অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৪২ জন ভিজিটর

নেদারল্যান্ডে হামলা এবং কিছু কথা...

লিখেছেন Muhammad Noman বুধবার ২০ মার্চ ২০১৯

১.
নেদারল্যান্ডের হত্যাকান্ডের কারণ সম্পর্কে সেদেশের পুলিশ এখনো স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। হত্যাকারী মুসলিম আর দাড়িওয়ালা হলেই যে তার কাজটি ইসলাম রিলেটেড হবে এমন কোন কথা নেই। এই ঘটনার পেছনে ব্যাক্তিগত বা পারিবারিক আক্রোশ থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেছে পুলিশ। তাই এটা নিয়ে চেঁচামেচি শুরু করার পূর্বে অপেক্ষা করা উচিত। যদি সেটা আসলেই ধর্মীয় কারণে এবং ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে ঘটে থাকে তাহলে সেটা চরম নিন্দনীয় কাজ। নিউজিল্যান্ডের ঘটনা আর নেদারল্যান্ডের ঘটনার মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে না। দু'টোই সমান অপরাধ। নিরাপরাধ মানুষের উপর প্রতিশোধ নেয়া ইসলাম সমর্থন করে না। ছেলে যদি হত্যা করে সে অপরাধে পিতাকে ফাঁসীতে ঝুলানো অনৈসলামী কাজই নয়, মানবতাবিরোধীও। "লা তাযিরু ওয়াযিরাতুন ওইযরা উখরা।" পাশাপাশি, এর দ্বারা উল্টো মুসলমানদেরই ক্ষতি হবে। নিউজিল্যান্ডের হত্যাকান্ডের কারণে সারা বিশ্বে মুসলমানদের প্রতি যে সহানুভূতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেটাও নষ্ট হবে। ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে যে আওয়াজ উঠেছে সেটা গতি হারাবে। ২২ তারীখ যে ওআইসির মিটিং হওয়ার সম্ভাবনা আছে সেটাও ক্ষতগ্রস্ত হবে। পশ্চিমের কট্টরপন্থী পপুলিষ্ট রাজনীতিকরা যে প্রচন্ড চাপ এবং সমালোচনার মুখে পড়েছিল সেখান থেকে বের হওয়ার একটা রাস্তা পেয়ে যাবে।

২.
ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার পর মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আশানুরুপ হয়নি। একমাত্র তুরষ্কের প্রতিক্রিয়া ছিল উল্লেখযোগ্য। ঘটনার পর এরদোয়ানের কঠোর ভাষায় নিন্দার পাশাপাশি তুরষ্কের ভাইস প্রেসিডেন্ড এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিউজিল্যান্ড সফর করেছে এবং আহত নিহতদের খোঁজ খবর নিয়েছে। সেদেশের সরকারের সাথে সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। এরদোয়ান নিজেও নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলেছেন। আগামী ২২ তারিখ ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের জরুরী মিটিং আহবান করেছেন। এই কাজগুলো খুব জরুরী ছিল। মুসলমানরা অভিবাবকহীন নয়; এই বার্তাটা পৌঁছানো মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোন মুসলিম দেশকে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে পশ্চিমারা যেরকম চাপের মধ্যে রাখে রাজনৈতিকভাবে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করা দরকার। সুযোগগুলো কাজে লাগানো দরকার। তারাও যে ধোয়া তুলসী পাতা নয় সেটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া দরকার। পাকিস্তান এবং সৌদি আরবও কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবুও আরো বাড়তি পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল। তুরষ্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের যৌথদল সফর করলে ওজনটা আরো বেশি বাড়তো। নিউজিল্যান্ডের কাছাকাছি দুটি বৃহৎ মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার দায়িত্ব অনেক বেশী ছিল। সেই তুলনায় তারা কিছুই করেনি। মাহাথিরের মালয়েশিয়ার দিকে মানুষ এখনো আশা নিয়ে তাকায়। ইরানের সবকিছু মিডিয়া-সর্বস্ব। খাঁটি শিয়া স্বর্থের বাইরে তারা কিছুই করে না। রোহিঙ্গা গণহত্যার মত একটি ইস্যুতে তারা চুপ থেকেছে চীনের কারণে। কাশ্মীরের নাম তারা ঘুমের ঘোরেও উচ্চারণ করে না ভারতের নাখোশ হওয়ার ভয়ে। তাই ইরান নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কিছু নেই। সিরিয়ায় তারা এর চেয়ে ১০০ গুণ বেশী মুসলমান হত্যা করেছে এবং করছে।

৩.
এ যুগে মুসলিম স্বার্থ নিয়ে বুক ফুলিয়ে কথা বলার মতো নেতার খুব অকাল চলছে। এক সময় সাদ্দাম, গাদ্দাফী, মাহাথির কথা বলতেন। এই খরার যুগে এরদোয়ান ছাড়া কারো কন্ঠস্বর শোনা যায় না। তাই যেকোন ঘটনাতে দোস্ত দুশমন সবার দৃষ্টি প্রথমেই যায় তাঁর দিকে। তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এর মূল্যও দিতে হচ্ছে তাঁকে এবং তাঁর দেশকে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক দিক দিয়ে তুরষ্ককে পঙ্গু করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চলছে। মধ্যপ্রচ্যের চোরাবালীতে পুঁতে ফেলার জন্য তারা উঠেপড়ে লেগেছে। প্রচন্ড মিডিয়া আক্রমনের মাধ্যমে গোটা দুনিয়া ব্যাপী এরদোয়ানকে বিতর্কিত এবং দন্তনখরহীন করার প্রয়াস চলছে। পাকিস্তান ছাড়া আর কোন মুসলিম দেশ তাদের পাশে দাঁড়াবে বলে মনে হচ্ছে না। ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সকল যোগ্যতা ইমরান খানের আছে। কিন্তু ইমরান সরকারের উচিত হবে তুর্কি-পাকিস্তান সম্পর্ককে স্ট্র্যাটেজিক দৃষ্টিতে দেখা। এরদোয়ান-নওয়াজ সম্পর্ক নিয়ে ইমরানের সংশয়ে ভোগাটা খুবই দুঃখজনক হবে। অবশ্য পাক সেনাবাহিনী বরাবরই তুর্কিপ্রেমিক। সেটা আশাব্যঞ্জক। তুরষ্কের জন্য কাতারের প্রচেষ্টা যদিও প্রশংসার যোগ্য, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে কাতার যথেষ্ট প্রভাবশালী রাষ্ট্র নয় এখনো।

মুসলিম স্বার্থ নিয়ে এরদোয়ানের বক্তব্যকে অনেকে রাজনৈতিক বক্তব্য বলে ঠাট্টা করতে চায়। এর কোন যুক্তি দেখি না। তুরষ্কে এখনো মদের লাইসেন্স কেন বাতিল হয়নি সেটার জন্য এরদোয়ানের সমালোচনা করা হয়। আবার মুসলিম স্বার্থ নিয়ে কিছু বললে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির পাঁয়তারা বলে অভিযোগ করা হয়। এগুলো স্রেফ ভন্ডামী এবং হাস্যকর হিপোক্রেসি। এই কথাগুলো এরদোয়ান না বললে তিনি কখনোই পশ্চিমাদের চক্ষুশুল হতেন না। এতো ঝামেলায়ও তাঁকে জড়াতে হতো না। তুরষ্ক আজ সংকটমুক্ত একটি দেশ হতো। ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেছিলেন: "তোমরা যদি হক্ব কোনটা সেটা জানতে চাও তাহলে শত্রুর নিক্ষিপ্ত তিরের টার্গেট কোনটা সেটা দেখো।"

তবে হ্যাঁ, এর দ্বারা আভ্যন্তরীনভাবে এরদোয়ানের রাজনৈতিক ফায়দা হয়। কারণ, একেপি সাংবিধানিকভাবে সেকুলার দল হলেও তাদেরকে তুর্কি জাতীয়তাবাদী ইসলামিস্ট মনে করা হয়। তাদের ভোটাররাও এই ঘরানার। তাই এধরণের সিম্প্যাথিক বক্তব্য দ্বারা একজন ইসলামিষ্ট এবং ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে রাজনৈতিকভাবে তিনি লাভবান হন। এটা দোষের কিছু না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তাঁর উদ্দেশ্যও রাজনৈতিক। যদি সবার ক্ষেত্রে এরকম বলা হয়ে থাকে তাহলে একসময় বলার মতো আর কেউ থাকবে না। সিসি, বিন যায়দ, বিন সালমান বলছেন না কেন এই প্রশ্নও করি, আবার এরদোয়ানের বলাটা রাজনৈতিক -- এই দাবীও করি। এই সংকীর্ণতা আমাদের জন্য কোন সুফল বয়ে আনবে না।

 

এরদোয়ানের প্রতিবাদ গর্জন আমার কাছে রহমত মনে হয়। এরদোয়ানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে আমার কোন সংশয় নেই। কিন্তু তার বক্তব্যের কিছু বিষয় একটু ভাবাচ্ছে। তাঁর কথার স্টাইল আরও একটু ডিপ্লোম্যাটিক হলে ভালো হতো। স্পষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য ওজন হারায়। ট্রাম্প আর ওবামার বক্তব্যের ওজনের দিকে তাকালে ব্যাপারটা বুঝে আসবে। পপুলিষ্ট নেতারা প্রায় সবাই এই কাজটা করে থাকে। এ ধরণের বক্তব্যের কারণে অনেক সময় উল্টো রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। উদাহণ স্বরুপ নিউজিল্যান্ডের ঘটনার কথা বলা যায়। তিনি কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিভিন্ন প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। সবই ঠিক আছে। কিন্তু হত্যাকারীর অস্ত্রের লিখনকে তাঁর গুরুত্ব দেয়া এবং সেটাকে বক্তব্যের মধ্যে উল্লেখ করে তার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলা যে, "এটা নিউজিল্যান্ড নয়, ইস্তাম্বুল, ইস্তাম্বুল কোন দিন কনস্টান্টিনোপল হবে না, বরং তোমাদের কবর হবে" -- এই কথাগুলো রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ হওয়া উচিত হয়নি। ফল এই হয়েছে যে, নিউজিল্যান্ডে রাজনৈতিক মহল সেটাকে নেতিবাচকভাবে নিয়েছে এবং ওই দেশের মিডিয়াতে সমালোচনা চলছে। এই কারণে ক্রাইস্টচার্চ ইস্যু নিয়ে তুরষ্কের নেয়া পদক্ষেপগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং তুর্কি প্রতিনিধিদলের সফরের ফলাফলেও তা প্রভাব ফেলবে।
.


হামলা
০ টি মন্তব্য      ৩১৯ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: