অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৬ জন ভিজিটর

নবিজির জীবনে পাদ্রী বুহাইরার ঘটনা কতটুকু সঠিক...

লিখেছেন জিবরান সোমবার ১২ জুলাই ২০২১
নবিজির জীবনী-সংক্রান্ত অনেক ঘটনাই কিন্তু হাদিস সংকলন গ্রন্থগুলোতে নেই। এগুলো আছে ইবনু ইসহাক বা ইবনু সাদ রচিত জীবনীগ্রন্থগুলোতে। হাদিসের বইয়ের তুলনায় এসব বইতে ঘটনার শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ে কিছুটা শিথিলতা অবলম্বন করা হয়।
 
সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসাই, ইবনু মাজাহ, মুসনাদ আহমাদ, সুনান দারিমি এগুলো ইসলামি আইন ও আচারের মূল বই। হাদিসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে এসব বইতে কঠোর নীতি অবলম্বন করা হয়। কিন্তু জীবনীগ্রন্থগুলোতে অতটা কঠিনভাবে বিশুদ্ধতা যাচাই করা হয় না। এজন্য দেখবেন, সিরাহ বইতে থাকা অনেক ঘটনা বিশুদ্ধতার নিরিখে অতটা উত্তীর্ণ নয়। কিন্তু তারপরও অনেক সময় ওগুলো বলায় সমস্যা নেই। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু সমস্যা দেখা যায়। এখন যে ঘটনাটি বলব, এটা তেমনই এক ঘটনা।
 
ঘটনাটি এমন : নবি সা. তখনো নাবালক। বয়স ১১ কি ১২। চাচা আবু তালিব তাঁকে নিয়ে সিরিয়াতে গিয়েছিলেন এক বাণিজ্য-কাফেলার অংশ হিসেবে। হাদিসটিতে আবু বকর ও বিলালের নামও আছে। বলা হয়, তারা এক আশ্রমের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে বুহাইরা নামে এক পাদ্রী থাকতেন। দিনের বেলায় কাউকে তিনি সময় দিতেন না। কিন্তু সেদিন নাকি তিনি নিজের বের হয়ে বাণিজ্য-কাফেলাটি খুঁজে বের করেন। দাওয়াত করে তাদের নিয়ে আসেন নিজের কুটিরে। তারা এই দাওয়াতের কারণ জানতে চাইলেন। তিনি জানালেন, ‘তোমাদের মাঝে এক ছেলে আছে, সে নবি হবে। আমি দেখেছি, মেঘ তাকে ছায়া দিচ্ছে। গাছ তাঁকে ছায়া দিচ্ছে। পাথর তাকে সেজদা করছে।’
 
ঘটনাটিতে আরও বলা হয়, খাবারদাবারের সময় রোমান সেনারা নাকি এসেছিল। তারা নাকি জানতে পেরেছিল, আশেপাশে কোথাও ভবিষ্যৎ নবি এসেছেন। তাকে খুঁজে মেরে ফেলতে এসেছিল ওরা। পাদ্রী বুহাইরা তখন তাদের লুকিয়ে রাখেন এবং বলেন, শিগগিরই যেন তারা চলে যায়। আবু বকর ও বিলালকে দিয়ে তখন কিশোর মুহাম্মাদকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
 
কোনো কোনো মনীষী ঘটনাটিকে আপাত-অর্থে গ্রহণ করে নিয়েছেন। তবে ইমাম জাহাবি ও ইবনু কাসিরের মতো সূক্ষ্মদর্শীরা ঘটনাটির শুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইসলামের মনীষীদের মধ্যে ইমাম জাহাবি ছিলেন অন্যতম সূক্ষ্মদর্শী আলিম। সবকিছুকে তিনি আপাত-অর্থে গ্রহণ করতেন না। বিভিন্ন ঘটনাগুলো নিয়ে তিনি গভীরভাবে ভাবতেন। আমাদেরও এমন হওয়া উচিত। ঘটনাটি সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, ‘এই ঘটনা কীভাবে ঠিক হয়? আবু বকর তো তখন ছোটো। তাঁর সাথে তো আবু বকরের কোনো সম্বন্ধ ছিল না। তিনি কেন ওই কাফেলায় আসবেন? আর বিলালের তো তখনো জন্মই হয়নি। আর ইসলামে আসার আগে তো আবু বাকরের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কই ছিল না।
 
মেঘ যদি তাঁকে ছায়া দিয়েই থাকে, গাছ কেন আবার তাঁকে ছায়া দেবে? আর পরে বড়ো হয়ে আমরা কেন দেখি না, নবি সা. চাচাকে সেদিনের ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন? বুহাইরা যদি সেদিন কাফেলার লোকজনদের সামনে বলেই থাকেন মুহাম্মাদ একদিন নবি হবে, তা হলে কুরাইশদের মেনে নিতে এত সমস্যা হবে কেন? আর হিরা পর্বতগুহায় জিব্রিল আ. যেদিন এলেন, নবিজি সেদিন অপ্রস্তুত হলেন কেন? কেন এত ভয় পেলেন? খাদিজাকেই-বা রা. কেন তাঁকে নিয়ে যেত হলো ওয়ারাকার কাছে?’
 
প্রথমত, কোনো কোনো আলিম বলেন, তাহলে পুরো ঘটনা থেকে আবু বকর আর বিলালের অংশটুকু বাদ দিয়ে বাকিটুকু গ্রহণ করা যাক। কিন্তু কথা হচ্ছে, ইসলামি ঘটনার বেলায় আমরা এরকম ইচ্ছেমতো গ্রহণ-বর্জন করতে পারি না। বাদ দিলে পুরোটাই দিতে হবে।
 
দ্বিতীয়ত, এই ঘটনা থেকে অমুসলিম সমালোচকেরা একটা ফাঁক পায় নবিজির নবিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার। তারা বলেন, ‘এই তো, এই বুহাইরার কাছ থেকে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের সম্বন্ধে সব জেনেছেন তিনি।’
ওই সময়ের কুরাইশদের কাছে ইউসুফ, মুসা কিংবা ইসা নবির কোনো পরিচিতি ছিল না। মক্কার লোকজন ইহুদি-খ্রিষ্টানদের সম্বন্ধে বলতে গেলে কিছুই জানতেন না। কোনো গ্রন্থাগার বা বাইবেলের নতুন পুস্তক, পুরাতন পুস্তক কিছুই ছিল না। অথচ কুরআনে আমরা দেখি ইহুদি-খ্রিষ্টান, বনি ইসরাইলদের সম্বন্ধে নানা ঘটনার বর্ণনা। মক্কার এক অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষ কীভাবে এসব ঘটনা বর্ণনা করবেন, তার কোনো সদুত্তর নেই প্রাচ্যবিদদের কাছে। এই ঘটনার জের ধরে তারা বলে থাকেন, সেদিন বুহাইরার কাছ থেকে তিনি এসব ঘটনা বিস্তারিত জেনে থাকবেন।
 
কথা হলো, বুহাইরার সাথে নবিজির দেখা হওয়ার ঘটনাটা যদি সত্যও হয়, তারপরও তাদের দাবি খুবই উদ্ভট। মাত্র এক ঘণ্টা-দেড় ঘণ্টায় কীভাবে তিনি ইহুদি-খ্রিষ্টানদের পুরো ইতিহাস জেনে ফেললেন? আর বাকি জীবনে একবারও সে সম্বন্ধে কিছু না বলে, বললেন ৪০ বছর পর?
 
সে যা হোক, আমরা বলি এই ঘটনাটি ঠিক নয়। যেসব আলিম ঘটনাটিকে বানোয়াট বলেন, আমরা তাদের সাথে একমত।
 
ইসলামের ইতিহাসে বহু মানুষ হাদিস বানিছেন। কেউ ভালো উদ্দেশ্যে, কেউ-বা খারাপ। একটা খুব মশহুর জাল হাদিস আছে, কুরআনের সব সূরার নির্দিষ্ট ফজিলত আছে। হাদিসটি যিনি বানিয়েছেন, একদিন ইমাম আহমাদ তাকে পাকড়াও করেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন, কেন তিনি এ কাজ করলেন। লোকটি বললেন, ‘ফিকহ আর ইতিহাস-চর্চা নিয়ে যারা ব্যস্ত, আমি চেয়েছি তারা যেন কুরআনের দিকে ফেরেন।’
 
তাহলে দেখা যাচ্ছে, সৎ উদ্দেশ্যেই হাদিসটি বানিয়েছেন তিনি। কিন্তু তারপরও কোনোভাবেই হাদিস বানানোর অনুমোদন নেই। এজন্যই আমাদের আছে ‘উলুমুল-হাদিস’ বা হাদিসের জ্ঞান নামে এক শাস্ত্র।
সিরাগ্রন্থগুলোতে মানুষ এমন এমন কিছু গল্প ঢুকিয়ে দিয়েছে, মনে হয় ঘটনা যা না, তারচেয়ে অনেক বেশি কিছু। যেমন, শোনা যায় নবিজির কোনো ছায়া ছিল না। এটা কিন্তু আপনি ইবনু ইসহাকে পাবেন না। পাবেন ওই সময়ের শত শত বছর পর রচিত সিরাহগ্রন্থে। আমাদের এসব বানোয়াট গল্পের প্রয়োজন নেই। আমাদের নবিজি এগুলো ছাড়াই সব সৃষ্টির সেরা। উলটো এগুলো আমাদের ধর্মের বদনাম ছড়ায়।
সেরা জীবনব্যবস্থা সম্বন্ধে যতখানি জানা প্রয়োজন, আল্লাহ আমাদের তার সব জানিয়েছেন। ফজিলত সম্বন্ধে বিশুদ্ধ হাদিসগুলোই যথেষ্ট। এজন্য নতুন কিছু বানানোর দরকার নেই।
তাহলে আমাদের বিবেচনায় বুহাইরা পাদ্রীর সাথে দেখা হওয়ার ঘটনাটি বানোয়াট। সাধারণ জ্ঞান থেকেও বোঝা যায়, ঘটনাটি দুর্বল। আল্লাহ ভালো জানেন।

নবি জীবন পাদ্রী বুহাইরা
০ টি মন্তব্য      ৪৬৩ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: