অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৪২ জন ভিজিটর

তুরস্ক কি আর সবকটি গণতান্ত্রিক দেশের মতো দ্বিদলিয় ধারায় পাকাপোক্ত হতে যাচ্ছে?

লিখেছেন কহেন কবি বুধবার ০৩ এপ্রিল ২০১৯

গত ৩১ মার্চ হয়ে গেলো তুরস্কের স্থানিয় নির্বাচন। নির্বাচনের পূর্বে বিশ্লেষণ ছিলো এরদোয়ানের একে পার্টির ভোটের জনপ্রিয়তায় ভাটার টান পড়তে যাচ্ছে, এবং ২০২৩ সালের নির্ধারিত শিডিওলড প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টারি নির্বাচনের আগেই আগাম নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে তুরস্ক। কিন্তু নির্বাচন পূর্ব এই বিশ্লেষণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। যথারীতি সারা তুরস্কে ক্ষমতাসীন একে পার্টির সার্বিক জনপ্রিয়তা অটুট আছে বলেই প্রমাণিত হয়েছে। যদিও রাজধানী আংকারা সহ বেশ কয়েকটি বড় শহরে খুবই টাইট ক্লোজ মার্জিনে একে পার্টি পরাজিত হয়েছে। ইস্তাম্বুলের ফল অমিমাংসিত রয়ে গেছে বা আদালতের মামলার অপেক্ষায় আছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এবং প্রধান বিরোধী দলিয় নেতা সেকুলার কিলসিদারওগ্লু দুজনই ২০২৩ সালের আগে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন একই সুরে।

স্বাভাবতই প্রশ্ন উঠে ইস্তাম্বুল, আংকারায় একে পার্টি কেন জয়ী হলো না। এখানে দুইটি ফ্যাক্টর কাজ করেছে। প্রথমটি তুর্কি মুদ্রা লিরার অধঃপতন, দ্রব্যমূল্য। দ্বিতীয় ফ্যাক্টর রাজধানী আংকারায় একে পার্টির প্রার্থী ছিলেন বহিরাগত আর সিএইচপি'র প্রার্থী কট্টর সেকুলার ছিলেন না। সিরিয়া ইস্যু, আমেরিকার সাথে তুরস্কের বিরোধ ও রাশিয়ার সাথে তুরস্কের সম্পর্ক উন্নয়ন এসবই তুর্কি লিরার মান অবনমনে ভূমিকা রেখেছে।

তবে পুরো নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষন করলে একটা বিষয় পরিস্কার............. সেটা হলো এরদোয়ান ও একে পার্টির জনপ্রিয়তা সার্বিক ভাবে আগের মতোই প্রায় অটুট অক্ষুন্ন আছে। আবার একই ভাবে তুর্কি সেকুলার কামালবাদি সিএইচপি'র জনপ্রিয়তাও বাড়েনি। বরাবরের মতো এবারো তুর্কি কামালবাদী সেকুলার সিএইচপি এককভাবে তাদের ৩০% ভোটের মার্জিন ক্রস করতে পারেনি। একক ভাবে একে পার্টি পেয়ছে ৪৪.৬%, আর জোটগতভাবে একে + এমএইচপি'র জোট পেয়ছে ৫২.৮%। আর বিপরীতে তুর্কি সেকুলার সিএইচপি এককভাবে পেয়েছে ৩০% ভোট, আর জোটগতভাবে সিএইচপি + ইয়ি জোট পেয়েছে ৩৭.৫% ভোট।

গত দুইদিন ধরে আমি তুর্কি সংবাদপত্রগুলো বিশেষত ডেইলি সাবাহ, ডেইলি ইয়েনি সাফাক, ডেইলি হুরিয়াতের কলামগুলো পড়ছিলাম। তবে খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ছিলাম তুর্কি সেকুলার ধারার ডেইলি হুরিয়াতের কলামগুলো। তুর্কি সেকুলার কলামিস্ট বিশ্লেষকরা পর্যন্ত একটা বিষয় স্বীকার করে নিয়েছেন.............. সার্বিক ভাবে এরদোয়ান ও একে পার্টি এখনো আগের মতোই জনপ্রিয়। এমন কি সেকুলার বিশ্লেষকরা এটাও বলেছেন,

" যদি সবকটি রাজনৈতিক দল আলাদা আলাদা ভাবে নির্বাচন করতো, তবে ইস্তাম্বুল আংকারা সহ প্রায় সবকটি বড় শহরে এরদোয়ানের একে পার্টির প্রার্থীরাই বিজয়ী হতো। "

এবারের নির্বাচনের ফলাফলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন পয়েন্ট উল্লেখ করছি, যার উপর ভিত্তি করে অনুমান করা যেতে পারে........... …. আর সবকটি নিয়মিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো তুরস্কে দ্বিদলিয় ধারায় পাকাপোক্ত হতে যাচ্ছ। এর একটি ধারা হলো এরদোয়ানের একে পার্টির প্রো-ইসলামিক লিবারেল ধারা, আর আরেকটি সিএইচপি'র কামালবাদি সেকুলার ধারা।

এবারের নির্বাচনে একে পার্টি ও সিএইচপি ছাড়া বাকি সবকটি দল তাদের আগের ভোট ব্যাংক ধরে রাখতে পারেনি। একে পার্টির মিত্র এমএইচপি'র ভোট আগের চেয়ে অর্ধেকে নেমে ৭.৫% এ দাড়িয়েছে। সিএইচপি'র মিত্র ইয়ি পার্টি সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের চেয়ে অর্ধেকের চেয়ে কম পেয়ে ৭.৪% এ দাড়িয়েছে। কুর্দি জাতিয়তাবাদী এইচডিপি'র ভোটে ভূমিধ্বস বিপর্যয় হয়েছে, তারা নেমে এসেছে ৪.৫% এ। আর সাদাত!!! আহারে সাদাত !!!!! সাদাত পার্টি গতবারের ২.৬% থেকে নেমে ১.৪% এসে দাড়িয়েছে।

এখানে সাদাত পার্টি নিয়ে একটু কথা বলতে চাই৷ তুরস্কের রাজনীতিতে ইসলামী আন্দোলন বলে পরিচিত সাদাত পার্টির আর কোন রকমেরই রাজনৈতিক ভবিষ্যত নেই। তাহলে সাদাত পার্টি কি থাকবে না??? আমার কাছে মনে হয়, একটা বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনৈতিক ধারা হিসেবে সাদাত পার্টি রাজনৈতিক দল হিসেবে কোন মতে অস্তিত্ব বজায় রাখবে। এবং সাদাত পার্টি প্রো-ইসলামিক লিবারেল ধারার একে পার্টিতে নেতা কর্মী সাপ্লাই দিতে থাকবে। অনেকটা আমাদের দেশের কম্যুনিস্ট পার্টি যে স্টাইলে আওয়ামিলীগে নেতা কর্মী সাপ্লাই দেয়, আবার আওয়ামিলীগের চাঁছাছোলা সমালোচনাও করে.......... সেরকম ।

তবে এরদোয়ানের একে পার্টির জন্য দুইটি বিষয় আগামীতে খুবই গুরুত্বপূর্ন........... প্রথমটি অর্থনৈতিক সংস্কার আর দ্বিতীয়টি তুরস্কের নিরাপত্তা সার্বভৌমত্ব সংহতি।

আর রাজনৈতিক দল হিসেবে একে পার্টিতে রজব তায়েপ এরদোয়ানের একজন যোগ্য ক্যারিশমেটিক জনপ্রিয় উত্তরাধিকার তৈরির দিকে মনযোগ দেয়া উচিত একে পার্টির।

সবশেষে এরদোয়ান ও একে পার্টির ভক্তদের জন্য একটি কথা লিখেই শেষ করতে চাই। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ভোটে জয় পরাজয় একটি অতি স্বাভাবিক বিষয়। ভোটের জয় পরাজয়কে রাজনীতি সুলভ মন মানসিকতা দিয়ে গ্রহণ করতে হবে। চিরকালই কেউ অজেয় থাকে না। একে পার্টিকেও হয়তো আগামীতে কোন এক সময় পরাজয়ের স্বাদ নিতে হবে। আর ২০০২ থেকে এখন পর্যন্ত টানা নির্বচন জয়ের রেকর্ড জনপ্রিয় থাকার রেকর্ড, ৪২% - ৪৮% ভোট এককভাবে ধরে রাখার রেকর্ড দুনিয়ার আর কোন রাজনৈতিক দল ও তার নেতার বেলায় এর আহে ঘটেছে ??? একথা আমি দৃঢ় ভাবে বলতে পারি, আগামীতে কোন এক সময় ( হয়তো পোস্ট এরদোয়ান পিরিয়ডে) একে পার্টি পরাজিত হলেও সে প্রধান বিরোধী দলের আসনেই থাকবে ইনশাআল্লাহ। তুরস্কের ইসলামপন্থী রাজনীতি, তুরস্কের ইসলামী আন্দোলন তার প্রো-ইসলামিক লিবারেল পপুলারিস্টিক ধারাতে যে ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে একে পার্টির মাধ্যমেই তাতেই তার ক্যারিশমার আলো দিয়ে বিশ্বের সবকটি ইসলামী আন্দোলনগুলোকে পথ দেখাবে ইনশাআল্লাহ। কোনদিন পরাজিত হলেও হারের বৃত্ত থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার বিজয়ীর আসনে বসবে ইনশাআল্লাহ, যখন বিরোধী দলে থাকবে তখনও তুরস্ককে সুকুলারদের জুয়ার হাত থেকে রক্ষা করবে ইনশাল্লাহ।।।


তুরস্ক
০ টি মন্তব্য      ৫৫২ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: