অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৩৩ জন ভিজিটর

প্রতিবেশির সম্পর্কটা বড়ই অদ্ভুদ...

লিখেছেন Shahmun বুধবার ২৭ মার্চ ২০১৯

প্রায় সন্ধ্যা! পাশের বাড়ি থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে। কখনও চিৎকার করে বলছে, ‘কে আছেন, মোক বাঁচাও!’
সেই বাড়ির পাশেই ছিল একটা রাইস মিল। সেই রাইস মিলের মালিক কান্নাকাটির আওয়াজ সহ্য করতে না পেরে, সেই বাড়ির দিকে হাটা দিলেন।

গিয়ে দেখেন, এক উম্মাদ স্বামী তার বউকে ইচ্ছামত পেটাচ্ছে। রাইস মিলের মালিককে দেখে সেই পাসন্ড স্বামী অভ্যর্থনার হাসি দিয়ে বলল, ‘আরে মহাজন! আপনে আসছেন ক্যান, মোক ডাকলে ত মু-ই গেনু হয়!’
মহাজন বললেন, ‘তোর বউয়ের কান্দন শুনি কী আর বসি থাকা যায়! ডাঙ্গাওছিস ক্যান?’
আর কন না মহাজন! মুই বাড়িত না থাকলে ঐ অন্য ব্যাটা ছইলের সাথে হাসি হাসি কথা কয়। তোরায় কও, কার সহ্য হয়! এ কথা বলেই সে তার বউয়ের পিঠে আরও একটা কিল বসিয়ে দেয়।

মহাজন চোখ দুটো গরম করে রাগত স্বরে বললেন, ‘তুই যদি আর একটা ডাঙ্গ দেইস, তাইলে তোর হাত ভাঙ্গি দিম। বদমাইস, চোয়্যানি (বাঙলা মদ) খায়া আসি এলা বউয়ের উপর বাহাদুরি দেখাওছিস!‘

এ কথা শোনার সাথে যে বউ এতোক্ষণ হাউ মাউ করে কাঁদতেছিল, সে হঠাৎ কান্না থামিয়ে চঞ্চল হয়ে উঠল। সে মহাজনের পা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মহাজন, আইজ থাকি তোরা মোর আব্বা! আব্বা, মোক এই শয়তানটার হাত থাকি বাঁচাও!’
মহাজন বললেন, ‘হইছে পাও ছাড়েক। তোক আর ডাঙ্গাবানায়।’

এর পরের দিন মহাজন তার গদি করে বসে ইনকিলাব পত্রিকা পড়ছেন। সেসময় গতকালের মাইর খাওয়া সেই বধূ এসে বললেন, ‘আব্বা, মোর ভাত খাওয়ার চাউল নাই। মোক চাউল দ্যান!’
মহাজন বললেন, ‘চাউল নিবু নিয়া যা, কিন্তু মোক আব্বা কওছিস ক্যান?’
সেই বধূ বললেন, ‘তোরা মোর আব্বা! মোর ধর্ম বাপ!’

মহাজন বুঝতে পারলেন, তিনি বিরাট ফ্যাড়কায় পড়ে গেছেন। এখন এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার উপায় কী? উপায় একটা আছে। এই সমস্যার সমাধান একমাত্র তার ইমডিয়েট ছোট বোন করতে পারে। তার ছোট বোনের বাড়িও আবার ঠিক পাশেই।

অতঃপর সেই বধূকে সাথে নিয়ে মহাজন ছুটলেন বোনের বাড়ি। বোনের বাড়িতে গিয়ে বোনের কাছে বিচার দিয়ে বললেন, ‘দেখত মনোয়ারা, এই পাগলি কী শুরু করছে!’
মহাজন তার বোনকে সব ঘটনা খুলে বললেন। এবার বোন বুঝানো শুরু করলেন, ‘আমাদের ধর্মে এইসব ধর্ম বাপ জায়েজ নাই। তুই আর ভাইজানক আব্বা কয়া ডাকিস না।’
নাছোড় বান্দা বধূ বললেন, ‘মুই ধর্ম-কর্ম বোঝ না। মহাজন মোর আব্বা আর তোরা মোর ফুফু!’
অতঃপর ভাই, বোন দুজনেই সেই বধূ এবং তার পরিবারের সাথে অদ্ভুদ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লেন।

আর এই দুই বোকা মানুষদের একজন আমার বড় মামা আর অপরজন আমার আম্মা!

মামা আর আম্মা যে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে রেহাই পেয়েছিলেন, তা নয়! এরপর একদিন সেই বধূ আল্লাজর ফজরে এসে আমাদের রান্না ঘরের সামনে পা বিছিয়ে বসে পড়লেন আর বললেন, ‘ফুফু, মোক একখান গাই গরু কিনি দেওয়াই নাগবে! নাইলে মুই যাবানাও। এটে না খায়া মরি যাইম।’

এরপর আম্মা দুপুরবেলা ভাত খাওয়ার সময় আব্বাকে একটা গাই গরু কিনে দেওয়ার কথা বললেন! আম্মা মুখ ফুটে কিছু একটা চেয়েছেন, আর আব্বা না করেছেন এমন ঘটনা আজ অবধি ঘটে নাই।

এরপর...এরপর কেটে গেছে অনেক বেলা। সেই নববধূও আজ নেই, তার স্বামীও নেই। তারা মূলত সাওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। আমার আম্মা খুব নরম দিলের মানুষ! মহিলা ফকিররা এসে তাদের দুঃখ ভরা গল্পের ডালি খুলে বসতেন আর আম্মা তাদের দুঃখে দুঃখি হয়ে, কখনও চোখের পানি ফেলে গরম ভাই খাইয়ে আচল ভরে চাউল দিয়ে অতঃপর বিদায় করতেন। আর বড় মামা ঠিক তার উলটো!

অথচ তাদের মৃত্যুতে বড় মামাকেও চোখের পানি ফেলতে দেখেছিলাম। প্রতিবেশির সম্পর্ক বড় অদ্ভুদ! তাদের সাথে নেই কোনো রক্তের সম্পর্ক, নেই ধর্মের মিল; অথচ তাদের কথা স্মরণ করে আমিও আফসোস করছি! হায়, সেই দিনগুলো কতই না মধুর ছিল...


জীবন
০ টি মন্তব্য      ৪২৯ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: