অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ১৬ জন ভিজিটর

আব্দুল লতিফ ও মুসলিমদের রাজনৈতিক উত্থান

লিখেছেন আফগানী শনিবার ০৭ মার্চ ২০২০

বাঙালি মুসলিমরা ইংরেজ শাসনের শুরু থেকে তাদের মেনে নেয়নি। একের পর এক বিদ্রোহ করেছে। সর্বশেষ ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর এদেশের মুসলিমদের অনেকেই উপলব্ধি করেন সশস্ত্র আন্দোলন/ বিদ্রোহ করে ইংরেজ দুঃশাসন ঠেকানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই মুসলিমদের বাঁচতে হলে এখন রাজনৈতিক আন্দোলন করা জরুরী। এমন ধারণা থেকে সিপাহী বিদ্রোহের ছয় বছর পর ১৮৬৩ সালের ২ এপ্রিল নওয়াব আব্দুল লতিফ কোলকাতায় প্রতিষ্ঠা করলেন ‘মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি’। সশস্ত্র সংগ্রামোত্তর মুসলিম জাতীয় জীবনে এ ধরনের সংস্থা, সমিতি গঠন এই প্রথম। সমিতির প্রথম  বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় কোলকাতার নওয়াব আব্দুল লতিফের ১৬নং তালতলা লেনস্থ বাড়িতে ২রা এপ্রিল তারিখে।

 

নওয়াব আব্দুল লতিফ উনিশ শতকের বাংলার মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত ও সমাজসেবক। জন্ম ১৮২৮ সালে ফরিদপুর জেলার রাজাপুর গ্রামে। তাঁর পিতা ফকির মাহমুদ ছিলেন কলকাতার সদর দেওয়ানী আদালতের আইনজীবী। আবদুল লতিফ কলকাতা মাদ্রাসা থেকে আরবি, ফারসি ও ইংরেজি ভাষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন।

 

আবদুল লতিফ ১৮৪৬ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল এর শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৮৪৮ সালে তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় আরবি ও ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১৮৪৯ সালে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ১৮৭৭ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট পদে উন্নীত হন।

 

আবদুল লতিফ সাতক্ষীরায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত অবস্থায় সেখানকার কৃষকদের ওপর ইংরেজ নীলকরদের নির্যাতন ও শোষণ প্রত্যক্ষ করেন। তিনি সেখানকার ঐক্যবদ্ধ হতে এবং তাদের অভিযোগের কথা সরকারকে অবহিত করতে উৎসাহ দেন। তিনি নিজেও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেন। অবশেষে তাঁর উদ্যোগেই নীলকরদের অত্যাচার বন্ধ করার লক্ষ্যে ১৮৬০ সালে ইংরেজ সরকার নীল কমিশন গঠন করে।

 

১৮৬২ সালে লর্ড ক্যানিং-এর শাসনামলে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভা গঠিত হলে আবদুল লতিফ এ সভার সদস্য মনোনীত হন। ১৮৬৩ সালে আবদুল লতিফ সিভিল ও মিলিটারি সার্ভিস সমূহের পরীক্ষক বোর্ডের সদস্য এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নিযুক্ত হন। ১৮৬৫ সালে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন গঠিত হলে তিনি এর ‘জাস্টিস অব দি পিস’ নিযুক্ত হন এবং ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত উক্ত পদে বহাল থাকেন। ১৮৬৫ সালে ভারতীয় ব্যবস্থাপক পরিষদে আনীত একটি প্রস্তাবে মুসলিম সমাজে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিলে আবদুল লতিফ একটি স্মারকলিপির মাধ্যমে ইংরেজ সরকারকে এ বিল সংশোধনের পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন।

 

বাংলার মুসলিমদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে আবদুল লতিফের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রথম উপলব্ধি করেন যে, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে ব্যর্থ হচ্ছে মুসলিমরা। ইংরেজি শিক্ষা বর্জন এবং সরকারের সঙ্গে অসহযোগ নীতির কারণে মুসলমান জাতি সবক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। তিনি মুসলিমদের শিক্ষা ও বৈষয়িক উন্নতিকল্পে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। 

প্রথমত, ব্রিটিশদের নতুন শাসন পদ্ধতির সুফল ভোগ করার জন্য মুসলিমদেরকে প্রস্তুত করা। 

দ্বিতীয়ত, উপনিবেশিক সরকারের প্রতি তাদের মধ্যে আনুগত্যের ভাব সৃষ্টি করা এবং এভাবে মুসলিমদের প্রতি ইংরেজদের সন্দেহ ও অবিশ্বাস দূর করা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শিক্ষিত মুসলিমগণ সরকারের উদ্দেশ্য, শক্তি ও কৌশল বুঝতে পারলে তাদের মধ্যে উপনিবেশিক সরকারের প্রতি আনুগত্যের মনোভাব সৃষ্টি হবে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি, শাসক শ্রেণির সঙ্গে যে কোনো ধরনের সংঘর্ষ পরিহার করার পক্ষপাতি ছিলেন।

 

১৮৫৩ সালে ‘কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার’ সমস্যাদি তদন্তের জন্য সরকার এফ. হেলিডের সভাপতিত্বে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। আবদুল লতিফ এ তদন্ত কমিটি ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট মাদ্রাসার উন্নতির জন্য দাবি জানান। তার সক্রিয় প্রচেষ্টায় ১৮৫৪ সালে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ইংরেজি ও ফারসি বিভাগ খোলা হয় এবং উর্দু ও বাংলা শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আবদুল লতিফ বরাবরই সরকারের নিকট মুসলিমদের জন্য ইংরেজি উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ফলে ১৮৫৪ সালে হিন্দু কলেজ প্রেসিডেন্সি কলেজে রূপান্তরিত করে সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রদেরকে এ কলেজে পড়ার সুযোগ দেয়া হয়।

 

ব্রিটিশ সরকার সন্দেহ করে যে, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা জড়িত ছিল। এ কারণে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার এফ. হেলিডে মাদ্রাসাটিকে একেবারে বন্ধ করে দেয়ার জন্য সুপারিশ করেন। ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ সরকার আরও একবার কলকাতা মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়ার প্রস্তাব করে। কিন্তু আবদুল লতিফের তৎপরতায় দুবারই মাদ্রাসাটি রক্ষা পায়। ১৮৭১ সালে মাদ্রাসার কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত হলে আবদুল লতিফ এর অবৈতনিক সচিব নির্বাচিত হন।

 

আবদুল লতিফ হুগলি কলেজ ও স্কুলে মুসলিম ছাত্রদের সুযোগ সুবিধা প্রদানের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মোহসিন ফান্ডের টাকায় এ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রতিষ্ঠানটি কার্যত হিন্দু ছাত্রদের প্রতিষ্ঠানেই পরিণত হয়েছিল। এ সময়ে এ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মুসলিমদের জন্য একটি মাদ্রাসা চালু থাকলেও এর ব্যবস্থাপনায় অনেক অনিয়ম চলছিল। ছোটলাট জে.পি. গ্রান্ট-এর নির্দেশে আবদুল লতিফ মাদ্রাসা সম্পর্কে বিচার বিশ্লেষণ করে ১৮৬১ সালে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। মূলত এটি ছিল হুগলি মাদ্রাসা সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন। এর ওপর ভিত্তি করেই হুগলি মাদ্রাসায় ঈঙ্গ-ফারসি বিভাগ খোলা হয় এবং ছাত্রদের জন্য বৃত্তি প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়। ইতোমধ্যে আবদুল লতিফ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দাবি জানান যে, দাতার ইচ্ছানুযায়ী মোহসিন ফান্ডের টাকা কেবল মুসলিমদের জন্য ব্যয় করা হোক। তিনি এ ব্যাপারে দীর্ঘদিন প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। অবশেষে ১৮৭৩ সালে হুগলি কলেজ  একটি  সরকারি কলেজে রূপান্তরিত হয় এবং মোহসিন ফান্ডের টাকা শুধু মুসলিমদের শিক্ষার জন্য ব্যয় করার ব্যবস্থা করা হয়।

 

আবদুল লতিফের প্রচেষ্টায় ১৮৭৪ সালে মুসলিম ছাত্রদের শিক্ষার জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে মাদ্রাসা স্থাপিত হয়। তিনি দরিদ্র ও মেধাবী মুসলিম ছাত্রদের পড়াশুনার জন্য নানাভাবে প্রচেষ্টা চালান এবং বিত্তশালী মুসলিমদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে একটি তহবিল সৃষ্টি করেন। বাংলার মুসলিমদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে মুসলিমদের প্রভাব বিস্তার এবং পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে ১৮৬৩ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতায় ‘মুসলিম সাহিত্য সমিতি’ (Mohammedan Literary Society of  Calcutta) গঠন ছিল আবদুল লতিফের জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা। তিনি মুসলিমদের মধ্যে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ও সমকালীন চিন্তা ধারার অনুকূলে জনমত এবং শিক্ষিত মুসলিম, হিন্দু ও ইংরেজদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতির মনোভাব গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ সমিতি গঠন করেন। এটি ছিল ভারতে মুসলিমদের সর্বপ্রথম সমিতি। এই সমিতির কর্মতৎপরতার মাধ্যমেই ভারতে মুসলিমগণ প্রথম স্বনামে একটি সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা চালাতে শুরু করে। তাছাড়াও এর মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে সভা, বক্তৃতা ও আলোচনা সভার আয়োজন করে মুসলিমদেরকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট করে তোলা হতে থাকে।

 

মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটির ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন মহীশূরের প্রিন্স মুহম্মদ রহিমুদ্দীন এবং সহ-সভাপতি ছিলেন অযোধ্যার প্রিন্স মির্জা জাহান কাদের বাহাদুর ও মহীশূরের প্রিন্স মুহম্মদ নাসিরুদ্দীন হায়দার। কমিটির মোট ১২ জন সদস্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন অযোধ্যার প্রিন্স মির্জা আসমান জাহ বাহাদুর ও প্রিন্স মুহম্মদ জাহ আলী বাহাদুর এবং মহীশূরের প্রিন্স মুহম্মদ হরমুজ শাহ ও প্রিন্স মুহম্মদ বখতিয়ার শাহ। বাংলার ছোটলাটকে সোসাইটির পৃষ্ঠপোষক করা হয়েছিল। সমগ্র ভারতবর্ষের পাঁচ শতেরও বেশি মুসলমান সোসাইটির সাধারণ সদস্যভুক্ত ছিল। সোসাইটির মাসিক সভার কার্যক্রম উর্দু, ফারসি, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত হতো।

 

আবদুল লতিফ এর ভাষায় ‘মুসলমানদের ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং সামাজিক আচরণ ও আদান-প্রদানে শিক্ষিত হিন্দু ও ইংরেজদের সমকক্ষ করে তোলাই ছিল সোসাইটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্যে তিনি বিজ্ঞান, কলা ও চলমান সমস্যা সংক্রান্ত এবং মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের উপায় উদ্ভাবনের জন্য আলোচনা সভার আয়োজন করেন। সোসাইটি মুসলমানদের ক্ষয়িষ্ণু আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তন ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার দ্বারা সমাজ উন্নয়নের নতুন ধারার প্রবর্তনা এবং এভাবে শাসক ও শাসিতের মধ্যে এক নির্ভরশীল সেতু স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। মুসলমানদের এই ধরনের সর্বপ্রথম সংগঠন হিসেবে মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি কালক্রমে মুসলমানদের প্রভূত কল্যাণ সাধন করে।

 

মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটির প্রথম সভা কলকাতার ১৬নং তালতলায় অনুষ্ঠিত হয়। মৌলভী মুহম্মদ ওয়াজির এ সভায় সভাপতিত্ব করেন। বিভিন্ন বিষয় ও সমস্যা সম্পর্কে মতবিনিময়ই ছিল এ ধরনের নিয়মিত সভার প্রধান বৈশিষ্ট্য। বছরে একবার কলকাতা টাউন হলে সোসাইটির সদস্যদের পান্ডিত্যপূর্ণ সান্ধ্য আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হতো। কলকাতা শহরের দেশী-বিদেশী প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক ও জ্ঞানী-গুণীরা এই অনুষ্ঠানে আকর্ষণীয় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রদর্শন করতেন। ১৮৬৫ সালে কলকাতা টাউন হলে সোসাইটির এক জনাকীর্ণ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলার ছোটলাট এই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন। মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান ও ইহুদীদের মধ্য থেকে প্রায় দুই হাজার প্রতিনিধি এই সমাবেশে অংশ গ্রহণ করেন। মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি এভাবে প্রখ্যাত পন্ডিত ও জ্ঞানী-গুণীদের মিলন কেন্দ্রে পরিণত হয়। মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটির বিভিন্ন সভায় ইন্দোরের মহারাজা, ভূপালের বেগম এবং জয়পুর, পাতিয়ালা ও কুচবিহারের রাজারা সম্মানিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।

 

মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি বিরাট এক দুঃসময়ে মুসলিম জাতি-স্বার্থকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে। ভারতীয় স্বার্থের সাইনবোর্ডে হিন্দুরা যখন সব অধিকার একাই কুক্ষিগত করছিল, তখন মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি প্রথমবারের মতো মুসলিম স্বার্থের প্রয়োজন আলাদাভাবে তুলে ধরে। মোহসীন ফান্ডের টাকা লুটেপুটে খাওয়া হচ্ছিল। যাদের জন্যে এই টাকা এবং যাদের জন্যে এটা বেশি প্রয়োজন, সেই মুসলমানরা মোহসীন ফান্ডের টাকা পাচ্ছিল না। নওয়াব আব্দুল লতিফ তাঁর অক্লান্ত চেষ্টা দ্বারা বাংলার গভর্নর স্যার ক্যাম্পবলকে বুঝাতে সক্ষম হলেন যে, মোহসীন ফান্ডের টাকা দাতার ইচ্ছানুযায়ী ব্যবহৃত হচ্ছে না। ফলস্বরূপ বাংলার বৃটিশ প্রশাসন ১৮৭৩ সালের ২৯ জুলাই গৃহীত এক প্রস্তাব অনুসারে মোহসীন ফান্ডের টাকা শুধু মুসলমানদের জন্যে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তখন থেকে হুগলী কলেজ সরকারি হয়ে গেল এবং মোহসীন ফান্ডের টাকা মুসলমানদের শিক্ষার কাজে নিয়োজিত হয়। এই টাকায় হুগলী ও কোলকাতা মাদরাসার উন্নতি, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে মাদরাসা স্থাপন এবং মুসলিম ছাত্রদের জন্যে বৃত্তির ব্যবস্থা করা হলো। সরকার ৯টি জিলা স্কুলে আরবী ও ফার্সির শিক্ষক রাখার নির্দেশ দিলেন। এত বড় কাজ সম্ভব হয়েছিল বৃটিশ প্রশাসনের সাথে নওয়াব আব্দুল লতিফের সুসম্পর্কের ফলেই। উল্লেখ্য, মোহামেডান লিটারারি সোসাইটির দ্বিতীয় আলোচনা সভাতেই নওয়াব আব্দুল লতিফ গভর্নর জেনারেল স্যার লরেন্সকে প্রধান অতিথি করে আনতে সমর্থ হন। এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৬৬ সালের ৬ মার্চ।

 

মোহামেডান লিটারারি সোসাইটির মাধ্যমে নওয়াব আব্দুল লতিফের চেষ্টায় জাতি হিসেবে মুসলমানরা ঊনিশ শতকের সত্তরের দশকেই আরও কিছু সুবিধা অর্জনে সমর্থ হলো। ১৮৭১ সালের ৭ আগস্ট ভারতের বৃটিশ সরকার প্রাদেশিক সরকারগুলোকে নির্দেশ দিল যে, 

(ক) সকল সরকারি বিদ্যালয় ও কলেজে মুসলমানদের ধর্মীয় ও মাতৃভাষা শিখবার উৎসাহ দিতে হবে, 

(খ) মুসলিম অধ্যুষিত জিলাসমূহে স্থাপিত ইংরেজি বিদ্যালয়গুলোতে অধিকতর যোগ্য মুসলমান ইংরেজি শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে, 

(গ) নিজেদের মাতৃভাষা শিক্ষায় বিদ্যালয় ও ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য মুসলমানদের অধিকতর অর্থ সাহায্য দিতে হবে, 

(ঘ) নিজেদের মাতৃভাষায় সাহিত্য রচনার জন্যে মুসলমানদের অধিকতর উৎসাহ দিতে হবে।’

 

আজকের বিচারে এই পাওয়াগুলো হয়তো খুব বড় নয় কিংবা এর অন্য রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও হতে পারে। যখন বৃষ্টিশ শাসন বিদ্রোহী জাতি মুসলমানদের পিষে ফেলতে ব্যস্ত এবং হিন্দুরা যখন জাতি হিসেবে মুসলমানদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব মুছে ফেলতে মরিয়া, তখনকার সেই ঘোর অমানিশার দিনগুলোতে জাতি হিসেবে মুসলমানদের এই আলাদা প্রাপ্তি মোটেই ছোট ঘটনা ছিল না। এই সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে অন্তত শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানদের আলাদা জাতীয় স্বীকৃতি ও স্বার্থ চিহ্নিত হয়েছিল। মুসলিম জাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য লিটারেরি সোসাইটি ছিলো প্রথম কার্যকর ধাপ। 


০ টি মন্তব্য      ১৬৭৫ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: