অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৯ জন ভিজিটর

জ্বীন সাধনের প্রতি মানুষের আগ্রহের কারণ...

লিখেছেন Nazrul Islam Tipu বৃহস্পতিবার ২৮ মার্চ ২০১৯

জ্বীন সাধন আর অসাধ্য সাধন মানুষেরাই করে। ব্যতিক্রম ধর্মী এই সাধনার পিছনে মানুষের আগ্রহ কৌতূহল কম নয়। আমাদের দেশে মূলত জ্বীন সাধনটাকে অর্থ-কড়ি উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবেই গ্রহণ করে। এত কষ্ট ও ধৈর্যের সহিত জ্বীন সাধন করে ঝুঁকিপূর্ণ জীবন নিয়ে অর্থ কামানোর চেয়ে, পরিশ্রম করে অর্থ আয় করা আরো সহজ আর উত্তম এবং এটা সুখী জীবন পাবার অন্যতম রাস্তা। জ্বিন সাধন করা কঠিন ও ঝুঁকিময়। উল্টো বদ জ্বীন সঙ্গী হলে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারে। যার শেষ পরিণতি শেষ পর্যন্ত জীবন হানি। বৈদ্যদের শত্রু বাড়ে, তাদের পরিবারের মানুষদের ক্ষতি করে। কোন বৈদ্যকে নির্বংশ হতে দেখেছি। রাত-বিড়াতে একাকী চলাটা তাদের জন্য মোটেও নিরাপদ হয়না। এক পর্যায়ে তারা সঙ্গী ছাড়া চলতেও পারে না। সে সঙ্গী স্ত্রী-পুত্র হলেও চলেনা।

জ্বীন সাধন নিয়ে লিখা আমার পরিকল্পনায় ছিলনা। কিছু উৎসাহী পাঠক আমাকে ঘন ঘন ম্যাসেজ পাঠাচ্ছিলেন যে, কিভাবে জ্বীন সাধন কিংবা বন্ধুত্ব কিংবা দাসত্ব করা যায়, সে ব্যাপারে যাতে পরামর্শ দেই! তাদের উত্তর লিখতে গিয়ে দেখলাম এটা একটা পোষ্টের আকার ধারণ করবে। তাই সিদ্ধান্ত বদলিয়ে আলাদা একটি পোষ্ট বানিয়েছি; তাছাড়া এটাও জ্বীন সম্পর্কিত ধারাবাহিকের সাথে, কাজেও লেগে যেতে পারে।

জ্বিন সাধনের বহু নিয়ম নীতি আছে। এ ব্যাপারে বাজারে বহু বই পাওয়া যায়। সেদিন দেখলাম ইউটিউবে ভিডিও টিউটোরিয়াল ও বের হয়েছে! যাই হোক, একাদিক্রমে সন্ধ্যা বেলায় পবিত্র কোরআনের তিনটি সুরা যথাক্রমে, ইখলাস, ফালাক ও আন-নাছ সুরা গুলোকে উল্টোভাবে পড়ার অভ্যাস রপ্ত করতে হয়। এটা প্রাথমিক পূঁজি! যদিও এসব সুরা ঠিকভাবে পড়লে জ্বীন শয়তান পালাতে বাধ্য হয়। উল্টোভাবে পড়ার মাধ্যমে জ্বীনদের আকর্ষণ বাড়ার সম্পর্ক কি তার উত্তর এখনও পাইনি। তবে এটা নির্ঘাত একটি জঘন্য ও শয়তানি কাজ, সে ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। তান্ত্রিকেরা সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তে মন্ত্র জপ করে। জাতি-গোত্র ভেদে মন্ত্রের তফাৎ হয়। তবে মন্ত্র বলি, জপ বলি কিংবা আমল; কথাগুলোতে আল্লাহ, ঈশ্বর তথা স্রষ্টাকে কে অস্বীকার করা হয় এবং একজন জ্বীনের তালাশে নিজেকে সঁপে দেবার ঐকান্তিক ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়। সম্ভবত এই কারণে জ্বিনেরা আগ্রহী হয়, কেননা জ্বীনেরা মানব সন্তানের মৌলিক গুনাবলীকে বরদাশত করতে পারেনা। নিজেরা সৃষ্টির সেরা হওয়া সত্ত্বেও দুর্বল জ্ঞানহীন জ্বীনদের কাছে সাহায্য চায় বলে, তারাও ভাবে গদগদ হয়।

জ্বীন সাধনা করতে গিয়ে উল্টো অনেকেই জ্বীনের কবলে পড়ে পাগল হয়ে যেতে পারে। সাধক ব্যক্তিকে অনেক সাহসিকতার পরিচয় দিতে হয়। কেউ জানেনা কাকে কিভাবে এই সাহসিকতা দেখাতে হবে। তা নির্ভর করে ব্যক্তির উপস্থিত পরিবেশ ও পরীক্ষার ধরনের উপর।

চিরকুমার এক সুফিকে দেখতাম, যিনি সর্বদা মৌনতা সহকারে বসবাস করতেন। তাকে সহজ, সরল, সোজা মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করত। পৌঢ় বয়সের মানুষ একাকীত্বে ভুগে। সংসার বিরাগী এই ভাল মানুষটির ব্যক্তিগত কথা জানতে গিয়ে জানালেন এক কঠিন বাস্তবতার কথা। তিনি আফসোস করে বলেছিলেন জ্বীন সাধন করতে গিয়েই তার এই দশা। পিতৃপ্রদত্ত ধন থাকলেও, একজন পাগলকে কেউ মেয়ে বিয়ে দেয় না। প্রশ্ন করেছিলাম আপনি তো ভাল মানুষ। তিনি বললেন, "সকল প্রবীণেরা জানে যে, আমি পাগল, আর জ্বীন সাধন করার অভিলাষ আমাকে সর্বস্বান্ত করেছে"। উদাহরণ দেবার জন্য তার ব্যর্থ জ্বীন সাধনার ঘটনাটিকে আমি উপস্থাপনা করব।

অনবরত একচল্লিশ দিনের মাগরিব নামাজ একচল্লিশ মসজিদে পড়তে হবে। নামাজের পরে দীর্ঘক্ষণ বসে নির্দিষ্ট দোয়া পড়া লাগে। এই ধারাবাহিকতার কোন একদিন জ্বীন দেখা দিতে পারে। তার ক্ষেত্রে এক-চল্লিশতম দিনের সন্ধ্যায় ঘটেছিল একটি বিচিত্র কাণ্ড। তখনকার দিনে এত মসজিদ গড়ে উঠেনি। ফলে মসজিদের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকাতে মুসাফিরের মত হাজির হওয়া লাগত। এক-চল্লিশতম মসজিদ টি ছিল লম্বা রাস্তার পাশে। আশে পাশে কোন লোকালয় ছিলনা। মূলত এটাকে মসজিদ না বলে, এবাদত খানা বলাই যুক্তিযুক্ত। দূরের মানুষ চলার পথে অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় যাত্রা বিরতি করে। এটি ছিল একটি বিরান ভিটা, একটি ছোট্ট পুকুরের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, কোন কালে কারো পরিবার ছিল। ফসলের মৌসুমে বিলের কৃষকেরা অস্থায়ী ঘর বানিয়ে কিছুদিন থাকে। সেই পুকুরের পাড়েই সৃষ্টি হয়েছিল এই এবাদত খানা। মানুষ চলাচলের সময় এখানে থেমে নামাজ পড়ে নিত। মোমবাতি ও দেয়াশলাই রেখে যেত, যার দরকার সে আলো জ্বালাত। মসজিদের অভাব হেতু, তিনি এই মসজিদেই সন্ধ্যার আমল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

আলো আধারিতে জ্বীন সাধন করার এক পর্যায়ে দেখেন, দূর-দুরান্তের একটি পরিবার সেখানে এসে হাজির হয়েছে। সাথে আছে পিতা-মাতা, শক্ত সামর্থ্য দুটি ছেলে একটি কোলে থাকা কন্যা শিশু। তারা সাথে করে বিরাটকায় এক ডেকচি ও কিছুটা জ্বালানী বয়ে এনেছিল তথায়। পুরুষেরা নামাজ শুরু করলেন, মহিলা খানা তৈরির জন্য পুকুরের কিনারে আগে থেকে সৃষ্ট একটি গর্তের মুখে ডেকচি বসিয়ে আগুন জ্বালিয়েছে। তন্ময় হয়ে সাধক এসব দেখছিল ওদিকে সন্ধ্যা ঘন আধারিতে রূপ নিয়েছে। ঝি ঝি পোকার ডাক, দূরে শৃগালের চিৎকার সবই কানে আসছিল। এদিকে আগন্তুক পরিবারে রান্নার জন্য জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বড়দের নামাজ শেষ হয়েছে। তারা জ্বালানী সমস্যা সমাধানে চেষ্টিত হলেন। উপায় না পেয়ে তাদের বাবা তার মাথার পাগড়ীটি চুলোয় ঢুকিয়ে দেয়! ছেলেরা আগে থেকেই জ্বালানীর সন্ধানে ছিল, তারা পিতার দেখা দেখি চুলোর আগুন বাড়ানোর নিমিত্তে নিজেদের পোশাকাদিও চুলোয় ঢুকিয়ে দেয়! সাধক এ দৃশ্য দেখে ভাবে মানুষগুলো পাগল কিনা? জ্বালানির অভাবে চুলো ভাল করে না জ্বলার কারণে, তাদের মা গোস্বায় কান্নারত কন্যা শিশুটিকে হাতে তুলে নিয়ে, সজোরে চুলোর আগুনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়! এতক্ষণ সাধক মসজিদে বসে এসব দৃশ্য নীরবে সহ্য করছিলেন, এখন আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা ভর করেছে, নিজের অজান্তেই চিৎকার করে বলে উঠল, হায়! হায়! তোমরা এটা কি করলে?

মুহূর্তে আগন্তুকদের সবাই তার দিকে ফিরে তাকালেন। ভাবখানা এমন যে, এবাদত খানায় একজন জলজ্যান্ত মানুষ বসে আছে, তাকে তারা দেখেই নি! তাদের পিতা ছেলেদের নির্দেশ দিলেন, এই মানুষটিকে ধরে এনে চুলোয় ঢুকিয়ে দাও, তাহলেই আগুন জ্বলে উঠবে। ছেলেদের চোখাচোখি হওয়া ও অজানা বীভৎস পরিণতির কথা ভেবে সাধকের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। তাদের চাহনীতে ছিল চরম হিংস্রতা! যারা নিজের কন্যার সাথে চরম জঘন্য আচরণ করতে পারে, তারা একজন সাধারণ মানুষের প্রতি আরো নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে। ভয়ানক আতঙ্ক তাকে ঘিরে ধরে, মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাঁচাও বাঁচাও বলে, জ্ঞানশূন্য হয়ে ভৌঁ দৌড় দিলেন। এর পরের কথা তার আর মনে ছিলনা। পথিকেরা রাস্তার পাশ থেকে বেহুশ অবস্থায় রাত্রেই উদ্ধার করে। আতঙ্ক তাকে এতটুকু গ্রাস করেছিল যে, মাতালের মত প্রলাপ বকত! দীর্ঘদিনের মানসিক চিকিৎসার পরে তিনি সুস্থ জীবনে ফিরে আসেন কিন্তু সেই সন্ধ্যার বিভৎস ধকল সারা জীবনেও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

উপরে বর্ণিত দৃশ্যকে কাহিনী বলুন, গল্প-কিসসা আর ঘটনা বলুন আমার কোন আপত্তি নেই। আমি জোড় করছি না যে, এই ঘটনাকে বিশ্বাস করুন। তবে যারা দৃঢ় বিশ্বাস করে যে, জ্বীন সাধন করে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিবে; এটা তাদের জন্য সাবধানতা ও হুশিয়ারির ব্যাপার হতে পারে। জানার আগ্রহ নিয়ে কৌতূহল জন্মালে তথ্য জানা যেতে পারে সেটা ভিন্ন কথা কিন্তু আয়-রোজগারের জন্য এই পথ না মাড়ানোই উচিত। আমি নিজেও একবার পিলে চমকানো ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিয়ে ভূতের মুখোমুখি হয়েছিলাম! যার ক্ষেত্র ও লক্ষ্য ছিল ভিন্ন! সেই ঘটনা সামনের পর্বগুলোতে আসবে।

সেই ফেরিওয়ালার কথা কি মনে আছে? যার কারণে আমি যাদুবিদ্যার বহু বইয়ের মালীক হয়েছিলাম। সে সব বইয়ের কল্যাণে, জ্বীন সাধনার যতগুলো পদ্ধতি আছে আমি সে গুলো সম্পর্কে আগেই অবহিত ছিলাম। প্রতিটি বইতে চরম বিপদ সম্পর্কে পরিষ্কার হুশিয়ারি আছে। তাই আবদুল কাদেরকে প্রশ্ন করলাম, আমিতো সাধনা করতে চাইনা, আগ্রহও নাই। জ্বীন কিভাবে তাড়ানো যায় সে ব্যাপারে কিছু বুদ্ধি তো শিখিয়ে দিতে পারেন?

তিনি বললেন, কাজটি একটু কঠিন এবং অভিজ্ঞতার আলোকে করতে হয়। তুমি তো দেখেছো তোমার শিক্ষক থেকে কিভাবে জ্বীন ছাড়িয়েছি?

পরবর্তীতে আমি তাকে খুব কম সময়ের জন্যই পেয়েছিলাম। তবে তিনি তার বহু রোগী ও তাদের জন্য নেওয়া পদক্ষেপ গুলোর কথা আমাকে জানিয়েছিলেন। পাহাড়ি এবং সমতলের উভয় রোগীদের ঘটনার অনেকগুলো আমি লিখে রেখেছিলাম। যেগুলো পরবর্তীতে আমাকে অনেককিছু বুঝতে সহযোগিতা করেছিল। পরবর্তী সময়ে আমার নিজের চোখে দেখা, বৈদ্যদের বহু পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তারই আলোকে পরবর্তী পোষ্টে একটি একটি সাদামাটা উপসংহার টানব। যেটা পাঠকদের সচেতন করবে, সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হবে, রোগীরা অনর্থক কষ্ট থেকে বাঁচবে। জ্বীনদের আগ্রহ ও রুচি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে পারবে। আবার নিজেরাও এক একজন উপস্থিত চিকিৎসক হয়ে উঠতে পারবে।

জ্বীন-ভুতের আছর গ্রস্ত চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি কথা জানা খুবই জরুরী। ভূতের আছরে গ্রস্ত ব্যক্তির চিকিৎসায় কিছুটা নিষ্ঠুরতা অবলম্বন করা হয়। বৈদ্যরাও হয় কিছুটা অমানবিক। পত্র-পত্রিকায় এসব আমরা কদাচিৎ দেখতে পাই। তাছাড়া ভুতের চিকিৎসায় জ্বীন ছাড়ানো যায় না কিন্তু জ্বীনের চিকিৎসায় জ্বীন তো যায় আবার ভুতও চলে যায়। জ্বীন ঘটিত ব্যাপারে কিভাবে চিকিৎসা নেওয়া হবে, কোরআন হাদিসে সেটার বিস্তারিত পরামর্শ আছে। যার কারণে এই বিষয়টি এখানে অনেক সমৃদ্ধ। ভুতের চিকিৎসা করা হয় ধারণার উপর নির্ভর করে। যার কারণে এখানে ভুল চিকিৎসা হবার সম্ভাবনা তো থাকেই। আবার ধোঁকাবাজ চিকিৎসক হলে তো রোগীর জীবন মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে।


জ্বীন জীন জাতি
০ টি মন্তব্য      ১৪১৮ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: