অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৬ জন ভিজিটর

বৃষ্টিমুখর সকালে...

লিখেছেন জিবরান বুধবার ০৪ অগাস্ট ২০২১
ফজরের নামাজ শেষ করে বসছি পড়ার টেবিলে। সম্মুখ থেকে কয়েক ফোটা পানি এসে পড়লো টেবিলে। বৃষ্টির পানি। সামনের গ্লাস খোলা ছিল। উঠে গ্লাসটা টেনে দিলাম।
বাইরে দৃষ্টি দিলাম। শত দুঃখ কষ্ট মনের মধ্যে চেপে বসলে যেভাবে নীরবে আমাদের চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরে পড়ে, ঠিক তেমনি আকাশের বুক থেকে অঝোরে ঝরছে পানি। বুক চাপা দিয়ে রাখা শত ব্যাথার স্ফুলিঙ্গ ঘটছে যেন। চারিপাশ নিরবতায় ডেকে আছে।
লকডাউনে অফিস এবং গার্মেন্টস গুলো বন্ধ থাকায় পাশের গলিতে কোন মানুষের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে না। পাশের বস্তির ছেলে গুলো যেন আজ গভীর ঘুমে মগ্ন। হ্যাঁ, এমনি হওয়ার কথা। ছোটবেলা মা যেভাবে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ঘুম পাড়িয়ে দিত, আজকের বৃষ্টিমুখর সকালটা ঠিক তেমনই। বাসায় আমি একা। কোন সাড়াশব্দ নেই। নেই পাখিদের কল্লোল। কাক ডাকা ভোরটা যেন আজ উধাও হয়ে গেছে। নীরবতায় ঢেকে আছে চারিদিক। গভীর অরণ্যে যেন আমি একায় বসে আছি।
এই তো ক'দিন আগের কথা; যখন ভিন্ন চিত্র লক্ষ করছিলাম এক-ই স্থান থেকে। ফজর পড়ে টেবিলে বসার খানিকটা পরেই পুব দিক থেকে উদিত হওয়া সূর্য তার কিরণ রশ্মি তীক্ষ্ণভাবে আঘাত করতো সামনের বিল্ডিং এর গ্লাসে, আর সেই কিরণ ছুটে আসতো আমার চোখে-মুখে। আমি সামনের গ্লাসটা খুলে দিতাম। সাথে সাথে মৃদ বাতাস এসে আমায় স্পর্শ করতো আর প্রশান্তিতে ভরে যেত আমার মন-প্রাণ। পুরা আকাশটা নীলিমায় ভরে থাকতো। এদিক সেদিক ছুটাছুটি করতো পাখিদের দল। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বেড়ে যেত মানুষের চলাচলও। কিন্তু আজ তার কিছুই নেই। প্রকৃতি সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র ধারণ করছে আজ।
উপরে প্রকৃতির যে দুটি চিত্র অঙ্কিত হয়েছে মানুষের জীবনের প্রকৃতি কি তারচেয়ে ভিন্ন কিছু? নাহ। মানুষের জীবনের প্রকৃতিও অনুরূপ। এখানে দুটি চিত্র থাকে। একটি হয় বসন্তে ভরা, অপরটি হয় বর্ষার পানিতে টইটম্বুর। এ দুটি কখনো একসাথে আসে না। আসে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। তবে মানুষের জীবনে এই দু’টির সাক্ষাৎ ঘটবেই। যেভাবে ধরায় বসন্ত আর বর্ষার সাক্ষাৎ ঘটে।
কিন্তু আমাদের জীবনে যখন হঠাৎ বর্ষা নেমে আসে, বসন্তের নীলাকাশটা যখন মুহূর্তেই মেঘে ডেকে যায়, তখন কি আমরা সেই অবস্থায় অবিচল থাকতে পারি? ধৈর্য ধরতে পারি? নাহ, আমরা অনেকে পারি না। আমরা ভেঙে পড়ি। আমরা হতাশ হয়ে যায়। মনে করি জীবনে যেন আর কোন বসন্ত আসবে না। আসবে না পূর্বেকার সেই অবস্থায় আর। অথচ মেঘের ওপারে যে সূর্য হাসাহাসি করে তা আমরা বেমালুম ভুলে যায়। জীবনের বসন্তটা যে আবার ফিরে আসতে পারে সেই বিশ্বাস আমরা হারিয়ে ফেলি। আমরা হতাশ হয়ে আল্লাহর নিকট থেকে দূরে সরে যায়। অথচ আল্লাহ তাআলা বলছেন,
“তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” (সূরা যুমার-৫৩)
অন্য জায়গায় বলছেন,
“তোমরা উদ্বিগ্ন হয়ো না, কারণ আল্লাহ তোমাদের সাথে আছে।” (সূরা তাওবা-৪০)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন,
“ নিশ্চয় কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি।” অর্থাৎ বর্ষার সাথে আছে বসন্ত। (সূরা ইনশিরাহ-৬)
নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যখন প্রথম অহি আসার পর কিছুদিন অহি আসা বন্দ হয়ে যায় তখন তিনি মনঃক্ষুণ্ন হলেন। ভেঙে পড়তে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন ‘সূরা আদ দুহা’। সেখানে নবিজিকে সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলছেন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে ছেড়ে যাননি। বরং আপনাকে এমন কিছু দেয়া হবে যা পূর্বের চেয়েও উত্তম। এরপর পর্যায়ক্রমে অনেক গুলো সফলতা আসে নবিজির জীবনে সবচেয়ে বড় সফলতা- তাঁরই হাতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত লাভ করে। এজন্য আমাদের জীবনের বসন্ত যদি কখনো হারিয়ে যায়, মেঘে যদি ঢেকে যায় আমাদের নীল আকাশ, আমাদের চারিপাশ যদি পানিতে টইটম্বুর হয়ে যায়- তবুও আমাদের হতাশ হওয়া উচিত নয়; বরং আরো ভালো কিছুর জন্য ধৈর্য ধরে থাকতে হবে।
অনুরূপ কারো জীবনে যদি বসন্ত দোলা দিতে থাকে, দখিণা হাওয়া যদি সব দুঃখ ধুয়ে মুছে নিয়ে যায় - তখন অন্যের ব্যাপারে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠা উচিত নয়। উচিত নয় দম্ভভরে পথচলা। কারণ বয়ে চলা দখিনা হাওয়া মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে বসন্তের নীলাকাশটা মেঘে ঢেকে যেতে পারে। শুরু হতে পারে প্রচণ্ড কালবৈশাখী ঝড়। যে ঝড় সবকিছুকে মুহূর্তেই উলটপালট করে দিবে। এরকম কত ঝড় দেখেছি আমরা আমাদের আশপাশে তার কোন ইয়ত্তা নেই। সেজন্য বসন্তকে আমাদের গুরুত্ব দেয়া দরকার। আমাদের কাছে যখন সুসময় এসে চারিদিক আনন্দে আন্দোলিত করে তুলে, তখন আমাদের প্রয়োজন অমায়িকভাবে পথচলা। যেভাবে মক্কা বিজয় হয়ে যাওয়ার পরও অতীতের প্রতিশোধ না নিয়ে আল্লাহর রাসূল সমস্ত কুরাইশবাসী তথা মুশরিকদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

জীবন বাস্তবতা
০ টি মন্তব্য      ২৯৩ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: