছেন! 

 

নির্ধারিত দিনে তিনি এলেন। গাড়ি থেকে নামলেন ধীর-স্থিরভাবে। শত শত কৌতুহলী চোখ অপলক তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। সেই শত শত চোখের মধ্যে আমার দুটো চোখও এই ছবি হৃদয়ের ক্যানভাসে টুকে নিয়েছিলো অনন্ত মহাকালের জন্য। তাঁর জন্য বিছানো হয়েছিলো টকটকে লাল রঙ্গের কার্পেট। সেই কার্পেট মাড়িয়ে তিনি এগিয়ে চললেন অডিটোরিয়ামের দিকে। সেখানে হাজারও মানুষ মুখিয়ে আছে তাঁর দর্শন লাভের জন্য। টিকেট দেখিয়ে আমিও ঢুকে পড়লাম বিশাল অডিটোরিয়ামে। জায়গা পেলাম একদম পিছনে। সেখানে চুপচাপ বসে তাঁর ইংরেজিতে দেয়া বক্তৃতা শুনলাম। 

 

জনাব মুহিতের ঝুলি জাগতিক নানাবিধ সাফল্যে টাইটুম্বর। মাত্র ২১ বছর বয়সে সেই পঞ্চাশের দশকে দেশসেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন। অধ্যয়ন করেছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দুই বিদ্যাপীঠ হার্ভার্ড এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও। হার্ভার্ড থেকে এমপিএ ডিগ্রী লাভ করেন তিনি। কর্মজীবনে এসে সরকারের অনেক বড় বড় পদ হোল্ড করেছেন। সফর করেছেন পৃথিবীর অসংখ্য দেশ। লেখালেখিতেও পিছিয়ে ছিলেন না সাবেক এ অর্থমন্ত্রী। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষা মিলে তিনি রচনা করেছেন ২১ টি গ্রন্থ। 

 

তাঁর রাজনৈতিক জীবন তো সোনা দিয়ে মোড়ানো। দেশের সবচেয়ে হেভিওয়েট নির্বাচনী আসন সিলেট-১ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমাদের দেশীয় রাজনীতিতে একটি কথা চালু আছে, 'সিলেট-১ আসনে যে দলের এমপি প্রার্থী বিজয়ী হয়, সে দল সরকার গঠন করে।' তিনি ছিলেন সেই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী আসনের একাধিকবারের এমপি। টানা ১০ বছর ছিলেন মন্ত্রীসভার সবচেয়ে প্রভাবশালী মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। তাঁর পারিবারিক জীবনও বেশ সমৃদ্ধ। ১৪ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়।  তাঁর সকল ভাই-বোন এবং তাদের সন্তানরা স্ব স্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। বিশেষত তাঁর ছোট ভাই ড. মোমেন বর্তমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সিলেট-১ আসনের সাংসদ। 

 

বৈবাহিক সূত্রে তাঁর স্ত্রী সৈয়দা সাবিয়া মুহিত একজন ডিজাইনার। তাঁদের সংসারে দুই পুত্র এবং এক কন্যা। সামিয়া মুহিত একজন ব্যাংকার এবং মুদ্রা নীতি খাতের একজন বিশেষজ্ঞ। তাঁদের জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহেদ মুহিত একজন বাস্তুকলাবিদ এবং কনিষ্ঠ পুত্র সামির মুহিত একজন শিক্ষক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এতো  অর্জনবহুল একটি জীবন পাওয়া সত্ত্বেও পুরো জীবনে নিজের চারদিকে হাজারো স্বজন আর সুহৃদে আবর্তিত থাকা এ মানুষটির শেষ জীবন কাটছে নিদারুণ নিঃসঙ্গতায়। আজ তাঁর জন্য নেই কোনো প্রোটোকল, নেই সেই সুসময়ের বন্ধুদের কেউই। 

 

আমার এ লেখাটির উদ্দেশ্য রাজনৈতিক নয়, জীবনবোধের জাগরণ। আমরা সারাটা জীবন ধরেই সফলতার পিছনে ছুটে মরি। একাডেমিক সফলতা, পেশাগত সফলতা, রাজনৈতিক সফলতা, পারিবারিক সমৃদ্ধি; আরও কত! আমাদের সে ছুটে চলায়, সে গৌরবগাঁথায় সবাই থাকেন, কেবল একজনের কথা মনে থাকে না; তিনি আমাদের রব। দিনশেষে যখন হুশ ফেরে তখন দেখি, এক জীবনের সব সফলতার ঝুলি আর সম্পদ হাতে নিয়ে বসে আছি নিঃসঙ্গ। পাশে নেই আত্মীয়-পরিজনদের কেউই। অথচ জীবনের সকল সাফল্য আর সমৃদ্ধির লক্ষ্য যদি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হতো, তাহলে পুরো পৃথিবীকে আমাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে দেয়ার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ গ্রহণ করতেন; এটা আমরা বুঝতে পারি না।

 

 


আবুল মাল আব্দুল মুহিত সাবেক অর্থমন্ত্রী জীবন বোধ
০ টি মন্তব্য      ২৮৪ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: