অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৪৬ জন ভিজিটর

ইসলামে আক্রমনাত্মক যুদ্ধ ও এই সংক্রান্ত আধুনিক মুসলমানের ভিত্তিহীন হীনমন্যতা

লিখেছেন Muhammad Sajal মঙ্গলবার ০২ এপ্রিল ২০১৯

একটা সভ্যতা বিস্তৃত হয় মূলত পাচ উপায়ে। সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে, সাংস্কৃতিক বিজয়ের মাধ্যমে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের মাধ্যমে, বাণিজ্যিক আধিপত্যের মাধ্যমে এবং ধর্মীয় বিস্তৃতির মাধ্যমে।

ইসলাম, একটি পরিপূর্ণ দ্বীন হিসেবে তার অনুসারীদের একটা সভ্যতা প্রস্তাব করে যার লক্ষ্য, জগতের প্রতিটি কোণায় আল্লাহর বাণীকে পৌছে দেয়া এবং আল্লাহর যমীনে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী শাসন নিশ্চিত করে মাখলুককে তার প্রাপ্য ইনসাফ ও আদল পাইয়ে দেয়া, জাহানে আল্লাহপাকের জালাল অ জামালের বহিপ্রকাশ করা,আমর বিল মা’রুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের যে খোদায়ী দায়িত্ব তার ওপর দেয়া হয়েছে তা পালন করা।

খিলাফাহর রাজনৈতিক বা জাহিরী হাকীকতের দিকে আমরা যতটা মনোযোগ দেই, খিলাফাহর অন্তর্গত বা বাতিনী হাকীকতের দিকে আমরা ততটা মনোযোগ দেই না। মানুষকে আল্লাহ কেবলমাত্র এই কারনে খিলাফাহ দেন নাই যে সে কেবল নিজ সমাজে তাওহীদ, ইনসাফ ও আদল কায়েম করবে, বরঞ্চ এর সাথে এই শর্তও সমভাবে প্রযোজ্য যে মানুষ নিজে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে অন্যান্য সকল মাখলুকাতের প্রতি, পরিবেশের প্রতি আদল করবে এবং নিজে খোদায়ী সিফাতসমুহ অর্জন করে জাহানে খোদার খিলাফাহ কায়েমের কাবিল খলীফা হিসেবে নিজেকে তৈরি করবে।

এই কারনে, আপনারা খেয়াল করে থাকবেন হযরত উমার(রা) চিন্তিত ছিলেন যে তার হুকুমাতের সময়ে যদি ফোরাতের তীরে কোন কুকুর না খেয়ে থাকে তবে তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এ থেকে বোঝা যায় আল্লাহ যার হিসাব নেবেন, তার জন্য হিসাব কত বেশি কঠিন করা হবে, কারন যমীনে আসা প্রতিটা মানুষই আল্লাহর খলীফা আর এই সূত্রে গোটা জাহানের সব মাখলুকের প্রতিই তার দায়িত্ব আছে।

আপনি একটু খেয়াল করলে এটাও ধরতে পারবেন, যতদিন জাহানের নিয়ন্ত্রন ইসলামের হাতে ছিল, ৬৪২ ঈসায়ী থেকে অন্তত ১৭৭০ ঈসায়ী তক, এই সময়ে খিলাফাহর অধীনে থাকা অঞ্চলে কোন হিউম্যান মেইড ম্যাস এক্সটিংকশানের উল্লেখ পাওয়া যায় না। কোন জনগোষ্ঠী অথবা কোন প্রজাতি ঝাড়ে-বংশে উজাড় করে দেয়া হয়েছে এমন উদাহরন ইসলামী শাসনের ইতিহাসে নেই।

এখন আধুনিক মুসলমান মানসে যে প্রশ্নের উদয় প্রায়ই ঘটে তা হল, কেন ইসলাম আক্রমনাত্মক যুদ্ধ করে বা করতে চায়??

অথবা, আদৌ কি ইসলাম আক্রমনাত্মক যুদ্ধ সমর্থন করে??

এই প্রশ্নের জবাবে আমি সরাসরি বলতে চাই, হ্যা, ইসলাম অবশ্যই আক্রমনাত্মক যুদ্ধ সমর্থন করে এবং আক্রমনাত্মক যুদ্ধের প্রবক্তা অবশ্যই হযরত উমার(রা) নন বরং স্বয়ং রাসুলুল্লাহ(সা)।

আমার বক্তব্যের স্বপক্ষে আমি যে উদাহরন প্রথমে দেবো তা হল কাইজার হেরাক্লিয়াস ও কিসরা খসরু পারভেজকে পাঠানো হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিঠি দুটো। উভয় চিঠিকেই কূটনৈতিক বিচারে চরমপত্র হিসেবে অভিহিত করা যায়, যেখানে পরিষ্কার উল্লেখ করা ছিল যে যদি তুমি ইসলাম গ্রহন না করো এবং আমাদের ইসলাম প্রচারে বাধা দাও, তবে তোমার জনগনের পাপের বোঝা তোমাকেই বহন করতে হবে। এর অনেকগুল সম্ভাব্য রাজনৈতিক অর্থের মাঝে এটাও অন্যতম যে, তোমাকে আমরা আজ অথবা কাল আল্লাহর ইচ্ছায় পাকড়াও করবো এবং তোমাকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাড় করাবো।(অতএব, ভেবে দেখো)

এই চিঠি পাওয়ার এক বছরেরও কম সময়ের ভেতর হেরাক্লিয়াস মু’তার ময়দানের দিকে নিজের সৈন্যচালনা করেন, যা মূলত রাসুলুল্লাহ(সা) এর পাঠান বাহিনীর জওয়াবী ফৌজ ছিল। এই যুদ্ধের উসকানীদাতা সিরিয়ান ক্রিশ্চিয়ানরা হলেও আক্রমনকারী নিঃসন্দেহে মুসলিমরা ছিল। কিন্তু এই অভিযানের উদ্দেশ্য কোন অঞ্চল জয় করা ছিল না।

মু’তার যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় তাবুক অভিযান সংঘটিত হয় যেখানে হেরাক্লিয়াস ছিলেন আক্রমনকারী এবং নবীজী(সা) ছিলেন রক্ষণাত্মক ভুমিকায়। পরে হেরাক্লিয়াস ভয় পেয়ে বাহিনী উঠিয়ে নিলে নবীজী(সা) যে ভুমিকা পালন করেন তা ট্যাকটিক্যালি এগ্রেসিভ হলেও স্ট্র্যাটেজিক্যালি ডিফেন্সিভ। মাত্রই কিসরার বাহিনীকে মিসর থেকে ইরান তক দীর্ঘ থিয়েটারে দুমড়ে মুচড়ে দেয়া রোমান বাহিনীকে আগ বাড়িয়ে জুনের গরমে এনগেজ করতে চাওয়ার মত ভুল পদক্ষেপ নবীজী(সা) নেন নাই, কেবলমাত্র দুমাতুল জান্দাল জয় করেই তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন।

এরপর ইন্তিকালের ঠিক আগেই নবীজী(সা) উসামা ইবন যায়িদ ইবন হারিসা(রা) কে সিরিয়া সীমান্তে অভিযানের জন্য পাঠান যা পরবর্তী সময়ে হযরত আবু বকর(রা) জারি রাখেন।

আমার মনে হয় আক্রমনাত্মক যুদ্ধের শুরুটা নবীজী(সা) করেছেন, এরপর এটা নিয়ে আর বিতর্কের কোন অবকাশ থাকে না।

কেন আক্রমণাত্মক যুদ্ধ??

ডিমিলিটারাইজড, ডিপলিটিসাইজড, সেক্যুলারাইজড মুসলিম সমাজে যুদ্ধ নিয়ে এলার্জি থাকবে তা বলাই বাহুল্য। এই এলার্জির মুল কারন দুনিয়ামুখীতা ও নফসের গলামী।

ইসলামে আক্রমনাত্মক যুদ্ধের কয়েক ধরনের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এখানে আমি উদাহরনসহ উদ্দেশ্যগুলি ব্যাখ্যা করছি।

ক)আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে আক্রমন করা হতে পারে। সীমান্তে শত্রুসেনা জমায়েত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং তাদের অধীনে এমন কিছু কৌশলগত এলাকা আছে যেখানে অবস্থান নিয়ে তারা দারুল ইসলামের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এমন অবস্থায় ঐ অঞ্চলে হামলা করার উদাহরন আছে। গাযওয়ায়ে বনী গাতফান, বনী আল মুস্তালিক এবং গাযওয়ায়ে খাইবার এর উদাহরন।

খ)শত্রুর বাণিজ্যপথকে বাধাগ্রস্ত করে তাকে অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেয়ার জন্য যুদ্ধ করা যেতে পারে।বদর যুদ্ধের আগে এধরনের বেশ কটি অভিযান কুরাঈশদের সিরিয়াগামি বাণিজ্য ধ্বংস করে দেয় যা তাদের বদর ও উহুদ অভিযানের দিকে ঠেলে দেয়।

কিন্তু এই দুটো কারনের কোনটাই একেবারে মূল কারন নয়। আক্রমনাত্মক যুদ্ধের মূল কারন হল আমর বিল মারুফ ওয়ান নাহি আনিল মুনকার নিশ্চিতকরনের মাধ্যমে কোন ভুমিতে আদল ও ইনসাফ কায়েম করা। প্রতিটি তাগুতী শাসন কোন না কোন মিথ্যা দ্বীন তৈরি করে রাখে যা শেষতক জনগনকে আল্লাহর খলিফার যে মর্যাদা তা থেকে বঞ্চিত করে শাসক/শাসনকারী ব্যবস্থার গোলামে পরিনত করে এবং এর ফলে জনগন তার প্রাপ্য আদল ও ইনসাফ থেকে বঞ্চিত হয়। মিথ্যা দ্বীনগুলিও মূলত এই প্রবঞ্চক শাসনব্যবস্থাগুলিকেই আকড়ে ধরে টিকে থাকে, ফলে মানুষ তাওহীদের সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়। একারনেই হযরত শাহজালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি সিলেটে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন।

ইসলামের আগমন এইজন্য হয় নাই যে তা ন্যায়ের পাশাপাশি অন্যায়কে জিইয়ে রাখবে, বরঞ্চ ইসলামের আগমন হয়েছে অন্যায়কে উপড়ে ফেলতে। আল্লাহর চোখে অবৈধ রাজনৈতিক শাসন কাঠামো, যা মানুষকে তার মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে তাকে উপড়ে ফেলার মাধ্যমে ইসলাম নিশ্চিত করতে চায়, মানুষ পৃথিবীতে মানুষের মতই বাচার অধিকার পাবে। সে যারই উপাসনা করুক, সে যেন আদল ও ইনসাফ লাভ করে, এটা ইসলামের এক নম্বর প্রায়োরিটি, কনভার্সন ইসলামের এক নম্বর প্রায়োরিটি নয়। পাশাপাশি, রাজনৈতিক ক্ষমতা আমর বিল মারুফ ওয়ান নাহি আনিল মুনকার জারি রাখার জন্য একেবারে অপরিহার্য একটি বিষয় যা ছাড়া কোথাও ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। আপনারা নিশ্চয়ই এটা আশা করেন না যে কোন বাতিল শাসনব্যবস্থা ইসলামের হয়ে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে দেবে, কেননা এটা তার অস্তিত্ববিরোধী।

তাই, সাম্রাজ্যবিস্তার ইসলামের জন্য জরুরী, কেননা রাজনৈতিক ক্ষমতাছাড়া এই দ্বীনের বাস্তবায়ন অসম্ভব।

জমীন নাকি জনগন??

ইসলাম কি শুধু নতুন ভুখণ্ড জয় করতে চায় নাকি জনগনের হৃদয় জয় করাই তার উদ্দেশ্য??

এই সুশীল প্রশ্নের জবাব হল, দুই নম্বরটা এক নম্বরটা থেকে বিচ্ছিন্ন না। কিন্তু অবশ্যই, ইসলামের উদ্দেশ্য জনমুখী। ইসলাম জমীন নয়, জনগনই গ্রহন করবে। কিন্তু যেহেতু জনগনের থাকার জন্য জায়গার প্রয়োজন, তাই জমীনকে জনগনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোন সুযোগ নেই।

পৃথিবীতে ইনসাফ ও আদল তথা ন্যায়বিচার কায়েম করতে গেলে রাজনৈতিক ক্ষমতার কোন বিকল্প নেই। আর যুদ্ধ হল রাজনৈতিক অবস্থা/ব্যবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে সামরিক বলপ্রয়োগ হিসেবে রাজনীতিরই অংশ। যে আক্রমন ছাড়া শুধুই রক্ষনে বিশ্বাসী, ক্রমাগত শত্রুর আক্রমনে তার ধ্বংস অনিবার্য।

তাই, আক্রমণাত্মক যুদ্ধ সংক্রান্ত ইসলামের অবস্থান নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগার কোন কারন নেই। যার রাজনীতি আছে, তার যুদ্ধও আছে। যার যুদ্ধ আছে, তার যেমন রক্ষন আছে তেমনি আছে আক্রমণ। আক্রমনাত্মক যুদ্ধকে অস্বীকার করার অপর মানে হল নিজেদের রাজনৈতিক সত্ত্বাকেই অস্বীকার করা।

রাজ্যবিস্তারের জন্য নয় বরঞ্চ ভুলুন্ঠিত ইনসানিয়াতকে তার হারানো মর্যাদার স্থানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে পৃথিবীতে ন্যায়বিচার কায়েম করাই ইসলামের আক্রমণাত্মক যুদ্ধের উদ্দেশ্য।

শুকরান।


ইসলাম
০ টি মন্তব্য      ৬০৭ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: