অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৪০ জন ভিজিটর

মাওলানা মওদূদী (রহ.)-এর হাদিস বর্জন ও মাওলানা মাদানীর সমালোচনার তাত্ত্বিক পর্যালোচনা...

লিখেছেন Aslam Sayedee বুধবার ২০ মার্চ ২০১৯

মাওলানা মতিউর রাহমান মাদানী যে বিষয়কে কেন্দ্র করে মাওলানা মওদূদী (রহ.)-কে পথভ্রষ্ট ও গোমরাহ বলছেন তা হচ্ছে তিনি সহিহ হাদিস বর্জন করেন। আর হাদিসটি হচ্ছে রাসূল (সা.) বলেছেন, ইব্ররাহীম (আ.) তিনবার মিথ্যা কথা বলেছেন। আর তা হচ্ছে, ১) তিনি নিজেকে অসুস্থ বলেছেন, ২) বড়ো মূর্তিকে জিজ্ঞেস করতে বলেছেন। ৩) বউকে বোন বলেছেন।
এই তিনটির মধ্যে প্রথম দুটি অন্যান্য আলিমদের মতো মাওলানা মওদূদীও বিভিন্ন ব্যাখ্যা করে বহাল রেখেছেন। কিন্তু বউকে বোন বানানো মাওলানা মওদূদীর চিন্তাধারায় সঠিক মনে হয়নি, তাই তিনি হাদিসকে বর্জন করেছেন। কিন্তু এই হাদিসকে বর্জন করার বেলায় তাঁর সাথে আর কোনো আলিমকে সাধারণত পাওয়া যায় না। সব আলিমরাই প্রথম দুটোর মতই তৃতীয়টিকেও ব্যাখ্যা করে হাদিসকে সঠিক স্থানে রেখেছেন,

ইমাম ফখরুদ্দিন রাযি বলেন, فَالْمُرَادُ أَنَّهَا أُخْتُهُ فِي الدِّينِ “বোন বলা দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে, সে তাঁর দীনী বোন। (মাফতিহুল গাইব, ২২/১৫৬) আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি বলেন,وَأما سارة فَهِيَ أُخْته بِالْإِسْلَامِ، وَاتفقَ الْفُقَهَاء على أَن الْكَذِب جَائِز “সারা হচ্ছেন তাঁর ইসলামের দৃষ্টিতে বোন। আর এধরণের মিথ্যা কথা সকল ফকিহদের ঐক্যমতে জায়েয। (উমদাতুল কারী, ১৫/২৪৮)। শাফেয়ী ফকিহ শামসুদ্দিন সুওয়াইরিও বলেন,أن العلماء اجمعوا على أن الكذب جائز (শরহে সহিহিল বুখারি, ১/৩২৭)। ইমাম ইবনু তাইমিয়া আরও সুন্দর সমাধান দিয়েছেন, তিনি বলেন, “রাসূল (সাঃ) বলেছন তিন স্থানে মিথ্যা কথা বলা জায়েয। ১) দুই মুসলিম ভাইয়ের মধ্যে বিরোধ মিমাংসায়, ২) স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে, ৩) যুদ্ধের ময়দানে। রাসূল (সাঃ) আরও বলেছেন, যুদ্ধ মানেই কৌশল। তাই ইব্রাহিম আ. এখানে কৌশল আবলম্বন করছেন।” তারপর ইবনু তাইমিয়া বলেন, এখান থেকেই ফকিহগণ দলিল গ্রহণ করেছেন যে, এমন পরিস্থিতিতে এ ধরণের কৌশল অবলম্বন করা (মিথ্যা বলা) জায়েয। (মাজমুউল ফতওয়া. ৮ম খÐ)

ইমাম ইবনু তাইমিয়ার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তিনি হাদিস বর্জন করা তো দূরে কথা বরং এ হাদিসকে কৌশল অবলম্বন করার পক্ষে দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। এখানে যেহেতু ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে হাদিসটি যথা স্থানে রাখা যাচ্ছে, অতএব এক্ষেত্রে আমরা মনে করি মাওলানা মওদূদীর চিন্তাধারায় এখানে পদস্খলন ঘটেছে। মাওলানা মওদূদী (রহ.) নিজেও বলেছেন, এ ধরণের হাদিস তখনই বর্জন করতে হয় যখন কোনো অবস্থায় এটাকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে ঠিক রাখা সম্ভব হয় না। (রাসায়েল ও মাসায়েল )
কিন্তু এখানে ঠিক রাখা সম্ভব হচ্ছে তাই বর্জন করার কোনো কারণ নেই। তাই মাওলানা মওদূদীর চিন্তা এখানে সঠিক স্থানে পৌছতে পারেনি বলে আমি মনে করি। আর ভুল তো ভুলই। এতে যে করুক আর যে পরিমানই করুক। নিজের পক্ষের লোক হলে তার ভুলকেও সঠিক বানানোর চিন্তায় মগ্ন হওয়াকে আমি দীনের কাজ মনে করি না।

এখন কথা হচ্ছে মাওলানা মওদূদী এটাকে বর্জন করার কারণে তিনি কি গোমরাহ আর হাদিস অস্বীকারকারী হয়ে গেলেন?
সনদ (রাবীর বর্ণনার ধারাবাহিকতা) সহীহ হওয়া সত্ত্বেও মতন বা হাদীসের মূল বক্তব্য যুক্তি বিরোধী হওয়ার কারণে এই হাদীস গ্রহণ করা হয়নি, সাহাবীদের যুগ থেকে আইম্মায়ে মুজতাহীদদের যুগ পর্যন্ত এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। গত পোষ্টে আমরা দুটো দৃষ্টান্ত দেখেছি।

সব মানুষের চিন্তাধারা সমান নয়, তাই এসব ক্ষেত্রে দুজন মুজতাহিদের মধ্যে মতবিরোধ হবেই, এটা স্বাভাবিক। এমন অনেক হাদিস খুজলে পাওয়া যাবে যে, অন্য ইমাম এটিকে বজর্ন করেছেন আবার মাওলানা মওদূদীসহ একদল এটিকে ব্যাখ্যা করে যথাস্থানে রেখেছেন। এগুলো একেবারেই স্বাভাবিক বিষয়। এর ফলে কেউ হাদিস অস্বীকারকারী হয়ে গোমরাহ হয়ে যায় না। ইমাম ইবনু তাইমিয়া বলেন, “আলিমদের মধ্যে মতবিরোধের অন্যতম একটা কারণ হচ্ছে, এক ইমামের মতে হাদিসটি ব্যাখ্যা করে ভিন্ন মত প্রকাশের অবকাশ রয়েছে। অথচ অন্য ইমাম এটাকে অন্য হাদিসের সাথে দ্বান্দ্বিক বলে মনে করেন না এবং হাদিসটিকে যথাস্থানে বহাল রাখেন, ফলে মতবিরোধ হয়ে থাকে।” (রাফউল মালাম-১৮)

আহলে হাদিসের শাইখেগণ শুধু “তাইমিয়া তাইমিয়া” বলে জিকির করে গলার রস শুকিয়ে ফেলেন। অথচ তাঁর মানহায ও বই পড়া থেকে কয়েক ক্রশ দূরে তাদের অবস্থান। তাঁর বই যদি মনোযোগ সহকারে পড়তেন তাহলে এসি রুমে বসে এমন মূর্খতাপূর্ণ লেকচার মেরে ফিতনা সৃষ্টি করতেন না।


মওদূদী
০ টি মন্তব্য      ৩০৮ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: