অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৪ জন ভিজিটর

আমাদের দাম্পত্য জীবনে রাজনীতি.....

লিখেছেন লাবিব আহসান মঙ্গলবার ০৩ অগাস্ট ২০২১

বিয়ের দিন কতক বাদে স্ত্রী একদিন গভীর অনুযোগের সুরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনার চেহারার মধ্যে যতটা রোমান্টিক ভাব আছে, বাস্তবে আপনি ততোটা রোমান্টিক নন। আপনি আপাদমস্তক একজন রাজনৈতিক চিন্তাধারার মানুষ। বউয়ের সঙ্গেও সারাক্ষণ রাজনৈতিক টপিক নিয়ে আলাপ করতে পছন্দ করেন।" উল্লেখ্য, তখনও তাকে 'আপনি'র দেয়াল টপকিয়ে 'তুমি' তে আনতে পারি নি। তার কথা শুনে আমি একটা সলজ্জ হাসি হাসলাম। যে হাসির সরল বঙ্গানুবাদ করলে সম্ভবত দাঁড়ায়- "মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য।"

 

 

মনে মনে আওড়ালাম- "আমি তোমার কানে স্বর্ণ লতিকার দুল হতে চেয়েছিলাম। মেয়ে, শুধু ব্যথাটাই দেখলে? ভালোবাসাটা দেখলে না!" আমার ব্যক্তিত্বের রোমান্টিক সত্তাটাই যে তাকে নদীতে নৌকায় ঘুরতে নিয়ে এসেছে, তিনি সেটা বেমালুম ভুলে বসে আছেন। কেবল মনে রেখেছেন- নৌকায় বসে আমি কেন রাজনৈতিক টপিক নিয়ে আলাপ তুললাম, সেটা। মানবেতিহাসে এর চাইতে নিষ্ঠুরতম অপবাদ আর কি হতে পারে! তথাপিও স্ত্রীর প্রতি গভীর ভালোবাসার নিদর্শন স্বরুপ আমি সে অপবাদ প্রাগৈতিহাসিক কালের কসকো সাবানের মতো ঘষে ঘষে গায়ে মেখে ফেললাম। 

 

 

আমার এই গভীর রাজনৈতিক সত্তার পরিচয় পেয়েই কিনা জানি না, একদিন তিনি রকমারি থেকে আমার জন্য একটা রাজনৈতিক বই অর্ডার করে ফেললেন। বইয়ের নাম- "Wetness To Surrender." বইয়ের লেখক সিদ্দিক সালিক; যিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন অফিসার ছিলেন এবং ১৯৮৮ সালের ১৭ আগস্ট পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের সফরসঙ্গী হিসেবে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন।

 

 

তিনি আমার হাতে বই তুলে দিতে দিতে বললেন, "একটা ব্যাপার কি লক্ষ্য করেছো, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ উভয় রাষ্ট্রই প্রায় কাছাকাছি সময়ে দুই জিয়ার শাসনাধীন ছিলো? বাংলাদেশে জেনারেল জিয়াউর রহমান আর পাকিস্তানে জেনারেল জিয়াউল হক। দুজনই ছিলেন সামরিক শাসক। দুজনই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, মৃত্যু অবধি দুজনই তাঁদের রেপুটেশন ধরে রাখতে পেয়েছিলেন।" আমি আরবী ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষার্থী এ তরুণীর রাজনৈতিক সুক্ষ্মদর্শীতায় চমৎকৃত হলাম এবং মনে মনে গুনগুন করে উঠলাম- "মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না/ কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে, তোমারে দেখিতে দেয় না।"

 

 

আমি কিঞ্চিৎ চিন্তা-ভাবনা করে আরও একটা মিল খুঁজে পেলাম। দুই দেশের দুই জিয়ার শাসনামলেই দুজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ফাঁসি কার্যকর হয়েছিলো। পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টো আর বাংলাদেশে কর্ণেল তাহের। তথাপিও বাংলাদেশে প্রেসিডেন্ট জিয়ার জনপ্রিয়তা একটুও কমে নি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ পেয়েছিলাম। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভীষণভাবে ক্ষুন্ন হয় জনগণের মৌলিক অধিকার। বিচার-বিভাগ এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপসহ দেশে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। আইনশৃঙখলার অবনতির কারণে ব্যাক্তি জীবন হয়ে উঠে অনিরাপদ। 

 

 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সেনা অভ্যুত্থানে তখনকার সরকারের পরিবর্তন হয়। সে বছরের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার স্বতঃস্ফুর্ত বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরু দায়িত্ব পান তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।  বলা হয়ে থাকে এ দেশের মানুষ তাঁর শাসনামলেই স্বাধীনতার সত্যিকার সুফল ভোগ শুরু করেন। বাংলাদেশের উন্নয়নের রুপকারও বলা যায় তাকে। উন্নয়নমুখী কাজগুলোর সূচনাও হয়েছিল তার শাসনামলে। একদলীয় শাসনব্যবস্থার বদলে তিনি প্রর্বতন করেন বহুদলীয় গণতন্ত্র। সংবাদপত্র ফিরে পায় স্বাধীনতা। সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা ও মান উন্নয়নেও গ্রহণ করা হয় নানা পদক্ষেপ। 

 

 

 

জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেই দেশে কৃষি, শিল্প এবং গণশিক্ষা বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। খাল খননসহ বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্নতা অর্জন করে। আসে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। আইনশৃঙখলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। জনজীবনে ফিরে আসে শান্তি। গত পাঁচটি বছর ‘দেশ শাসনের’ পর এবার আওয়ামী লীগ একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চাপাল। প্রধান বিরোধীদলের নির্বাচন বর্জন সত্বেও আজ্ঞাবহ কিছু দল নিয়ে ‘নির্বাচন’ করল তারা। সংবিধানের তোয়াক্কা না করে, আন্তর্জাতিক দাবি আগ্রাহ্য করে দশম সংসদ নির্বাচনের নামে প্রহসন করা হল। যাতে মাত্র ৫ শতাংশ ভোটারের অংশগ্রহণ ছিল। 

 

 

 

নির্বাচনে জনগণের বড় অংশই সাড়া দেয়নি। অর্ধেক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হওয়া, বিদেশি পর্যবেক্ষক না থাকা, ভোটের দিনও শতাধিক কেন্দ্রে একজন ভোটারও না যাওয়া, নির্বাচনে সর্বাধিক সহিংসতা- এসব কারণে দেশে ও দেশের বাইরে রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ এই নির্বাচন। কিন্তু বৃহৎ এই জনমত পায়ে ঠেলেই আওয়ামী লীগ নব্য ‘বাকশাল প্রতিষ্ঠা’ করল। আওয়ামী লীগ গত ৫ বছরে দেশের প্রতিটি সেক্টরে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের আক্রোশ থেকে রক্ষা পায়নি সুশীল সমাজও। নানাভাবে হয়রানি ও অপমানের শিকার হচ্ছেন রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিকরা।


রাজনীতি দাম্পত্য জীবন জিয়া
০ টি মন্তব্য      ৩৪৮ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: