অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৩৫ জন ভিজিটর

রাসূল (সাঃ) এর সংগ্রামী জীবন ও অন্ধের হাতি দর্শনের গল্প.........

লিখেছেন লাবিব আহসান শনিবার ০৬ এপ্রিল ২০১৯

একদল অন্ধকে হাতি দেখানোর জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। তাদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রেখে সামনে একটি বৃহদাকার হাতি আনা হলো। অন্ধদের মধ্যে তীব্র কৌতুহল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা রীতিমতো শিহরিত! এবার অন্ধদেরকে হাতি দেখার জন্য ছেড়ে দেয়া হলো। অন্ধদের কেউ গিয়ে হাতির পা ধরলো, কেউ লেজ ধরলো, কেউ শূড় ধরলো, কেউবা ধরলো কান, আবার কেউবা পেট স্পর্শ করলো। দেখা শেষ হলে সব অন্ধকে ডেকে নিয়ে এসে আবার সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হলো। এবার ইন্টারভিউ পর্ব। প্রত্যেককে একই প্রশ্ন করা হলো, 
“হাতি তুমি কেমন দেখলে?”
এবার অন্ধদের হাতি দর্শন সংক্রান্ত বক্তব্যে লক্ষ্য করা গেলো ভিন্নতার সুর। যে হাতির পা ধরেছিলো সে বললো, “হাতি তো দেখতে খাম্বার মতো।” যে হাতির লেজ ধরেছিলো সে বললো, “ হাতি দেখতে রশির মতো।” যে শূড় ধরেছিলো সে বললো, “হাতি দেখতে অনেকটা কলাগাছের মতো।” যে অন্ধ হাতির কান ধরেছিলো সে বললো, “হাতি দেখতে কুলার মতো।” আর যে হাতির পেট স্পর্শ করে হাতি দেখার স্বাদ পেতে চেয়েছিলো সে বললো, “হাতি তো দেখতে ডোলার মতো।”

তাদের জবাব শুনে বিজ্ঞ বিচারকগণ কিছুক্ষণ ‘হা’ করে তাকিয়ে থাকলেন। তাঁরা কি বলবেন ঠিক বুঝতে পারলেন না। এ ধরণের একটি গল্পের বর্ণনা মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “মসনভী-ই-রুমী” তেও দিয়েছিলেন। আমাদের মুসলমানদের রাসূল (সাঃ) এর সংগ্রামী জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিটা হয়ে গেছে অনেকটা এই অন্ধদের হাতি দেখার মতো; অসম্পূর্ণ। মুসলমানদের একটা দল রাসূল (সাঃ) এর জীবন থেকে শুধু হেরা গুহায় জিকিরে মশগুল থাকার অংশটাকে নিয়ে খানকায় ঢুকে পড়লো। কেউ জিহাদের অংশটাকে ধারণ করে করে নেমে পড়লো অস্ত্র হাতে। কেউ নামাজের আয়াতগুলো পাঠ করে নিছক নামাজকেই ইসলাম মনে করে নিয়ে ঢুকে পড়লো মসজিদে। আরেকটা দল রাসূল (সাঃ) এর জীবনের দাওয়াতী অংশটাকে গ্রহণ করে বেরিয়ে পড়লো তাবলীগে। রাসূল (সাঃ) এর জীবনের বিরাট একটি অংশ যে কেটেছে যুদ্ধের উত্তপ্ত ময়দানে, শিহাবে আবী তালিবে কারারুদ্ধ হয়ে কিংবা বিশাল মদিনা রাষ্ট্র পরিচালনা করে; সমাজের এই অংশটি সেটা কিছুতেই মানতে রাজি নয়।

আমি চট্টগ্রামে আছি প্রায় ১ বছর ৪ মাস হতে চললো। চট্টগ্রামের মানুষ অন্য অনেক জেলার চাইতে অনেক বেশি ধর্মপ্রাণ হয় এটা জানতাম। এখানে এসেও তার প্রমাণ পেয়েছি। আমাদের রংপুরে রাস্তায় বের হলে যেখানে শতকরা ৮০ ভাগ বেপর্দা নারী লক্ষ্য করা যায়, চট্টগ্রামের পথে প্রান্তরে পর্দাহীন নারীর সংখ্যা বলতে গেলে সেখানে হাতে গোনা। এই দেড় বছরে আমি চট্টগ্রামে অসংখ্য ইসলামী জলসা, আলোচনা সভা, তাফসীর মাহফিল হতে দেখেছি। রাসূল (সাঃ) এর স্মরণে অসংখ্য মজলিস বসতে দেখেছি। মসজিদে মসজিদে দোয়া হতে দেখেছি। এটা নিঃসন্দেহে অ্যাপ্রিশিয়েট করার মতো একটা দিক। আল্লাহ সূরা কাওসারে রাসূল (সাঃ) এর নাম বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, এটা তারই একটা জলজ্যান্ত সাক্ষর। পৃথিবীর এমন কোনো প্রান্ত নেই, যেখানে একটি সিঙ্গেল মুহূর্তও রাসূল (সাঃ) এর নাম উচ্চারিত হওয়া ছাড়া অতিবাহিত হচ্ছে।

রাসূল (সাঃ) এর নৈকট্য অর্জনের প্রতিটি চেষ্টাই যে আল্লাহর কাছে অনেক প্রিয় এবং তার সওয়াব পাওয়ার আশা করা উচিত, তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু আমাদেরকে একই সঙ্গে এটাও বুঝতে শিখতে হবে, রাসূল (সাঃ) এর জীবনী নিছক কোনো একজন জনৈক ব্যক্তির জীবনী নয়, বরং এটা হচ্ছে এমন এক ঐতিহাসিক শক্তির জীবন বৃত্তান্ত, যা মানুষের আকারে আবির্ভূত হয়েছিলো। এটা জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো এক দরবেশের কাহিনী নয়, যিনি লোকালয়ের এক প্রান্তে বসে কেবল নিজের সংশোধন আর আত্মগঠনের কাজে নিয়োজিত। বরং এটা হচ্ছে এমন এক ব্যক্তির জীবনী, যিনি ছিলেন একটা সামষ্টিক আন্দোলনের চালিকাশক্তি। বস্তুত রাসূল (সাঃ) এর জীবন কাহিনী হেরা গুহা থেকে নিয়ে সাওর পর্বত পর্যন্ত, কাবার চত্ত্বর থেকে নিয়ে তায়েফের বাজার পর্যন্ত এবং উম্মুল মুমিনীনদের কক্ষ থেকে রণাঙ্গন পর্যন্ত চতুর্দিকে বিস্তৃত। মানবেতিহাসের এ শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্বকে যদি নিছক একজন ধর্মনেতা(!) বা সংস্কারক হিসেবে উপস্থাপন করে দায়িত্ব শেষ করা হয় কিংবা তাঁকে মিলাদ মজলিসে জিকির তাহলীলের মাধ্যমে স্মরণ করেই ক্ষান্ত হওয়া হয়, তাহলে তাঁর বিশাল এবং বহুমুখী সত্তাকেই অস্বীকৃতি জানানো হবে।

রাসূল (সাঃ) এর জীবন কোনো পুষ্করিণীর স্থির পানির মতো নয় যে, তার এক কিনারে দাঁড়িয়ে এক নজরেই তা পর্যবেক্ষণ করা যাবে। বরং এটা এমন একটা বহমান নদী, যাতে বেগবান স্রোত রয়েছে, গতি ও সংঘাত রয়েছে, বদর-ওহুদ-খন্দক-তায়েফ রয়েছে, তরঙ্গ ও ফেনা রয়েছে, রয়েছে মুসয়াব ইবনে উমায়রের ধূলিমলিন লাশ, রয়েছে ঝিনুক ও মুক্তা। এর পানির কল্যাণে মৃত প্রাণ ফিরে পায়। এ নদীর রহস্য বুঝতে হলে এর স্রোতের সাথে সাথে চলতে হয়।

পৃথিবীর খ্যাতিমান এবং অসাধারণ ব্যক্তিবর্গের জীবনী অধ্যয়ন করলে আমরা দেখতে পাই, তাদের সমস্ত শক্তি সামর্থ্য জীবনের কোনো একটা ভালো অংশই চুষে খেয়ে ফেলেছে আর বাকি সবগুলো ডালপালা যেন শুকিয়ে গেছে। তাদের জীবনের একটা দিক যদি খুবই উজ্জ্বল দেখা যায়, তবে তার অন্যদিক একেবারেই অন্ধকার প্রতীয়মান হয়। একদিকে চরম বাড়াবাড়ি, অন্যদিকে চরম উদাসীনতা।

কিন্তু রাসূল (সাঃ) এর জীবনের দিকে লক্ষ্য করুন প্রিয় পাঠক।
কী অসাধারণ এক ভারসাম্যপূর্ণতা দেখতে পাবেন আপনি! জীবনের প্রতিটি দিক একই রকম পূর্ণতা ও উৎকৃষ্টতা দ্বারা শোভিত। যেখানে গুরুগম্ভীরতার প্রতাপ রয়েছে সেখানে সৌন্দর্যের চমকও রয়েছে। আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে রয়েছে বৈষয়িকতার সমন্বিত অবদান। পরকালের চর্চার সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলেছে অর্থনৈতিক চিন্তাধারাও। দ্বীনের সাথেই রয়েছে দুনিয়াও। যেই সেনাপতি জিহাদের ময়দানে অগ্নিঝরা বক্তব্যে সাহাবীদের উদ্বুদ্ধ করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেই মানুষটিই আবার রাস্তায় খেলাধূলারত একটি ছোট্ট বাচ্চার সামান্য পাখির খবরও রেখেছেন। যেই রাষ্ট্রনায়ক রাষ্ট্রনীতি, কূটনীতি নিয়ে ব্যস্ততায় দিন গুজরান করেছেন, সেই ব্যক্তিই একজন স্বামী হিসেবে স্ত্রীর সঙ্গে রাতের অন্ধকারে চাঁদের আলোয় দৌড় প্রতিযোগিতা দিয়েছেন। তাঁর স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টান্ত দেখুন! আয়েশা (রাঃ) গ্লাসের যেখানটায় মুখ লাগিয়ে পানি খেতেন, মাংসের যেখানে মুখ লাগাতেন, রাসূল (সাঃ) মুখ লাগাতেন ঠিক সেখানটায়। ইতিহাসে এর চেয়ে রোমাঞ্চকর দৃশ্য আর কী হতে পারে!

রাসূল (সাঃ) এর আগমনের সত্যিকার উদ্দেশ্য আমরা নিজেরাই না জানার চেষ্টা করছি, না জানানোর। আমাদের আল্লাহ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন গোটা মানব জাতির সামনে সত্যের সাক্ষ্যরূপে দাঁড়ানোর জন্য। অথচ আমাদেরকে দেখে অমুসলিম তো দূরের কথা, একজন মুসলিম যুবকও নিজেকে পরিবর্তন করার জন্য উদ্বুদ্ধ হচ্ছে না। তাই আজ রাসূল (সাঃ) এর জীবনের প্রতি সত্যিকার দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব আমাদেরই। এবং এই কাজটা হবে আনবিক শক্তি আবিষ্কারের চেয়েও বড় কোনো কীর্তি। শিল্পীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলে যাই, 
"সুন্নাত শুধু নয় মজলুম সহায়ক, 
সুন্নাত ওহুদে জালিমের প্রতিরোধ। 
সুন্নাত শুধু নয় নির্জন ধ্যানে যাওয়া, 
আরও সুন্নাত হলো পাথরের আঘাত খাওয়া। 
সুন্নাত শুধু নয় নমনীয় আলাপন, 
সুন্নাত প্রয়োজনে হুংকার গর্জন। 
সুন্নাত শুধু নয় মেষ চরাতে যাওয়া, 
আরও সুন্নাত হলো রাষ্ট্রনায়ক হওয়া।"


রাসূল (সাঃ) এর জীবন সীরাত পাঠের দৃষ্টিভঙ্গি মিলাদ মাহফিল অন্ধের হাতি দেখা
০ টি মন্তব্য      ১৫৮৯ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: