অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৪ জন ভিজিটর

আমার বিয়ের গল্প....

লিখেছেন লাবিব আহসান রবিবার ২৫ জুলাই ২০২১

ছাত্রজীবনে বিয়ের সিদ্ধান্তটি ছিলো আমার জীবনে নেয়া সবচেয়ে দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি। এই চমৎকার পরিবারটির পক্ষ থেকে প্রস্তাব লাভের পর আমাকে এক গভীর সিদ্ধান্তহীনতার ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে। দিনের পর দিন ইস্তেখারা করতে হয়েছে। ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে আলোচনার পর আলোচনা করতে হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। 

 

ঘটক মহাশয়া প্রবল আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করেন- "কি? সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছো?" আমি লজ্জায় নত হয়ে বলি- "না, এখনও নিতে পারি নি।" সে বড্ড জটিল এক সময় জীবনের! আমার পারিপার্শ্বিকতা এবং জীবন বাস্তবতা বিয়ের পক্ষে কথা বলছিলো না। যে অল্প কতক আপনজন এই প্রস্তাবটার ব্যাপারে আমাকে মোটিভেট করে বলেছিলেন- "এমন প্রস্তাব হাতছাড়া করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না", আমি তাদের দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে থাকি। এ করুণ দৃষ্টি বুদ্ধিমান হতে না পারার জন্যই হয়তো। 

 

বিয়ের আলোচনার এক পর্যায়ে আমাকে পাত্রীর মায়ের সঙ্গে কথা বলতে হলো। আমি আমার জীবনের সকল দৌর্বল্য এই নারীর সামনে উপস্থাপন করলাম, একটুও আড়াল করলাম না। ছোটবেলা থেকে বয়ে বেড়ানো অসুস্থতা কিংবা বিমাতার জটিল সংসারে যে আমারই ঠিকঠাক জায়গা হয় না; তার সবই বললাম। ভাবোদয় হলো, এতো জটিলতা জেনে নিশ্চয়ই কন্যার মাতা ঘটককে এক হাত নিয়ে বলবেন- "এ কোন রাস্তার ছেলেকে ধরে এনেছো!"

 

এ পর্যন্ত-ও স্মরণ করিয়ে দিলাম যে, "আপনার কন্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। চাইলে আপনারা নির্ঝঞ্ঝাটে আরও যোগ্য ছেলে পেয়ে যাবেন। বরং অন্যান্য প্রস্তাবগুলো নিয়েই ভাবুন।" তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন- "আমি তোমার সম্পর্কে সব জেনে শুনেই তোমার হাতে মেয়ে তুলে দিতে চাচ্ছি রে ব্যাটা!" আমার দীর্ঘ অনাদর-আবহেলায় ছেয়ে যাওয়া হৃদয় আচ্ছন্ন হয়ে উঠলো। চোখ ছলছল করে এলো অশ্রুতে। 

 

আমার জীবনের সবচেয়ে অভিভূত হবার মুহূর্তটির কথা বলি। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। এবার কন্যা সম্প্রদানের পালা। চারদিকে মহিলা বেষ্টিত হয়ে আমি লাজুক মুখে বসে আছি। জীবনে এমন অভিজ্ঞতা তো আগে কখনও হয় নি। কন্যার মাতা এলেন আমার হাতে মেয়ে তুলে দিতে। মেয়ে তুলে দিতে দিতে তিনি তার জঠরে লালন করা কন্যাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- "তোমার কাছে আমার একটাই অনুরোধ, আমার ছেলেটা যেন তোমার কাছে কোনোদিন কষ্ট না পায়!" শুনে আমি বিস্ময়াভিভূত হলাম এবং ঠিক সেই মুহূর্তে এই মহীয়সী নারীর আদরের রাজকন্যাকে ভালোবেসে ফেললাম। 

 

আম্মুর মৃত্যুর ৮ বছর পেরিয়েছে। এ দীর্ঘ সময়ে আমি পারিবারিক ভালোবাসার নূন্যতম স্পর্শও পাই নি। কোথায় খেয়েছি, কোথায় থেকেছি; তার কোনো ঠিক ঠিকানা ছিলো না। বিস্ময়কর এক বোহেমিয়ান জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। মন্দ ছিলো না সে জীবনটাও। হঠাৎ মুক্ত জীবনে একটি শেকল অনুভব করলাম। ভালোবাসার শেকল। দেশের দূর প্রান্তের হাওড় বিধৌত অঞ্চলের একটি নতুন পরিবারের ভালোবাসার শেকলে আমি বন্দী হয়ে পড়েছি। দীর্ঘ জীবনের অনভ্যস্ততাহেতু আমার স্বাধীনসত্তা কেবলই পালাই পালাই করছে। কিন্তু আর পালানোর সাধ্য আমার কোথায়! 

 

বদলে গেছে আমার জীবনের স্রোতধারা। এখন প্রবল ব্যথায় বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে আধো ঘুম আধো জাগরণে একটি প্রবল শূন্য ঘরের ফ্যাকাসে দেয়াল দেখি না। দেখি এক সাড়ে ঊনিশ বছর বয়সী মমতাময়ী তরুণীর অশ্রুভেজা চোখ। অসহ্য ব্যথায়ও আমার হৃদয় পুলকিত হয়ে ওঠে। মনে হতে থাকে, এ জীবন তুচ্ছ- ঠুনকো- খড়কুটো নয় তো। এখন দীর্ঘ পথ জার্নিতে থাকলে কোরআনের হাফেজা এক মহীয়সী মা আমার জন্য রাত জেগে বসে থাকেন। জীবন এতো ভালোবাসা আমার জন্য জমিয়ে রেখেছিলো, ঘুণাক্ষরেও ভাবি নি তো কখনও। যে পরিবারটি আমার মতো চালচুলোহীন কপর্দকশূন্য রাস্তার ছেলের ধূসর জীবনকে রঙ্গিন করতে এগিয়ে এলো, পরম করুণাময় তাদের উপরে বর্ষণ করুন অঝোর করুণাধারা।


বিয়ে ছাত্রজীবনে বিয়ে
০ টি মন্তব্য      ৩৪৯ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: