অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৩৬ জন ভিজিটর

আগাখান - স্যার সুলতান মোহাম্মদ শাহ...

লিখেছেন Nazrul Islam Tipu রবিবার ০৪ অক্টোবর ২০২০
 
সুলতান মোহাম্মদ শাহ (১৮৭৫-১৯৬৭) তৃতীয় আগা খান হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বের বহু দেশে আগা খানদের বহু কোম্পানি আছে। সে হিসেবে আগাখান শব্দটি বাংলাদেশে খুবই পরিচিত শব্দ। শিক্ষা-চিকিৎসা ও নতুন ধরনের ব্যবসায়ের ঝুঁকিপূর্ণ প্রজেক্টে অর্থ লগ্নি করার কারণে দুনিয়াতে তারা খুবই প্রসিদ্ধ।
নিত্য-নতুন ব্যবসা, উদ্ভাবন ও কর্মদক্ষ মানুষ সৃষ্টিতে তারা প্রতি বছর বহু বৃত্তি প্রদান করে থাকে। আগাখান ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিরল প্রতিভার অধিকারী বহু শিক্ষার্থী তাদের বৃত্তিতে লেখাপড়া করতে পারে। বাংলাদেশেও তাদের অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিশ্বমানের কারিকুলামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। উৎকর্ষতার বিচারে সবগুলোই সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেব বিবেচিত।
শিশুকালে মাত্র ৮ বছর বয়সেই পিতার নির্দেশনার মাধ্যমে তিনি ইসমাইলীয়া সম্প্রদায়ের ৪৮ তম এবং আগাখান সম্প্রদায়ের ৩য় ইমাম মনোনীত হন। তিনি পাকিস্তানে করাচীতে জন্মগ্রহণ করেন। একজন ধর্ম গুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার মত জ্ঞান ও যোগ্যতা অর্জনের প্রতি তার মা সদা-সচেষ্ট ছিলেন।
ইসমাইলীয়া সম্প্রদায়ও মূলত শিয়াদের থেকে সৃষ্ট একটি মতবাদ। ইমাম জাফর সাদেক (রহঃ) ফাতেমা ও আলী (রাঃ) এর নাতির নাতি। তার বড় পুত্রের নাম ইসমাইল (রহঃ) নাম অনুসারে এই সম্প্রদায়ের নাম ইসমাইলী। তিনি প্রথম ইমাম এবং তাদের ৪৬তম ইমাম, ইরানী বংশোদ্ভূত হাসান আলী শাহ (১৮০৪-১৮৮১) ১ম আগা খান হিসেবে বিবেচিত হন।
আমাদের দেশের কিছু পীরের সিল-সিলাতে পিতা-পুত্র-নাতি যেভাবে দায়িত্ব পেয়ে থাকে, সেভাবেই চলতে থাকে আগাখানদের পীর পরিবর্তনের ধারা। সে হিসেবেই তাদের ৩য় পীর নির্ধারিত হয়েছিলেন স্যার সুলতান মোহাম্মদ শাহ। মূলত তার হাত ধরেই ইসমাইলীয়ারা দুনিয়াতে খুব প্রসিদ্ধি ও পরিচিতি পেতে থাকে।
ইসমাইলীয়ারা নিজেদের শিয়া-মুসলমান দাবী করলেও, ইরানীরা তাদের শিয়া বলতেও নারাজ। কেননা চিন্তাধারা সংস্কৃতিতে বিস্তর তফাত আছে। আবার তাদের সাথে ইসলামী চরিত্রের নামগন্ধও নেই। তাই মুসলমানেরা তাদের মুসলমান বলতে নারাজ। সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তিতে পরে যায়, তারা আসলে কারা?
আগাখানিরা ব্যবসাকেই বেশী গুরুত্ব দেয় বলে, কোন দেশের সরকার ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের হাত দেয় না। তাই তারা সকল দেশের সকল সরকারের কাছেই সমাদৃত। কোন দেশেই তাদের ধর্মমতের কোন সমস্যা হয় না।
আগাখানদের প্রধানগন এক একজন এক এক দেশে মারা গেছেন। সে কারণে সে সবের প্রতিটি দেশই তাদের কাছে সম্মানিত। সুলতান আহমেদ শাহ ছিলেন ভারতীয় এবং ভারতীয় রাজনীতি ও ব্রিটিশ শাসনের সাথে তার উপস্থিতি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাই তাকে নিয়েই আমার আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইউরোপিয়ান শিক্ষার প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ ছিল। দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইসমাইলীয়াদের তিনি একত্রিত করেন। এ কাজে তিনি ব্রিটিশের সরাসরি সহযোগিতা ও পরামর্শ পেয়েছেন। তিনি নিজেও উচ্চ শিক্ষিত মানুষ ছিলেন এবং তার প্রচেষ্টা ছিল তার ধর্মমতের অনুসারীদের সবাই যেন উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে। আগাখানিরা যেখানেই অবস্থান করে, সেখানেই তারা উন্নত শিক্ষার ব্যবস্থা করে থাকে।
১৮৯৭ সালে রানী ভিক্টোরিয়া কর্তৃক ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত ‘নাইট কমান্ডার’ উপাধি প্রাপ্ত হন। ১৯০২ সালে তাঁর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা আরো বেড়ে যাবার কারণে, ব্রিটিশ সপ্তম এডওয়ার্ড তাকে ‘নাইট গ্র্যান্ড কমান্ডার’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তখন থেকেই তিনি নামের আগে স্যার সুলতান লিখতে শুরু করেন। স্যার শব্দটি ব্রিটিশের আনুগত্যের একটি সম্মানজনক স্বীকৃতি।
এছাড়াও তিনি আরো অনেক খেতাব প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যেমন, জার্মান সরকার তাকে "সরকারের বিশ্বস্ত, চৌকস এবং সেরা কর্মকর্তা" হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এমনকি তুর্কি সম্রাট ও পারস্য সাম্রাজ্য থেকেও তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকারোক্তি অর্জন করেছিলেন! ফলে তিনি পুরো ভারতে অসম্ভব ক্ষমতা বান ব্যক্তি এবং ব্রিটিশের নিকট শ্রেষ্ঠতম বিশ্বস্ত মুসলমান হিসেবে স্বীকৃতি হাসিল করেন! ভারতে তিনিই মুসলমানদের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে নানা জায়গায় ভূমিকা পালন করেন।
১ম বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি আরব ও ইউরোপীয় ঘোড়ার সংমিশ্রণে উন্নত তেজি ঘোড়ার সংকর জাত সৃষ্টি করে দুনিয়া-বাসীকে চমকে দেন। এসব ঘোড়া বাজারে বিক্রি করে, বহু মিলিয়ন ডলার অর্থ সম্পদের মালিক হন। প্রতিযোগিতার জন্য সংকর জাত ঘোড়া সৃষ্টি করার পদ্ধতি, শুধুমাত্র তার দখলেই ছিল। ঘোড়া ব্যবসাতে এখনও এই গ্রুপ সারা বিশ্বে সবার উঁচুতে। সংকর জাতের নতুন প্রজাতির ঘোড়ার সৃষ্টির পিছনে মেধা খাটাতে গিয়ে, সুলতান আহমদের দৃষ্টি অন্যদিকে প্রসারিত হয়ে যায়।
- তিনি তার অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, নারী পুরুষ সবাইকে উচ্চ শিক্ষিত হতে হবে। তাহলে সম্পদ, খ্যাতি, ক্ষমতা পদতলে লুটিয়ে পড়বে।
- নামী-দামী বিদ্যালয়ে পড়তে হবে, তাহলে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সন্তানের সাথে পরিচিত হবে। এতে খ্যাতিমানদের সাথে বন্ধুত্ব বাড়বে।
- তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে, তাহলে পুরো পৃথিবীতে একটি ক্ষমতাশালী জাতি হিসেবে টিকে থাকতে পারবে।
তৃতীয় আগা খান তাঁর বহুমুখী প্রতিভা ও খ্যাতি দিয়েই পুরো ব্রিটিশ রাজত্বে, আফ্রিকা থেকে এশিয়ার বিশাল জনপদে, তার মতাদর্শের অনুসারীদের ক্ষমতার প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। সকল অনুসারীকে শিক্ষিত করে তুলতে তিনি সফল ছিলেন। আবার তাদেরকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পদে বহাল, পেশাদারী ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
তিনি অল ইণ্ডিয়া মুসলিম কাউন্সিলে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে প্রথম প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন! পৃথ্বী কাউন্সিলের সদস্য ও লীগ অব নেশনের মেম্বার হিসেবে ভারতের হয়ে তিনি ব্রিটিশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তারা মুসলমানের নাম ধারণ করে মুসলমানদের মধ্যেই থাকে। সাধারণ কারো পক্ষে, তাদের পরিচয় বের করা দুঃসাধ্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ বহু টুকরায় বিভক্ত হয়ে যায়। মধ্য প্রাচ্য, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, কেনিয়া, রুয়ান্ডা, তাঞ্জানিয়া, উগান্ডা, জায়ার সহ পৃথিবীর বহু ভূ-খণ্ডের ইসমাইলীয়া সম্প্রদায়কে রক্ষা, একত্রিত করা, ও স্বাবলম্বী করার কাজে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। পৃথিবী ব্যাপী পরিচিতি দিয়ে তিনি প্রতিটি দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের সহযোগিতা ও মনোযোগ কেড়ে নিতে পারদর্শিতা দেখান।
দুনিয়া-ব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইসমাইলীয়া সম্প্রদায়কে একত্রিত করে রাজনৈতিক স্বাধীনতা এনে দিতে তিনি সক্ষম হয়েছেন। ব্রিটিশ সরকার মুসলমানদের রক্ষার নামে যাবতীয় রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা এই সম্প্রদায়কেই দিয়েছেন! নাস্তিক শাসক থেকে আজারবাইজান স্বাধীন হলে, ইসলাম প্রচারের নামে তারাই প্রথমে যায় এবং বেশীর ভাগ আজারীদের ইসমাইলী বানিয়ে ফেলে!
১৯৫৭ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা নগরীতে তৃতীয় আগা খান মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে মিশরের নীল নদ বিধৌত পর্যটন কেন্দ্র আসওয়ানে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর আগেই তাঁর সমাধি নিজ হাতে তৈরি করে রেখেছিলেন।
মৃত্যুকালে একটি উইলে লিখে যান, "পারমাণবিক যুগের আধুনিকতায় সকল কিছুই বদলে গিয়েছে। তাই নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টিতে, ইসমাইলীয়াদের রক্ষার্থে, নিজ সম্প্রদায়কে উচ্চ শিখরে নিয়ে যেতে, ১৩০০ শত বছরের নিয়ম রেওয়াজ ভঙ্গ করে, ছেলের ঘরের নাতি তথা করিম আগা খানতে ইসমাইলীয়া সম্প্রদায়ের ৪৯ তম ইমাম নির্বাচিত করা হইল।"

আগাখান ইতিহাস
০ টি মন্তব্য      ৪৫৭ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: