অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২০ জন ভিজিটর

ইসলামের সুধা...

লিখেছেন কহেন কবি সোমবার ০৯ অগাস্ট ২০২১
আমাদের এ হিন্দু পাড়ায় বেশিরভাগ লোক-ই কামার, কুমোর আর মুচি। তাই বলে এ গাঁয়ের যে সুনাম নেই তা কিন্তু নয়। গাঁয়ে জ্ঞানী গুণী, ধ্বনি সাহেব গণ ও আছেন বটে। আমরা যাকে গাঁয়ের মাথা মানি অক্ষয়চন্দ্র বাবু, সে-ই গ্রামটাকে সম্মানের আসনে টিকিয়ে রেখেছেন। বছর বছর তার বাড়ির উঠোন জুড়ে ধুমধাম সহকারে পূজা-আর্চা উদযাপন করা হয়। এই ধুমধাম সহকারে পূজা-আর্চা হয় বলেই আশেপাশের হিন্দু গাঁ গুলোর তুলনায় আমাদের গাঁয়ের সুনাম বেশি! সকলে যেন আমাদের গাঁয়ের নাম শুনেই মুখরিত। আর গাঁয়ের লোকদের ঠাকুর ভক্তি ও যেন আকাশচুম্বী!
[১]
আমি আর প্রদীপ মিলে ঠিক করেছি বাপ-দাদার পেশা বাদ দিয়ে নতুন পেশায় যোগ দিব। কামার, কুমোর আর মুচির পেশায় না জড়িয়ে আমরা দু'জন সিএনজি চালাবো ঠিক করেছি। ভেবেছিলাম গাঁয়ের লোকেরা বিষয়টা আড়চোখে দেখবে। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে অক্ষয়চন্দ্র বাবু সহ গ্রামের সবাই আমাদেরকে বাহবা দিতে লাগলেন। গ্রামের লোকদের সহযোগীতায় আমরা দু'জন সিএনজি নামাই রাস্তায়। পরবর্তীতে আমাদের দেখাদেখি কয়েকজন যুবক ছেলেও এই কাজে নেমে পরে।
মাস দু'য়েক হতে চললো আমাদের আয় ভালোই হচ্ছে। সিএনজি চালানো টা আমরা দু'জনেই বেশ উপভোগ করছি। চেনা-জানাও হয়ে গিয়েছে অনেক লোকের সাথে। গাঁ মাড়িয়ে আশেপাশের গাঁয়েও চলাচল হচ্ছে আমাদের।
"বুঝলি সঞ্জু, প্রতিদিন সকালে মাদ্রাসায় দিয়ে আসবার জন্য দু'জোন হুজুরের অনুরোধ পেয়েছি। ভাড়া টা তারা মাস হিশেবেই দিবে। ভালো টাকা ই দিতে চেয়েছে।"
"হুজুর লোক! এদের নিয়মিত গাড়িতে তোলা কি ঠিক হবে? যদি তাদের কারণে তোর উপর কাল নজর পড়ে। ঠাকুর যদি রেগে যায় তো।" প্রদীপের কথায় কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়ে উত্তর দিলাম আমি।
"আরে না, এমন কিছু হবে না। এর আগেও দুইদিন দিয়ে এসেছি তাদের। কথা শুনে ভালোই মনে হয়েছে। আর মানুষ তো মানুষের জন্যই বল। তাছাড়া আমি তো এমনি এমনি দিয়ে আসবো না। টাকার বিনিময়েই দিয়ে আসবো।"
"ঠিক আছে তাহলে। তবে ওদের কথায় ভরকে যাস না। শুনেছি হুজুররা ভীষণ ভয়ানক স্বভাবের হয়। মানুষকে সাত-পাঁচ বুঝিয়ে তাদের ধর্মে টেনে নেয়।" উপদেশের সুরে কথাটা বললাম আমি। প্রদীপ ও মাথা নেড়ে হ্যাঁ সম্মতি জানালো।
[২]
প্রদীপের হাবভাব ভালো ঠেকছে না। ইদানিং সে নিজের ধর্ম নিয়েও ঘাটাঘাটি শুরু করেছে। এভাবে চলতে থাকলে কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়াবে তার ঠিক নেই।
"দ্যাখ প্রদীপ, ধর্ম নিয়ে ঘাটছিস ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের ধর্ম যে ভুল এটা কেন খুজে বের করতে চাচ্ছি। নিজের বাপ-দাদার ধর্মকে হেয় করতে এতটুকুও কি বাধঁছে না তোর?"
"আমি তো হেয় করিনি। যদি এই ধর্ম সঠিক হয়ে থাকে তবে আমি এই ধর্মেই থেকে যাবো। নতুবা.."
"নতুবা মানে? তারমানে কি তুই ধর্মান্তরিত হওয়ার কথা ভাবছিস?"
"সেটা এখনো বলতে পারি না। ভাগ্যে কি আছে উপরওয়ালা জানেন।"
"বাহ, অই হুজুরদের মতো কথাবার্তা বলতে শিখে গেছিস দেখছি। আসলে অইদিন ওদের অনুরোধে রাজি হওয়াটাই তোর ভুল হয়েছে। এখনো সময় আছে এগুলো ঝেড়ে ফেল মাথা থেকে।"- কথাটা বলে রাগে গজতে গজতে প্রদীপের সামনে থেকে চলে আসলাম আমি।
এরপর প্রায় দু'মাস কেটে গেছে প্রদীপের সাথে আমার কোনো দেখা হয়নি। আসলে আমি ই দেখা করিনি। এমন একজন অকৃতজ্ঞের সাথে দেখা করবার ইচ্ছে আমার ছিল না। শুনেছি সে সত্যি ধর্মান্তরিত হতে চায়।
[৩]
ধীরে ধীরে এ কান ও কান করতে করতে গ্রামের সকলেই জেনে যায় প্রদীপের ধর্ম ত্যাগ করতে চাওয়ার কথা। গ্রামের মান রাখতে গ্রামের সবাই এই কথা আশেপাশে রটে যাওয়া থেকে বাঁচাতে চায়। তাই তারা সকলে প্রদীপের মুখ বন্ধ করতে তাদের বাড়িতে এক জোট হয়ে যায়। প্রদীপের বাবা-মাও সকলের সামনে ঘোষণা দিয়ে দেয়, ছেলে যদি ধর্ম ত্যাগ করতে চায় তবে তারাও ছেলে ত্যাগ করে দেবে। তাদের কথা শুনে সকলে তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
হঠাৎ সমাগম পূর্ণ সেই স্থানে অক্ষয় বাবু ও আসেন। তিনি এসে হুংকার দিয়ে বলেন প্রদীপকে ঘর থেকে বের করে বাইরে আনতে। তার কথা মতো প্রদীপের বড় ভাই তাকে টেনে হিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে আনে। কাল রাতেও যে প্রদীপের গায়ে মার পরেছে কিন্তু পেটে এখন অব্দি কোনো দানা-পানি পরেনি তা ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। গত দু'মাসে ওর সাথে আমার দেখা হয়নি। এর মাঝে ওর এত অধঃপতন দেখে আমার অন্তরে মোচড় দিয়ে উঠে। আমি বুঝতে পারি না কিসের টানে ও এত অত্যাচার সহ্য করেও ধর্ম ত্যাগ করতে আপ্রাণ সচেষ্ট!
[৪]
"বাবা প্রদীপ, তোমাকে আমরা ছোট থেকে চিনি। আমাদের চোখের সামনেই তুমি ছোট থেকে বড় হয়েছ। তোমাকে আমরা ভীষণ ভালো জানি। তবে হঠাৎ তোমার এই অকাজে আমরা ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। তুমি এখনি সবার সামনে বলো যে তুমি এই ধর্মেই থাকতে চাও। আমাদের এই ধর্ম ই সঠিক। বিনিময়ে তোমাকে আরেকটি সিএনজি এবং একটি ঘরসহ এক বিঘা জমি পুরস্কার হিশেবে দেওয়া হবে। এর বাইরেও যদি তুমি কিছু চাও তবে তাও দেওয়া হবে।" অবক্ষয় বাবু কথাগুলো বলে এক দৃষ্টতে তাকিয়ে থাকেন প্রদীপের দিকে।
গ্রামের উৎসুক জনতাও উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকেন প্রদীপের দিকে। এমন আহবান প্রদীপ নিশ্চয়ই ফিরিয়ে দিবে না। ওকে আমি বরাবর বুদ্ধিমান ছেলে হিশেবেই জানি। এগুলো ফিরিয়ে দেবার মতো বোকা ছেলে প্রদীপ নয়। কথাগুলো ভেবে মনে মনে ভীষণ খুশি হয়েছিলাম আমি। কারণ এরপর আমার জানের যিগার বন্ধুকে আমি আবার ফিরে পাবো ভেবেছিলাম।কিন্তু আমিসহ বাকি সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রদীপ বলে উঠে-
"আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই। মুহাম্মদ (স) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর ই প্রেরিত রাসুল। আজ আমাকে কেউই সত্য ধর্ম থেকে ফেরাতে পারবে না। আমার জীবন গেলেও আমি এই ধর্ম থেকে সরে আসবো না। আপনাদের মতো করে রাসুল (স) কেও গাড়-বাড়ি-নারীর লোভ দেখানো হয়েছিল। কিন্তু আমার রাসুল (স) সেদিন বলেছিলেন তার এক হাতে চাঁদ এবং আরেক হাতে সূর্য এনে দিলেও সে দ্বীন থেকে সরে দাঁড়াবে না। আমিও আজ আমার রাসুলের মতো করে ঘোষণা দিচ্ছি আমাকে হাজারটা সিএনজি আর হাজারটা বাড়ি-জমি দিলেও আমি ইসলাম থেকে বিচ্যুত হবো না।"
প্রদীপের কথা শেষ হতে না হতেই গ্রামবাসীরা তার উপর ঝাপিয়ে পরে। সবাই তাকে বেধড়ক পেটাতে থাকে। ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে গ্রামের মহিলারাও। তাদের মনে ভালোবাসা নেই আপনারা কিন্তু আবার এটা ভাবতে যাবেন না। প্রদীপের উপর এমন জুলুম তার দোষের কারনেই করা হচ্ছে। তার এত সাহস কেন হতে যাবে যে সে বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম হতে যাবে। আমাদের গাঁয়ের নিয়ম ই এমন, যে ধর্ম ত্যাগ করতে চাইবে তাকে জীবন ত্যাগ করতে হবে। প্রদীপের বেলাতেও এর ব্যতিক্রম হবে না। প্রদীপের কারনে গ্রামের সকলের উপর যেন ঠাকুর নারাজ না হয়ে যান তাই তাকে বলি দেবার উদ্দেশ্যে টেনে হিঁচড়ে কালি মন্দিরের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।
[৫]
প্রায় ৭ বছর পর দেশে ফিরছি। সিএনজি বিক্রি করে দিয়ে নতুন পেশার উদ্দেশ্যে আমেরিকা পাড়ি জমিয়েছিলাম। সময়ের এই পরিক্রমায় অনেক কিছুই পালটে গেছে। পালটে গেছে চিরচেনা সেই গাঁয়ের পরিবেশ ও!
দুপুরের খাবার খেয়ে হাটতে বেরিয়েছি। ক্রোশ দুই দূরের মুসলিম পাড়ার ভেতর দিয়ে হেটে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি একটা মসজিদের ভেতর বসে আছে প্রদীপ। প্রদীপকে দেখে ভেতরে গেলাম আমি। আমাকে দেখে ভীষণ খুশি হয়ে সালাম দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো সে।
তারপর বলতে লাগলো- "সেদিন তুই আমার হাতে-পায়ের বাধঁন না খুলে দিলে আজ আমি রব্বের কাছে থাকতাম। আমার জন্য সেদিন তোকেও ভীষণ মা'র খেতে হয়েছিল জানি আমি।"
সেদিন বলি দেবার জন্য কালি মন্দিরে নিয়ে বেধে রাখা হয়েছিল প্রদীপকে। আমি বুঝতে পারছিলাম না কিসের টানে প্রদীপ জীবন দিতে চাচ্ছে কিন্তু ধর্মে ফিরে আসতে চাচ্ছে না। এক প্রকার ঘোরের মধ্যেই চলে গিয়েছিলাম সেদিন আমি। ঘোরে থাকা অবস্থাতেই প্রদীপকে মুক্ত করে দিয়েছিলাম সেদিন।
কথায় কথায় জানতে পারি সেদিন বাধন খুলে দেবার পর প্রদীপ কোনো রকম হাটতে হাটতে অই হুজুর লোক দু'টোর বাড়িতে চলে যায়। এরপর তারাই ওর সেবা করে ওকে সুস্থ করে তোলে। এরপর ওকে প্রদীপ থেকে নতুন করে মুহাম্মদ করে তোলে।
আমিও সঞ্জু থেকে আলী হয়ে গিয়েছি ২ বছর হতে চললো। আমার আলী হবার পেছনে প্রদীপ তথা মুহাম্মদের ই অবদান বেশি। সেদিন প্রদীপের এমন দৃড় ভাষণে আমার মাঝে যে কম্পনের সৃষ্টি হয়েছিল তার সূত্র ধরেই আজ আমি আলী হয়েছি। দীর্ঘ ৫ বছর নিজের সাথে যুদ্ধ করে আমি শেষে ইসলাম ধর্ম ই গ্রহন করবো ঠিক করি। এরপর দুই বছর পূর্বে রবের দেওয়া সকল বিধিনিষেধ মানার সংকল্প করে ইসলামের সুধা পান করি।
[৬]
মুহাম্মদ ও আমি দু'জনেই নতুন সংসার পেতেছি। নিজেদের পরিচয় নতুন করে তৈরি করছি। কারণ মুসলিম হবার পর আমার বাবা-মা ও আমাকে ত্যাগ করে। আর মুহাম্মদ তো আগেই এসে পরেছিল। তবে আমাদের এতে কোনো আফসোস নেই। কারন আমরা যে মুসলিম এটাই আমাদের আসল পরিচয়।
আগেরবার আমি আর মুহাম্মদ দু'জনে যেমন সিএনজি চালানো শুরু করেছিলাম, এবার ও আমরা দু'জন মিলেই ছোট খাটো একটা কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেছি। পাশাপাশি অন্য ধর্মের মাঝেও ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে যাচ্ছি। এখন আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য একটাই, যত বেশি সংখ্যক মানুষ নিয়ে জান্নাহতে যাওয়া যায়।

ইসলাম জীবন জীবন ব্যবস্থা
০ টি মন্তব্য      ২৭৮ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: