অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ১৬ জন ভিজিটর

খলীফাতুল মুসলিমিন উসমান ইবনে আফফান (রাঃ) শাহাদাতের মর্মন্তুদ ইতিহাস...........

লিখেছেন লাবিব আহসান শনিবার ২০ জুন ২০২০

৩৫ হিজরীর যিলহজ্জ মাসের বৃহস্পতিবার। খলীফাতুল মুসলিমীন উসমান (রাঃ)  রোযা রাখলেন। তাঁর ইফতারের জন্য উপস্থিত সাহাবা পানি পৌঁছাতে চাইলেন। কিন্তু পারলেন না। ইফতারের সময় সন্নিকটে চলে এলো। অথচ খলীফা তাঁর পরিবার কিছু না খেয়েই রোজামুক্ত হলেন। পরদিন সেহরীর সময় স্ত্রী হযরত নায়েলা (রা) প্রতিবেশীর ঘর থেকে গোপনে সামান্য পানি নিয়ে আসলেন খলীফার জন্য। তখন হযরত উসমান (রা) আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন ফজর হয়ে গেছে। তাই তিনি বললেন, “আমি রোযার নিয়ত করে ফেলেছি”। স্ত্রী আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কাউকে তো আপনার নিকট আসতে দেখলাম না। খাবার কোথায় পেলেন?”

এ সময় উসমান (রা) অত্যন্ত বিস্ময়কর মুগ্ধকর একটি স্বপ্ন শুনালেন স্ত্রীকে। তিনি বললেন, “আমি স্বপ্নে রাসূল (সাঃ) কে দেখলাম। তিনি এই ছাদের ফাঁকা দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তাঁর হাতে একটি বালতিতে পানি। রাসূল (সাঃ) বললেন, ‘নাও উসমান পান করো’। তখন আমি তৃপ্তি সহকারে সে পানি পান করলাম। রাসূল (সাঃ) বললেন, ‘আরো পান করো’। আমি আরো অধিক পরিমাণে পান করে ভরপেট হয়ে গেলাম। তখন রাসূল (সাঃ) বললেন, ‘জাতি তোমার সাথে ঘৃণ্য আচরণ করবে। যদি তুমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো তাহলে জয়লাভ করবে। আর যদি নিবৃত থাকো তাহলে আমাদের সাথে ইফতার করতে পারবে’।” স্ত্রীকে এ ঘটনা বলে হযরত উসমান (রাঃ) রাসূল (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাতলাভ পূর্ব সুসংবাদের ভিত্তিতে যুদ্ধ বিগ্রহ পরিহার করে স্বাভাবিক ভাবে সব সমস্যা প্রতিকার করতে মনস্থ করলেন।

৩৫ হিজরীর যিলহজ্জ মাসের ১৮ তারিখ। পবিত্র জুমআর দিন। সাহাবী কাছির ইবনে ছালত আমীরুল মুমিনিনের নিকট আসলেন। তাঁর নিকট বিনীত নিবেদন করলেন, “হযরত! আপনি বাড়ির আঙিনায় বসুন। সবাই আপনাকে দেখুক। তাহলে তারা পিছু হটে যাবে হয়তো।” এর কারণ ছিল মানুষের নিকট আমীরুল মুমিনীনের ভারত্ব শ্রদ্ধাপূর্ণ অবস্থান। কেননা তখন তাঁর বয়স ছিল ৮২ এরও উপরে।

হযরত উসমান কাছির (রাঃ) কে বললেন, “কাছির! আমি গতরাতে স্বপ্নে দেখলাম যে, রাসূল (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করেছি। তাঁর পাশে হযরত আবু বকর হযরত ওমর বসে আছেন। রাসূল (সাঃ) আমাকে বললেন, “উসমান! চলে আসো। আমাদের সাথে ইফতার করো।’ খোদার কসম! আজকের সূর্যাস্তের পূর্বেই আমি আখেরাতের যাত্রী হয়ে যাবো।” কথা শুনে হযরত কাছির ইবনে ছালত (রাঃ) বের হয়ে গেলেন। আমীরুল মুমিনীন সেসময় একটি সেলোয়ার দিতে বললেন। তিনি ইসলামপূর্ব জামানায় সেলোয়ার পরতেন। ইসলাম গ্রহণের পর এই একবার সেলোয়ার পরলেন।

 

হযরত উসমান (রা) ছিলেন অত্যন্ত লজ্জাশীল। তাই, তিনি আশংকা করছিলেন, লুঙ্গী পরে থাকলে মৃত্যুর সময় সতর খুলে যেতে পারে। সেলোয়ার পরিধান করে পবিত্র কোরআনের একটি নুসখা সামনে নিয়ে তেলোয়াত করতে থাকলেন। এমন সময় হযরত উসমান (রাঃ) এর গোলামগণ শেষবারের মতো মুনিবের অনুমতি নেয়ার  উদ্দেশ্যে ঘরে প্রবেশ করলেন। তারা আবারো বিদ্রোহীদের প্রতিহত করার জন্য লড়ইয়ের অনুমতি চাইলেন। তখন মহৎপ্রাণ খলীফা আল্লাহর দোহাই দিয়ে তাদেরকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, “যে তরবারী কোষবদ্ধ করবে সে আযাদ।” এরপর তিনি বললেন, “আমি হযরত আদম (আঃ) এর মজলুম ছেলের মতো হতে চাই।” এ কথা বলে কোরআনের যে আয়াতে তাঁর বক্তব্য এসেছে সে আয়াত তিলাওয়াত করলেন।

 

বাহিরে সাবায়ী ফিতনাবাজরা কৌশল নিয়ে আলাপ আলোচনা করছিলো। কীভাবে তাড়াতাড়ি উসমান (রা) কে হত্যা করা যায়। কারণ তারাও শুনে ফেলেছে যে, আমীরুল মুমিনিনের সাহায্যার্থে বিভিন্ন প্রদেশ থেকে সৈন্যবাহিনী রওনা হয়েছে। সে সময় আমীরুল মুমিনিন হযরত উসমান  (রাঃ) এর ঘরের দরজায় হযরত হাসান হযরত হোসাইন (রাঃ) পাহারা থাকার কারণে সন্ত্রাসীরা সেদিক দিয়ে প্রবেশ না করে ঘরের পেছনের দেয়াল টপকে ঘরে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিলো।

 

প্রথমে কানানা ইবনে বিশর নামক এক দুরাচারী ভেতরে প্রবেশ করলো। তার সাথে কিছু চেলা চামুন্ডাও প্রবেশ করলো। একটু পর আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাও প্রবেশ করলো। তারা আমীরুল মুমিনিনের শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করে। এজন্য প্রচন্ড জোরে হযরত উসমান (রাঃ) গলা চেপে ধরে। একসময় তারা মনে করে আমীরূল মুমিনিন হয়তো মারা গিয়েছেন। এই ভেবে তাঁকে ছেড়ে দেয়। সে সময় হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এর সন্তান সেই গৃহে প্রবেশ করেন। এই একজন মাত্র সাহাবী কী কারণে যেন এই ফিতনায় জড়িয়ে পড়েছিলেন, তা বোধগম্য নয়।

 

মুহাম্মদ বিন আবু বকর হযরত উসমান (রাঃ) এর দাড়ি ধরে জিজ্ঞেস করলেন- “হে মূর্খ বুড়ো! কোন ধর্মের উপর আছো তুমি?” উসমান (রা) উত্তরে বললেন, “ইসলাম ধর্মের উপর আছি। আমি মূর্খ বুড়ো নই। আমি আমীরুল মুমিনিন।” তখন মুহাম্মদ বিন আবু বকর বললেন, “তুমি আল্লাহর কিতাবের হুকুম পরিবর্তন করে দিয়েছ।” হযরত উসমান বললেন, “এই যে কিতাবুল্লাহ আমাদের সামনেই আছে, ভালো করে পড়ে দেখো।” তখন তিনি সজোরে দাড়ি টেনে ধরে বললেন, “আমরা কেয়ামতের দিবসে একথা বলতে চাই নাহে আল্লাহ! আমরা আমাদের নেতাদের অনুসরণ করেছি। তারা আমাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে।

 

আসলে মুহাম্মদ বিন আবু বকর তার কিছু বন্ধু মনে করেছিল আমীরুল মুমিনিনকে হত্যা করা বড় পুণ্যের কাজ এবং এই দায়িত্ব পালন করলে নাজাত পাওয়া যাবে। তখন মুহাম্মদকে উদ্দেশ্য করে উসমান (রা) বললেন, “বেটা! তুমি যে দাড়ি ধরে টানাটানি করছ সে দাড়িকে তোমার পিতা সম্মান করতেন।” কথা কর্ণে প্রবেশ করা মাত্রই মুহাম্মদ বিন আবু বকরের হৃদয়ে ঝড় ওঠলো। তাঁর চোখের সামনে থেকে বিভ্রান্তির সকল পর্দা অপসারিত হয়ে গেলো। তাঁর মনে পড়ে গেলো রাসূল (সাঃ) এর সঙ্গে হযরত উসমান (রা) এর পারিবারিক সম্পর্ক পিতা আবু বকর (রা) এর সাথে সকল শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালোবাসা মুহাব্বতের ইতিহাস। সাথে সাথে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। লাফ দিয়ে দূরে সরে দাঁড়িয়ে গেলেন।

 

সময় মুহাম্মদ দেখতে পান আরো অনেক ফিতনাবাজ ঘরে প্রবেশ করেছে। প্রবেশ করে সন্ত্রাসীরা আমীরুল মুমিনিনের তরবারী ছিনিয়ে নিলো। এদিকে মুহাম্মদ বিন আবু বকর সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু এতো লোকের বিরুদ্ধে তিনি কুলিয়ে উঠতে পারলেন না। তাঁকে ফেলে দিয়েই সন্ত্রাসীরা হযরত উসমান (রাঃ) এর উপর একযোগে হামলে পড়লো। সময় অভিশপ্ত পাপী কিনানা ইবনে বিশর আমীরুল মুমিনিনের তরবারী নিয়ে তাকে আঘাত করলো। সে আঘাত প্রতিহত করতে গিয়ে হযরত উসমান (রাঃ) এর হাত কেটে গেলো। আঘাত খেয়ে উসমান (রাঃ) সজোরে বলে উঠলেন, “বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ।” হযরত উসমানের হাতকাটা রক্তগুলো কোরআনের যে আয়াতের উপর পতিত হয়েছিলো তার অর্থ হলো, “তাদের বিপরীতে মহান আল্লাহই আপনার জন্য যথেষ্ট।”

 

এমন সময় মালাউন কেনানা আমীরুল মুমিনিনের বুক বরাবর তরবারী দিয়ে আঘাত করে। পতিপরায়ণা স্ত্রী নায়েলা কেনানাকে প্রতিহত করার জন্য এগিয়ে আসেন। তরবারির আঘাতে উসমান (রাঃ) এর প্রিয়তমা স্ত্রীর হাতের আঙ্গুলগুলো কেটে পড়ে যায়। ফলে হযরত নায়েলা মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর কেনানা পুনরায় আমীরুল মুমিনিনের বুকে আঘাত করে। তখন সাওদান নামক আরেক শয়তান আমীরুল মুমিনিনের পেটে আঘাত করল। ফলে হযরত উসমান (রাঃ) মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তখন এই দুরাচারী হযরত উসমান (রাঃ) এর পেটে উঠে তাঁর মৃত্যুকে নিশ্চিত করতে তরবারী দ্বারা সজোরে চাপ দিলেঅ। বারের আঘাতে হযরত উসমান (রাঃ) পরম প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেলেন। শাহাদাত বরণ করলেন হযরত রাসূলে কারিম (সাঃ) এর প্রিয় জামাতা, একান্ত সহচর, সম্মানিত সাহাবী, দুঃখ দিনের সাথী হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ)


২০ জুন উসমান ইবনে আফফান তৃতীয় খলীফা মুসলিম শাসন ইসলামের ইতিহাস
০ টি মন্তব্য      ৭২৯ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: