অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৩৭ জন ভিজিটর

পাঁদেরা লতা যখন গন্ধভাদুলি...

লিখেছেন Nazrul Islam Tipu বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর ২০২০
গন্ধভাদুলির নাম শুনেনি এমন চালাক মানুষ হয়ত আমাদের দেশে তেমন একটা নেই! অনেকে হয়ত দেখে নাই, আবার কেউ দেখেও হয়ত চিনে নাই; এই দুই কারণ ছাড়া গন্ধভাদুলি সম্পর্কে না জানার আর কোন কারণ নেই। মূলত এই লতাটি নিজ গুন বৈশিষ্ট্যের কারণেই সবার কাছে কৌতূহলী ও কৃপাদৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এটাই তার পরিচিতির অন্যতম কারণ।
এটাকে বহু নামে চিনে থাকে। গন্ধভাদাল, গন্ধভাদুলি, গাঁদাল, ভদ্রা ইত্যাদি। ইংরেজিতে Stinkvine বলা হয়। এর লতা যখন কাটা হলে, চাপে পড়ে থেঁৎলে গেলে, পাতা ছিঁড়ে গেলে কিংবা লতাটিকে সমূলে উৎপাটন করা হলে; মানুষের উদরস্থ বায়ুর মত বিকট দুর্গন্ধ ছড়ায়। ভদ্র মানুষের বৈঠকে গোপনে কায়দা করে লুকিয়ে রাখলে, নির্ঘাত একে অপরকে সন্দেহ করবে! উদরস্থ বায়ুর সঠিক সুন্দর বাংলা শব্দ চয়নের অভাবে স্থানীয় ভাষায় তাকে পাঁদ তথা পাঁদেরা লতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই লতা থেকে যে প্রকারের দুর্গন্ধ বের হয়, তাকে এক বাক্যে পরিচিত করাতে গেলে, স্থানীয় 'পাঁদ' শব্দের চেয়ে সুন্দর কোন বিকল্প নেই!
খাদ্য ও রসনা বিলাসের ধরণ সৃষ্টিতে প্রকৃতি ও জলবায়ুর একটা বিরাট প্রভাব আছে। বাংলাদেশী জলবায়ুতে বেড়ে উঠা মানুষ ঝাল খাদ্যের প্রতি বেশী আকর্ষণ বোধ করে। ফলে ঝাল মুড়ি, পেয়াজি, চনাচুর, সিঙ্গারা, সমুচার কদর বেশী। এসব খাদ্য বাসী হলেও বেজায় চাহিদা। বাসী খাদ্যে নিজের পেট খারাপ করে, মনের সুখে বাতাসে ঘ্রাণ ছেড়ে, অন্যের সহ্য ও ধৈর্য শক্তির পরীক্ষা করার অভ্যাস, অনেকের দীর্ঘদিনের স্বভাবে পরিণত হয়!
কৌতূহলের ব্যাপার হল, মানুষ ও প্রকৃতির সাথে ভালবাসা, চাহিদা ভাগাভাগি করতে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী গন্ধভাদুলির জন্ম হয় বাংলাদেশে। এ দেশের পরিবেশ ও জলবায়ু পাঁদেরা লতার জন্য খুবই উপযোগী। তাই সুযোগ পেলে যত্রতত্র এটাকে বেড়ে উঠতে দেখা যায়।
কোন এক কৌতূহলী পর্যটক শখের বসে, গন্ধভাদুলির লতা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাতে নিয়ে যান। আমেরিকার বাতাস পেয়ে গন্ধভাদুলী আগ্রাসী হয়ে উঠে। পরবর্তীতে এটা ফ্লোড়িডার মানুষের জন্য বিরাট উপদ্রবের কারণ হয়ে উঠে। এই লতা সেখানে এত বেশী পরিমাণ জন্মে যে, মানুষ এটাকে দমাতে হিমসিম খাচ্ছে। কেননা এই লতা সেখানে অনেক দ্রুত বর্ধনশীল। ফলে সেখানকার গাছ-পালা, লতা-পাতা, ফুল গাছ চেপে ধরে নিজে মাথা তুলে দাড়িয়ে পড়ে। তার উপর গন্ধ-আক্রমণ তো আছেই!
যাই হোক, গন্ধভাদুলি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ভুটান, বার্মা, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ইন্দোনেশিয়াতেও জন্মায়। এর পাতাগুলো খুবই রসালো ও সতেজ। অন্য গাছের কাঁধে চড়ে, লতা বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। গন্ধভাদুলির ফুল কিন্তু অনেক সুন্দর, মটর শুটির মত বিচি হয়। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ফুল ফুটে, নভেম্বর-ডিসেম্বরে ফল আসে। সাধারণ অবস্থায় গন্ধভাদুলি গন্ধ ছড়ায় না কিন্তু আহত হলেই যৌগিক সালফারের মত কড়া গন্ধ বের হতে থাকে। তখনই মানুষ তার অবস্থান নির্ণয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠে। বর্তমানে অনেকেই এটাকে ক্ষেত-বাগানের বেড়ায় লাগিয়ে থাকেন। অনেক সৌখিন মানুষ নিজের ব্যক্তিগত বাগানেও জায়গা করে দেন।
প্রাচীন কাল থেকেই এই লতাটি ঔষধি গাছ হিসেবে ব্যবহার হয়ে এসেছে। ইউনানি ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে পেটের যাবতীয় রোগে গন্ধভাদুলির ব্যবহার তুঙ্গে। হাকিম, কবিরাজেরা এটাকে রান্না করে খাওয়ার পরামর্শ দিতেন। বদহজম ও উদরস্থ বায়ুর সকল প্রকার প্রকোপ কমাতে এর কার্যকারিতার জুরি নেই। বর্তমানে এটা শাক হিসেবেই বেশী সমাদৃত। শহরে ও মফস্বলে এর কদর অনেক বেশী। এর শাক খুবই সুস্বাদু। রান্না করলে এটার গন্ধ থাকেনা। বহু জায়গায় এটাকে বেটে পেঁয়াজীর মত ফ্রাই করে খাওয়া হয়। কেননা এটার ফ্রাই পেয়াজির মত মচমচে ঝুরঝুরে হয়।
আমি প্রবাসে থাকি। যখন দেশে যাই তখন এটা সংগ্রহ করে বহুবার খেয়েছি। খুবই উপাদেয় ও সুস্বাদু। এর পাতা থেকে গন্ধ বের হলেও, এই পাতা যখন অন্য তরকারীতে দেওয়া হয়, তখন এটা নিজেই মসল্লা হিসেবে কাজ করে। এই লতা বহু ধরনের খনিজ উপাদানে ভরা। যা অন্য শাক-সবজিতে নেই। বাংলাদেশের এই লতাটি প্রচুর পরিমাণে জন্মে। কোন যত্ন করতে হয়না, নিজেই লড়াই করে জায়গা করে নেয়। তাই এটাকে বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করে, নাগরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহার করা যায়।

গন্ধভাদুলি
০ টি মন্তব্য      ৩৭০ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: