অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৪৬ জন ভিজিটর

কওমী মাদ্রাসা এবং কিছু না বলা কথা...

লিখেছেন Muhammad Noman বুধবার ২০ মার্চ ২০১৯

এসব বিষয়ে লেখি না। লেখার আগ্রহ পাই না। কওমী মাদরাসার যেকোন আভ্যন্তরীন ইস্যু থেকে সতর্কতার সাথে দূরে থাকি। সবাই আমাদের উস্তাদ, মুরুব্বী। ভার্চুয়াল জগতে তো বটেই, ব্যাক্তিগত জীবনেও এঁদের যেকোন ব্যাপার থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করি। উপরে থুথু ছিটালে নাকি নিজের গায়ে পড়ে। কিন্তু একটা বিষয় নজর কাড়লো। গতকাল দেখলাম ঢাকার একটি মাদরাসার কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের বই পাওয়ার অভিযোগে কিছু ছাত্রকে বহিষ্কার করেছে। তারপর থেকে ফেসবুকে বিভিন্ন ষ্ট্যাটাস এবং কমেন্টে প্রচুর গরম ফতওয়া চোখে পড়ছে। কেউ কেউ সেই মাদরাসার শিক্ষক--মুফতীদেরকে কাফিরদের দালাল বলছে। এসব দালাল থেকে আমরা কী শিখবো-- এমন প্রশ্নও তুলছে।

এই ব্যাপারটা দেখে আমার নিজের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। ১৯৯৯ এর দিকের ঘটনা। তখন চট্টগ্রামের একটি মাদরাসায় নিচের ক্লাসে পড়ি। আফগান জিহাদ তখন কওমীপাড়ায় বেশ উত্তাপ ছড়াচ্ছিল। বিস্তারিত বলবো না। চট্টগ্রাম শহরের একটি মাদরাসায় এ ধরণের একটি প্রোগ্রামে জেলার বিভিন্ন মাদরাসা থেকে ছাত্ররা যোগ দেয়। তখন আমাদের মাদরাসায় ক্লাস চলছিল। ক্লাস না করে মাদরাসার ১০০ জনেরও বেশী ছাত্র ওই প্রোগামে অংশগ্রহন করে। এদের প্রায় সবাই মাদরাসার প্রথম সারির ভালো ছাত্র ছিল। আমাদের মুহতারাম উস্তাদ, দেশের বরেণ্য আলেমে দ্বীন, মাদরাসার হযরত মুহতামিম সাহেব হুজুর ছাত্রদের লেখা পড়া ছাড়া আর কিছু বুঝতেন না। ছাত্রদের পড়াশোনার জন্য এতবড় দরদী আলেম আমি আর দেখিনি। তাঁর কথা হচ্ছে, ইয়াজদাহুম থেকে নিয়ে দাওরা পর্যন্ত ১২ বছর মাদরাসার দেয়ালের ভেতরেই তোমাদের জিহাদ। এখানেই তোমাদের তাবলিগ। সহীহ ইলম হাসিল করে নিজেকে পোক্ত আলেমে দ্বীন হিসেবে তৈরি করাই তোমাদের জিহাদ। এর বাইরে তোমাদেরকে দ্বীনের নাম দিয়ে যে যেদিকেই দাওয়াত দিক -- সবই শয়তানী। এজন্য তিনি কোন মাহফিলে মাদরাসার ছাত্রদের যাওয়া পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন-- ওয়াজ সাধারণ মানুষের জন্য। তোমাদের কাজ হচ্ছে পড়াশোনা করা। ওয়ায়েজ হিসেবে তৈরি হওয়া, ওয়াজ শুনা নয়। ছাত্রদের তাবলিগের চিল্লায় যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর একই মতামত ছিল। তিনি বলতেন, শুক্রবারটাও আমাদের দেওবন্দের মুরুব্বীরা ছুটি হিসেবে রাখেন নি; বরং বিগত এক সপ্তাহের পড়াটাকে মুযাকারা করার জন্য এই দিনটিকে রাখা হয়েছে। তাই তিনি শুক্রবারেও কোন ছাত্র কোথাও ওয়াজে গেছে শুনলে চরম রাগ করতেন। তাই যখন তিনি শুনলেন যে, তাঁর মাদরসার এতো বড়ো সংখ্যক ছাত্র ক্লাস না করে চিটাগাং গিয়ে প্রোগ্রাম করছে, তখন তাঁর রাগ কি পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে সেটা আন্দাজ করতে পারছেন নিশ্চয়। তিনি এমনিতেই ধবধবে ফর্সা মানুষ। রাগলে হযরতের চেহারা টকটকে লাল হয়ে উঠে। একরকম অগ্নিশর্মা হয়ে তিনি সাথে সাথে নির্দেশ দিলেন, এসব ছাত্রের নাম লিখে সবাইকে মাদরাসা থেকে বহিষ্কার করো। তিনি এমনিতে পড়ুয়া ছাত্রদের খুবই কদর করতেন। কিন্তু এই ঘটনায় বেশ ভালো ভালো ছাত্র জড়িত থাকলেও তিনি তাদের কোন পরোয়া করেন নি। নির্দেশও যথারীতি পালন করা হলো।

এর মধ্যে সেই বিপ্লবী ছাত্ররা খবর পেয়ে গেল। তারা পরদিন মাদরাসার পাশের এলাকার কিছু মসজিদে জড়ো হলো। তাদের নেতারা একের পর এক গরম বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন, সেটা রুশ-দখলকৃত কাবুল, কান্দাহারের কোন একটা এলাকা। তাদের কোন কোন নেতা হযরত মুহতামিম হুজুরকে সোজা কাফির পর্যন্ত ফতওয়া দিয়ে বসলো। কারণ, তিনি নাকি জিহাদ বিরোধী। জিহাদের বিরোধীতা করে তিনি মূলতঃ কোরআনের জিহাদ সংক্রান্ত আয়াতগুলোকে অস্বীকার করেছেন। আরো কতো কি! ইয়া আল্লাহ্, কী পরিমান জাহেলী উম্মাদনা এদের মধ্যে কাজ করেছিল! একজন বয়োবৃদ্ধ বরেণ্য আলেমে দ্বীনকে কাফির বলতে তাদের আত্মা একবারের জন্যও কাঁপেনি। নিজের উস্তাদকে মুরতাদ বলেছিল এরা জিহাদের নাম দিয়ে। ভাবতেও এখন গা শিউরে উঠে।

হযরত মুহতামিম সাহেব হুজুরের কানে এই কথা পৌঁছার পর তিনি কী পরিমান কষ্ট পেয়েছিলেন সেটা তিনি আর তাঁর রবই জানেন। এশা অথবা ফজরের নামাজের পর সকল ছাত্রকে মসজিদে বসালেন, সবার উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলার জন্য। তিনি দাঁড়িয়েছেন, আর তাঁর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছিল। তিনি আবারও বললেন -- "তোমাদের জন্য পড়াশোনাই জিহাদ। অন্য কিছু নয়। পড়াটা শেষ করো। তারপর একজন জিহাদে যাও, অন্যজন তাবলিগে যাও, অন্যজন দায়ী হও। আগে সবকিছুর রসদ জোগাড় করো। তারপর কাজে নামো।" সেদিনের তাঁর একটা কথা কথা এখনো মনে বাজে। তিনি বলেছেন -- "যারা এখন জিহাদের নামে তোমাদেরকে লক্ষ্যচ্যুত করছে, তোমাদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, মাদরাসার গন্ডি পার হওয়ার পর এদের কাউকেই দেখবে না যে, জিহাদে গেছে। সবাই দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তখন অবস্থা হবে - না ঘর কা, না ঘাট কা।"

ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেল। এখন পেছনে ফিরে দেখি, যারা হুজুরকে কাফের ফতওয়া দিয়েছিল তারা একটাও কোন দিন জিহাদের ধারে কাছেও যায় নি। অনেকে আরব রাষ্ট্রে এসে পেটের জিহাদে লিপ্ত। হুজুরের কথা একশো ভাগ সত্য প্রমানিত হলো। হযরত মুহতামিম হুজুর এমন একজন আলিম, দ্বীনের ব্যাপারে কেউ কোন দিন তাঁকে আপোষ করতে দেখেনি। তাঁর এবং তাঁর খান্দানের ঈমানী গায়রত বাংলাদেশের খুব কম আলেমের মধ্যে দেখা যায়। একটি রাজনৈতিক দলের সন্ত্রাসীরা একবার পাশের এলাকায় একটা শানে সাহাবা সম্মেলন হতে দিচ্ছিলো না। তারা রাইফেল আর রকেট লাঞ্চার নিয়ে মাঠের পাশে চক্কর দিচ্ছিল। আর ছাত্রদেরকে মাইক, মঞ্চ ইত্যাদি লাগাতে বাধা দিচ্ছিলো। হযরত মুহতামিম সাহেব হুজুর শোনার সাথে সাথে গেঞ্জি পড়েই দৌঁড় দিলেন এবং মাঠে গিয়ে সিংহের মতো হুংকার দিলেন -- "কোন শয়তানের বাচ্চা বাধা দিচ্ছিস সামনে আয়, আগে আমার বুকে গুলি কর। তারপর বাধা দিস।" তাঁর ঈমানী বলে বলীয়ান, এমন তেজোদ্দীপ্ত চেহারার সামনে সে দিন কোন একটি সন্ত্রাসীরও সাহস হয়নি সামনে আসার। যথারীতি মাহফিল হলো। তাঁর এধরণের ঈমানদীপ্ত ঘটনা আরও আছে। এমন একজন আলেমকে নরাধমরা মুরতাদ না বানিয়ে ছাড়েনি। যারা নিজের উস্তাদদের সাথে বেয়াদবী করে, তাদের গায়ে ট্যাগ দিয়ে জিহাদের বুলি কপচাইতে আসে, তারা আর কিছু না হোক, এক একটা বদ্ধ উম্মাদ আর পাপীষ্ঠ বেয়াদব, এতে কোন সন্দেহ নেই। এদের কাছ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেবো।

ঢাকার এই ঘটনার পর আমার বারবার আমাদের মাদরাসায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটা মনে পড়ছিল। ঢাকায় কী হয়েছিল আমি জানি না। সেই ঘটনার ব্যাপারেও কোন মন্তব্য করছি না। তবে, কোন আলেমে দ্বীন জিহাদের বিরোধীতা করেন -- এমন ভাবাটাও হাস্যকর। তাঁরা কেবল পদ্ধতীর বিরোধীতা করেন। সময়ের কাজ সঠিক সময়ে করতে বলেন। পড়াশোনার সময় কেবল পড়াশোনাই করতে বলেন। পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটায় এমন সব কাজ এবং চিন্তা থেকে দূরে থাকতে বলেন। তাঁরা আমাদের মুরু্বী। তাঁদের কথাই আমাদের জন্য উপকারী।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন -- "আমি ত্রিশ বছর আদব শিখেছি। বিশ বছর ইলম শিখেছি। তাঁরা (তাবেয়ীন, মুহাদ্দিসগন) ইলমের পূর্বে আদব শিখতেন।"

[গায়াতুন নিহায়া ফী তাবাকাতিল কুররা - ১/১৯৮]

আল্লাহ আমাদের সবাইকে বোঝার তাউফীক দান করুন। আমাদের সকল উস্তাদের উত্তোরত্তর সম্মান বৃদ্ধি করুন। তাঁদের সাথে আদব বজায় রাখার তাউফীক দান করুন। আমীন ইয়া রব।


কওমী মাদ্রাসা
০ টি মন্তব্য      ৪১৫ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: