অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৩৭ জন ভিজিটর

পাখির রাজা ঠগবাজ ফিঙ্গে...

লিখেছেন Nazrul Islam Tipu মঙ্গলবার ০৬ অক্টোবর ২০২০
 
ফিঙ্গে মানুষের মতই ঠগবাজি করতে পারে। এটাই তার পেশা, এই পেশায় সে খুবই চতুর। ঠগবাজি করার পরও তাকে পাখির রাজা বলা হয়! ময়ূরের মত সুন্দর পাখীর পক্ষে রাজা হওয়া গেল না! মাঝপথে কাল কুচকুচে ফিঙ্গে হয়ে গেল পাখির রাজা! তাহলে কি এমন বিশেষত্ব তার কাছে আছে, যার কারণে সে পাখির রাজা? বাংলাদেশের সর্বত্র এই পাখিটি দেখা যাবার পরও, অনেকেই হয়ত অত গভীরে গিয়ে বিষয়টি ভেবে দেখে না!
ফিঙ্গেকে পাখির রাজা বানিয়েছে মানুষেরাই। তাও আবার বাংলাদেশের জনগণ। ফিঙ্গের বহু চরিত্রের সাথে মানুষের খাসিয়তের মিল আছে। তাই মানুষের দৃষ্টি ও বিবেচনায়, ফিঙ্গে পাখির রাজা হবার যোগ্য। তাই সে পাখীদের রাজা! তাই বলে ফিঙ্গে দুনিয়ার সকল দেশে রাজার মর্যাদা পায় না! অনেক দেশেই তার কূটনাম রয়েছে। তার সে নাম শুনলেই আমরা ব্যাপার খানা বুঝতে পারব।
পৃথিবীতে বহু প্রজাতির ফিঙ্গে রয়েছে। ইংরেজিতে ফিঙ্গেকে বলা হয় Drongo. যার সহজ সরল বাংলা অর্থ হল 'ঠগবাজ'! কিংবা প্রতারকও বলা চলে। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিতে যার গায়ের জোড় বেশী এবং ঠগ, প্রতারণা ও চালাকিতে পারদর্শী, মানুষ তাকেই যোগ্য মনে করে। তাকেই চোখ বন্ধ করে ভোট দেয়, এলাকার নেতা বানায়! মহল্লার বিচারক সাজে! লক্ষণীয় যে, এ'সব দক্ষতা ছোট্ট পাখি ফিঙ্গের কাছে রয়েছে! আমাদের অনেকেই তার সে চরিত্র দেখেছে। চলুন ফিঙ্গেকে আবারো দেখে আসি।
ফিঙ্গের পরিচিতি
দূর থেকে ফিঙ্গে দেখতে ঠিক কাউয়ার মত লাগে। তবে আকারে কাউয়ার ছেয়ে ছোট। সকল পাখিই উড়তে পারে কিন্তু উড়ন্ত অবস্থায় ফিঙ্গের মত বাহাদূরী শক্তি অন্য কোন পাখির নেই। তার লেজের পালক দেখতে ইংরেজি 'Y' অক্ষরের মত। এখানেই যত কৌশল লুকায়িত। তার ডানায় রয়েছে ক্ষিপ্রতা। সেকেন্ডের কম সময়ের সিদ্ধান্তে সে ডানে, বামে, উপরে, নীচে দ্রুত গতিতে ড্রাইভ দিতে পারে। আবার হেলিকপ্টারের মত শূন্যে একস্থানে অবস্থান করতে পারে। মুহূর্তেই গতি বাড়িয়ে পালাতে কিংবা আক্রমণ করতে পারে। এই চতুরতার কারণে অন্য শিকারি পাখি তাকে তাকে ধরতে পারে না। উপরন্তু ফিঙ্গে ক্ষিপ্ত হলে, অন্য শিকারি পাখি সেখানে আর খাদ্য যোগাড় করতে পারে না। কেননা সে তখন অন্যান্য নিরীহ পাখিদের সতর্ক করে তাড়িয়ে দেয়।
ফিঙ্গের খাদ্য সংগ্রহের কৌশল
কৌতূহলের ব্যাপার হল ফিঙ্গে অন্য পাখিদের মত ঝোপ-জঙ্গল তল্লাশি করে খাদ্য সংগ্রহ করতে জানেনা। লড়াকু বিমানের মত লেজ-ডানা থাকার কারণে সে, উড়ন্ত ফড়িং, প্রজাপতি ধরতে সিদ্ধহস্ত। এই কাজ আবার অন্য সকল পাখিরা পারে না। ফিঙ্গে অত কষ্ট করে উড়ে প্রজাপতি ধরার পিছনে সময় ক্ষেপণ করার মত পাখি নয়। অপারগ অবস্থায় করে থাকে। সে বাঁশের কঞ্চি কিংবা মরা গাছের উপরের ডালে বসে থাকবে। আর নীচে দোয়েল, শালিক, ঘুঘু, চন্দনা সহ অন্যান্য পাখিরা কে কি পতঙ্গ যোগাড় করছে, সেদিকে নজর বুলাবে। তাদের কেউ একটি পতঙ্গ পেয়ে গেলে, ফিঙ্গে মুহূর্তেই শাঁ করে তাদের নিকট থেকে খাদ্য ছিনিয়ে নেয়। ঠিক যেমন আমাদের দেশের সন্ত্রাসী-ছিনতাইকারীরা করে থাকে!
খাদ্য কেড়ে নিতে আসলে, আক্রান্ত পাখি ফিঙ্গের সাথে কখনও লড়তে যায় না। তারা অসহায় ভাবে পাখা দুটো মেলে ধরে কিংবা পা'দুটো উপরের দিকে তুলে, অসহায় ভঙ্গিতে ফিঙ্গের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকে। এভাবে নিরীহ ভঙ্গি বানিয়ে বুঝাতে চায়, তারও খিদে পেয়েছে, তার বাসায় বাচ্চা আছে, তাদের খাওয়াতে হবে। এত কৌশলের পরও সংগৃহীত খাদ্য ফিঙ্গেকে দিয়ে দিতেই হয়! নতুবা তাদের মার খেতে হবে। তখন ফিঙ্গের আচরণ অনেকটা আমাদের দেশের ভূমি দস্যুদের মত হয়ে উঠে। যতক্ষণ পেট না ভরে, ততক্ষণ বালি ভরাট চালাতেই থাকে।
ফিঙ্গে যখন পাহারাদার
ফিঙ্গের পেট ভরে গেলে সে স্থান ত্যাগ করে, গাছের উপরে গিয়ে ঘুমায় না। সে অন্যান্য পাখিদের বিপদ থেকে সতর্ক করার জন্য সেখানে অবস্থান করে এবং নানাবিধ শিষ দিয়ে সতর্ক করে। চিল, ঈগল কিংবা সাপ আক্রমণ করতে আসলে, সে করুণ শিষ বাজিয়ে, নিজে গিয়েই শত্রুদের বিপক্ষে পথরোধ করে দাঁড়ায়। এই ফাঁকে অন্যরা তাদের বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে পালাবার সুযোগ পায়। এটা দেখতে ঠিক আমাদের দেশের বস্তির মাদক ব্যবসায়ী মাস্তানদের মত। তারা গেইটে কোন অঘটন লাগিয়ে হৈ-হুল্লোড় জুড়ে দেয়; ওদিকে তাদের পোষ্যরা পালাতে পারে। তবে এক্ষেত্রে ফিঙ্গে মানুষের চেয়ে কিছুটা মহত! ফিঙ্গে যেহেতু বসে ক্ষেতে পছন্দ করে, তাই যারা তাদের বসে খাওয়াবে, ওদের নিরাপত্তার দিকটি তারা মাথায় রাখে।
ফিঙ্গের চতুষ্পদ প্রাণীকে বোকা বানায়
ফিঙ্গে শুধু পাখি থেকে কেড়ে খায় এমন নয়। সংঘবদ্ধ জীবন যাপনে অভ্যস্ত চারপেয়ে প্রাণী তথা উদ, মিরকেটস জাতীয় প্রাণী থেকেও খাদ্য কেড়ে খায়! এক্ষেত্রে ফিঙ্গে দারুণ বুদ্ধি কৌশল কাজে লাগায়। কখনও শঠতা, ঠগবাজির আশ্রয় নেয়! এসব প্রাণীদের একজন সর্দার থাকে। সে সবাইকে খাদ্য সন্ধানে লাগিয়ে দিয়ে, সর্দার হিসেবে নিজে পাহারা দিতে থাকে। বিপদ দেখলে সর্দার প্রাণী তার নিজ ভাষায় শিষ দেয়। ফিঙ্গে সেই প্রাণী সর্দারের শিষ নকল করতে শিখে। যখন সে সব প্রাণীরা মাটি থেকে খাদ্য বের করে ঠিক তখনই ফিঙ্গে নতুন শিখে নেওয়া শিষ বাজায়। প্রাণীরা সেটা তাদের দলনেতার শিষ মনে করে পালাতে থাকে। এই ফাঁকে ফিঙ্গে খালি মাঠেই তাদের ফেলে যাওয়া, খাদ্য সংগ্রহ করে।
ফিঙ্গে এভাবে অন্যের মাথায় উপর ছড়ি ঘুরিয়ে জীবন ধারণ করে। আরাম করে, আয়েশের সহিত খায়। আমাদের দেশের বেশীরভাগ মানুষও ঠিক ফিঙ্গের মত বেশী কষ্ট না করে, শুয়ে বসে খেতে চায়। এই ধরনের জীবনের জন্য তারা স্বপ্ন দেখে। আমাদের দেশের মানুষদের কাছে ফিঙ্গের এই চরিত্র খুবই ভাল লাগে। নিজেদের চিন্তার সাথে ফিঙ্গের খাসিয়তের দারুণ মিল থাকার কারণে, ফিঙ্গেকে খুবই বুদ্ধিমান, কৌশলী, সুচতুর মনে করে তাই তো "ফিঙ্গে পাখির রাজা।"

ঠগবাজ পাখির রাজা ফিঙ্গে
০ টি মন্তব্য      ৮৬৩ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: