অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ১৯ জন ভিজিটর

বনানীও কি আমাদের বোধ জাগ্রত করতে পারবে না?

লিখেছেন লাবিব আহসান মঙ্গলবার ০২ এপ্রিল ২০১৯

আর দশটা সকালের মতোই শুরু হয়েছিলো সকালটা। বিপণী বিতানগুলো সাজিয়ে বসেছিলো তার হরেক পণ্যের পসরা। অফিসের ল্যাপটপগুলোর স্ক্রিনে জটিল সব হিসেব নিকেশ ভেসে উঠছিলো। কী বোর্ডগুলোতে অবিশ্রান্তভাবে শব্দ হচ্ছিলো, "খট খট খট....."। বয়ে চলছিলো সময়ের কাঁটা। সবাই ব্যস্ত নিজেদের কাজ কর্ম নিয়ে। মাথায় হয়তো নতুন দিনের স্বপ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো, "এবার পল্টনকে গুডবাই বলে দিয়ে গুলশানের দিকে একটা বাসা নিতে হবে। " কিংবা কারো মাথায় ঘুরছিলো গ্রামে আরও বিঘা দুয়েক জমি নেয়ার চেষ্টা। টাকা প্রায় জমে এসেছে। কারো চোখে ভাসছিলো ব্যবসাটাকে আরও ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করার। কারোর বা বউ বাচ্চা নিয়ে দার্জিলিং যাওয়ার পরিকল্পনাটা ঝুলে ছিলো অনেকদিন। কেউবা স্বপ্ন দেখছিলো ব্যবসা থেকে প্রফিট পেলে একটা বিএমডব্লিউ কিনে ফেলবে। কারোর বা নিছক জীবনের প্রয়োজন। সময় গড়াতে গড়াতে ১২ টার কাঁটা স্পর্শ করে গড়িয়ে পড়লো খানিকটা। রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ এর এফ আর টাওয়ারের সুরম্য ২৩ তলা ভবনটির বাতাসে তখনও ওড়াউড়ি করছিলো অবাধ্য অবুঝ স্বপ্নেরা। হঠাৎ সে স্বপ্নেরা পরিণতি পেলো কালো ধোঁয়ায়। এক মুহূর্তে ফিঁকে হয়ে গেলো স্বপ্নদের অনভিপ্রেত জানান দেয়া অস্তিত্ব। এক মুহূর্ত আগের বড় বড় অভিজাত স্বপ্ন দেখা মানুষগুলোর স্বপ্ন এসে মিললো একটি ছোট্ট বিন্দুতে; নিছক জীবন বাঁচানো। আর কিছুই চাই না তাদের। শুধু একটু জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখা। দার্জিলিং এর অপার সৌন্দর্য এখানে তখন নিতান্ত হয়ে উঠলো। গুলশানের আলিশান বাড়ি আর বিএমডব্লিউ হয়ে উঠলো নিছক। ব্যবসাকে মহীরুহে পরিণত করার ইচ্ছেটাকে ক্ষণিকের জন্য মনে হলো পানসে। এখন মাথায় একটা ভাবনাই ঘুরপাক খাচ্ছিলো, "আল্লাহ শুধু বাঁচিয়ে দাও। আর কিচ্ছু চাই না।"

শুরু হলো মানুষগুলোর ছোটাছুটি আর বাঁচতে চাওয়ার আঁকুতি। প্রিয়জনের নিকট থেকে শেষ বিদায় নেয়া। তীব্র ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই প্রথমবারের মতো মনে হলো, আল্লাহর দেয়া অমূল্য নেয়ামত অক্সিজেনের জন্য জীবনে একটা দিনও শুকরিয়া আদায় করার সময় হয়ে ওঠে নি। বড় হবার তীব্র নেশায় শুক্রবার আর দুই ঈদের নামাজ ছাড়া খুব একটা সিজদায় মাথা নত করা হয় নি। কখনও শেষ রাতে উঠে সিজদায় লুটিয়ে জায়নামাজ ভিজিয়ে বলা হয় নি, "রাব্বুল আলামিন, আমাকে যা দিয়েছো, তাতেই আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট। মাবুদ গো, তুমিও আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাও।" সম্পদ বাড়ানোর নেশা অন্ধ করে রেখেছিলো। জীবন মৃত্যুর এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ এই কথাগুলোই মনে হতে লাগলো বারবার। ভাঙ্গা জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখা গেলো নদীর স্রোতের মতো উৎসুক জনতা। মৃত্যুর এই অন্তিম সময়ে দাঁড়িয়ে একবার খুব ইচ্ছে হলো এই মানুষগুলোকে জানাতে, "হে মানুষ, আমরা ছুটছি মরীচিকার পিছনে। দেখো, জীবন কতই না ঠুনকো আর অনিশ্চিত এখানে। মৃত্যু এখানে কতটাই অনিবার্য আর কত বেশি নিকটবর্তী। অথচ আমরা আমাদের পুরো জীবনটাই কাটিয়ে দিলাম শূন্যের পিছনে হেঁটে হেঁটে। একে অপরের চেয়ে বেশি পাওয়ার নেশায় উন্মাদ হয়ে কেটে গেলো জীবনের সোনালী সময়গুলো। ঝকঝকে এক হাজার টাকার নোটগুলো গোণার ব্যস্ততায় কখনও কোরআন শরীফটা হাতে নিয়ে দেখা হলো না, আল্লাহ তাঁর বান্দাকে কি কাজের জন্য দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। জানা হলো না প্রিয় রাসূলের সংগ্রামী জীবনের ৬৩ বছর কিংবা আসহাবে রাসূলের জীবনকথা। বিদায় বেলায় আজ কত শত ব্যর্থতার ক্যানভাস ভাসছে দু'চোখে।"

নিমতলী, চুড়িহাট্টা আর বনানীরা আমাদের শিখিয়ে যায়। শিখিয়ে যায় রাজপথে পড়ে থাকা আবরারের এবরো থেবড়ো লাশ। জানান দিয়ে যায়, "এ জীবন কতই না ক্ষণিকের!" যে কোনো মুহূর্তে আমরা নাই হয়ে যেতে পারি। পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে হারিয়ে যেতে পারে আমার নামটি। মুছে যেতে পারি সকল প্রিয়জনের হৃদয় থেকে। প্রিয়জনরা কিছুদিন কান্নাকাটি করে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়বে নিজেদের জীবন নিয়ে। তারপর? তারপর আমাকে দাঁড়াতে হবে এক মহাপরাক্রমশালী সম্রাটের সামনে একদিন। সেদিন বিএমডব্লিউ নয়, আমাকে বাঁচাতে দাঁড়াবে আমার শেষ রাতের চোখের অশ্রু। আমরা চোখের সামনে মানুষগুলোকে হারিয়ে যেতে দেখি। হাহাকার প্রকাশ করি। কিন্তু একবার শপথ করে গিয়ে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যেতে পারি না। চোখের নদী বইয়ে মালিককে বলতে পারি না, "প্রভু আমার, এতোদিন আমি ছুঁটেছি মরিচীকার পিছনে। কিন্তু আজ আমি তোমার আশ্রয়ে ফিরে এসেছি। আমাকে তোমার পবিত্র আশ্রয় থেকে বঞ্চিত করো না মাবুদ।" আমাদেরকে আমাদের মালিকের কাছে ফিরতে কে বাঁধা দেয়? কেন আমরা শুনতে পাই না রাব্বুল আলামীনের সেই উচ্চারণ, "হে মানুষ, কোন জিনিস তোমাদেরকে তোমাদের মহামহিম রবের ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলে রাখলো?" [সূরা ইনফিতার-৬]


বনানী অগ্নিকাণ্ড আগুন হতাহত লাফিয়ে পড়া ঠুনকো জীবন মৃত্যু বোধ
০ টি মন্তব্য      ৫২০ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: