অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৪২ জন ভিজিটর

চোতরা পাতার ফাতরামি...

লিখেছেন Nazrul Islam Tipu বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর ২০২০
বাংলাদেশের সর্বত্র এটাকে চোতরা পাতা বলেই চেনা হয়। গ্রাম-বাংলায় সালিশ বিচারে কখনও চোরকে, চোতরা পাতা দিয়ে পিটানো হত। এই শাস্তির কথা শোনা মাত্রই চোর হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠত। চোর বেতের আঘাতকে ততটুকু ভয় করত না, যতটুকু ভয় করত চোতরা পাতার শাসন কে।
হয়ত ভাবছেন, বর্তমান সময়ে যেভাবে, লাটি দিয়ে বেদম পিটিয়ে চোর-ডাকাতকে মেরে ফেলা হয়। চোতরা পাতার লাটিও বুঝি সে ধরনের! বিলকুল ভুল ধারনা! চোতরা গাছে কোন লাটি হয়না। খুবই নিরীহ কাণ্ড বিশিষ্ট গুল্ম। মরিচের চারার মত উচ্চতা হয়। এই গাছের পাতা কিংবা সতেজ কাণ্ড কারো শরীরে আলিঙ্গনের মত একবার চোয়ালেই কর্ম সাবাড়! বাকি কাজ চোতরা পাতার। তাই এই গাছ দিয়ে চোরকে পিটানোর দরকার হতনা, গায়ের সাথে একবার লাগিয়ে দিলেই চলে।
বাংলায় 'ফাতরা' বলে একটি শব্দ আছে যার অর্থ গায়ে পড়ে ইতরামি করা, ব্যক্তিত্বহীন, ওজনহীন, বাজে-হালকা কথার মানুষ! ফাতরা চরিত্রের মানুষের একটি অভ্যাস চোতরা পাতার মধ্যে বিদ্যমান আছে। ফাতরা থেকে চোতরা শব্দের উৎপত্তি কিনা কিংবা এই নামের পিছনে মূল রহস্য কি তা আজো বের হয়নি। মূলত 'চোতরা' গাছের প্রকৃত বাংলা নাম হল 'বিছুটি' গাছ। এটি বইয়ের ভাষা, ভদ্রলোকের ব্যবহার্য ভাষা। তারপরও এই গুল্মটিকে 'চোতরা' হিসেবেই মানুষ বেশী চিনে থাকে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Tragia involucrata.
এই গাছটি একেবারেই নিরীহ। অন্যান্য গাছের ফাঁকে, ঝোপের ফাঁকে অনাদরে উকি মেরে থাকে। সারা গায়ে ক্ষুদ্র কাটার ন্যায় অসংখ্য লোম থাকে। এগুলোকে ট্রাইকোম বলে। এসব ধারালো, লম্বা, স্বচ্ছ ও ভঙ্গুর যে মানুষ খালি চোখেই দেখেই না। কৌতূহল বশত নিরিখ করে পরখ করতে গেলে, নিজের অজান্তেই চামড়ায় ফুটে যায়। গাছটির অভ্যাস দেখে মনে হবে এটি বড় ফাতরা প্রকৃতির! সে যেন তক্কে তক্কে থাকে কে কখন তার কাছাকাছি আসবে! সুযোগে পেলে গায়ে পড়ে প্রাণীদের গুঁতিয়ে দেবে! গাছের এই চরিত্রটি মানুষের ফাতরামি চরিত্রের সমার্থক হয়ে যায়। সে কারণে বাঁদরের মত ইতর প্রাণীও তার আশপাশ থেকে দূরে থাকে।
মানুষ তো বটেই, লোম সদৃশ প্রাণীরা পর্যন্ত এই গাছটির আক্রমণ থেকে রেহাই পায় না। পরিষ্কার মাঠে ঘাস থাকে কম কিন্তু অনেক সময় ঝোপের পাশে লম্বা ঘাস জন্মায়। সতর্ক প্রাণীরা বিছুটি পাতার ভয়ে, সাধারণ গুল্মের এসব ঝোপ এড়িয়ে চলে। কিংবা তারা আগে ঘ্রাণ নিয়ে পরখ করে দেখে আশে পাশে চোতরা কিংবা বিছুটির গাছ আছে কিনা।
গাছটির কাছাকাছি হলেই কাঁটার মত ট্রাইকোমের মাথা ভেঙ্গে যায়। ট্রাইকোমের ভিতরটা ইনজেকশনের নিডলের মত ফাঁপা। এটাকে উদ্ভিজ্জ নিডল বলা যায়। সেখান থেকে দ্রুতগতিতে বের হতে থাকে হিস্টামিন, অ্যাসিটাইলকোলিন, সেরোটোনিনের মত তরল পদার্থ। এই তরল পদার্থ গুলোই মূলত চুলকানির অন্যতম কারণ। এলার্জি বলে একটি কথা আছে। কারো শরীরে কোনক্রমে উপরের তরল গুলোর প্রাধান্য হলেই চুলকানি শুরু হয়। চোতরা গাছ এমন একটি গাছ যেটা চুলকানি তথা এলার্জির উপাদান দিয়ে ঠাসা।
চামড়ায় বিছুটি পাতার হুল লেগে থাকলে ঔষধ খেয়েও নিস্তার পাওয়া যায়না। তখন শরীর চুলকাতে ইচ্ছে করে। চুলকানি আর ঘষার কারণে চামড়া বিবর্ণ হয়ে ফুলে উঠে। পরিপূর্ণ ভাল হতে দুই/তিন দিন লেগে যায়। এটি একটি কার্যকরী ঔষধি গুল্ম এবং বহু রোগের ঔষধ বটে। কুষ্ঠরোগ, চর্মরোগ, চুলপড়া, সর্দি-কাশি, ব্রংকাইটিস সহ বহু রোগের ঔষধ হিসেবে কাজে লাগে। কাঁচা অবস্থায় এর চুলকানি ক্ষমতা প্রখর। শুকিয়ে গেলে ট্রাইকোম নষ্ট হয়ে যায় তাই কার্যকরী ক্ষমতা থাকেনা। বর্তমানে গাছটি তেমন একটা দেখা যায় না।

চোতরা পাতা
০ টি মন্তব্য      ৪৪৭ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: