অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৯ জন ভিজিটর

দরবেশের কারামত ও জ্বীনের আলামত - এ পিকুলিয়ার ম্যান

লিখেছেন Nazrul Islam Tipu সোমবার ১৮ মার্চ ২০১৯

একবার এক জন প্রতিনিধির** বাড়ির পাশ দিয়ে একাকী যাচ্ছিলাম। বাড়ির ভিতর থেকে মহিলা কণ্ঠে কেউ যেন আমার নাম ধরে ডাকছিলেন। এটি এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বাড়ী হলেও এ বাড়ীতে আমি কোনদিন যাইনি আর আমাকে চিনেন এমন কেউ সে বাড়ীতে থাকে বলে মনে হল না। ভুল শুনছি মনে করে আমার পথে পা বাড়ালাম। আবারো আমার নাম। ভাল করে শুনতে চেষ্টা করলাম। না এবার আমার বাবার নামও বলছে। ভাবলাম আমার মুরুব্বী শ্রেণীর কেউ হয়ত ওখানে বেড়াতে গিয়েছে, তিনি আমায় ঢাকছেন। তাই বাড়ীটির সদর দরজার দিকে পা বাড়ালাম।

তাদের উঠানে বেশ কিছু মানুষের জটলা। কিছু মানুষের আমি চেহারা চিনি, তাদেরকে হাটে-বাজারে দেখি আর আমার মত কিশোরকে তাদের চেনার কথা নয়। একজন প্রশ্ন করল কাকে চাই? আমার নাম ধরে কেউ ডেকেছে সে ঘটনা জানালাম। সবাই আমার দিকে বিস্ময় দৃষ্টিতে চাওয়া শুরু করল। কি ব্যাপার? জানতে চাইলে তাদের একজন জানাল, তাদের চাচীমা'কে জ্বীনে ধরেছে, ডাক্তার এসেছে। তিনি কিছুক্ষণ আগে কারো নাম ধরে ডাকছিলেন। আমরা ভাবছি মাথা খারাপ হয়েছে, তাই আবোল তাবোল বকছে। তাহলে চাচীমা যে কারো নাম ধরে ডাকলেন, সেই তুমি বাড়ির বাহিরে ছিলে! এই ঘটনায় আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। তবে এই ঘটনায় আরো ছোট কালের একটি ঘটনা আমার মাথায় বিদ্যুতের মত চমক খেলে গেল।

শিশুকালে আমার পিতা চট্টগ্রামের এক বিরাট দরবেশ, অনেকের কাছে আল্লাহর ওলী; তাঁর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। ঐ এলাকাতে আমার বাবার নানার বাড়ি হবার সুবাদে এই মহান দরবেশের সাথে কিশোর বয়সে আমার বাবার সাথে খেলাধুলা করেছেন। ওনি ছিলেন ভাবলেশহীন। একমনে একটি চেয়ারে বসে থাকতেন, কারো সাথে তেমন একটা কথা বলতেন না। এক নাগাড়ে সিগারেট টানতেন। নামাজ পড়তে দেখা যেত না। কিছু চাইতেন না, দিলেও নিতেন না। সারা দেশে তাঁর লাখো অনুসারী রয়েছে। বাবা ওখানে পৌছার আগেই, দেওয়ালের আড়ালে থাকাবস্থায়, এই দরবেশ বাবার নাম ধরে চিল্লাচ্ছিলেন। এমনকি তিনি তার ছেলেকে নিয়ে তার কাছে এসেছেন সেটাও বলছিলেন! বাবা কাছে যাবার পরে বললেন, যা, যা! তোর সাথে কোন কথা নাই।

বাবা হাসলেন, আমরা জেয়ারত করে চলে আসি। শিশু বয়সের এই ঘটনা আমার জীবনে রেখাপাত করেছিল। একদা বাবাকে জিজ্ঞাসিলাম, কত বছরের ব্যবধানে ওই দরবেশের সাথে আপনার দেখা হয়? তিনি জানালেন কমপক্ষে চল্লিশ বছর। অত্যাশ্চর্য এই ঘটনা আজীবন মনে রেখেছিলাম। কিন্তু জনপ্রতিনিধির স্ত্রী তো আর আল্লাহর ওলী নন! তিনি কিভাবে প্রায় একই ধরনের এই কাণ্ড ঘটালেন! ঘটনাটি আমাকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছিল। কেননা হলে দুটোই জ্বীনের কাণ্ড হবে নতুবা দুটোই কেরামতি হতে হবে। একজনকে অখ্যাত ভাবে মরতে দেখেছি অন্যজনকে ওলিকুল শিরোমণি উপাধি নিয়ে ভক্তকুলের সম্মানে অভিষিক্ত হতে দেখেছি।

সুপ্রিয় পাঠক, সেই মহান দরবেশের নাম উল্লেখ করতে পারব না। সম্মানিত মানুষদের নামে বিভ্রান্তি ছড়ানো আমার লক্ষ্য নয়। আমি এখানে যা উপস্থাপন করছি তা দৃশ্যত মূল্যহীন উপাদান। কিন্তু কথার যোগসূত্র সৃষ্টি হওয়াতে উল্লেখ করা হল মাত্র। এই কথাটি বলার মূল উদ্দেশ্য হল, সাধারণ মানুষ যদি এই ব্যাপার গুলো নিজের চোখে ঘটতে দেখে তাহলে সে কিভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিবে? মানুষ জ্বীনের কারসাজী আর অলৌকিক-কারামত এ দুটো জিনিষকে কিভাবে শ্রেণীবিন্যাস করবে? যে দেশের মানুষ মাত্রই, শ্রেষ্ঠ বিবেচনার মানব সন্তান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অলৌকিক ঘটনাকে প্রাধান্য দেয়! যদিও ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসেও অলৌকিকত্বের প্রাধান্যের কোনই গুরুত্ব নাই।

লোকমুখে এক দরবেশের ঘটনা আছে যে, তিনি বদনা মেরেছেন চট্টগ্রাম থেকে আর সেটা গিয়ে পড়েছে মক্কায় মসজিদে হারামের কাছের এক কুত্তার গায়ে। বদনা মারার সময় কে হাজির ছিল আর বেচারা কুত্তাকে কে পাহারা দিচ্ছিল সেটার কোন হদিস নাই! অথচ অনুসারীরা আদাজল খেয়ে এটা প্রচারে মত্ত থাকে। যার নামে বলা হয়, তিনি আদৌ বলেছিলেন কিনা সেটার ও কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নাই। কথা হল, জ্বীনের পক্ষে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় জিনিষ নিয়ে যাওয়া সম্ভব। পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে ভিন্ন মৌসুমের ফলাদি আনা সম্ভব। এমনকি নিজেদের ঘরের জিনিষ চুরি হয়ে অন্য কারো কাছে চলেও যেতে পারে। এসব শুনতে তাজ্জব লাগলেও, বাস্তবে অগণিত ঘটনা রয়েছে। তাইতো রাসুল (সা) বলেছেন, কিছু বন্ধ করতে (ঘর, সিন্দুক) বিসমিল্লাহ বলো, তাহলে তা ফেরেশতা দিয়ে পাহারার ব্যবস্থা করা হবে। খাদ্য উন্মুক্ত রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। ঢাকনা দাও, ঢাকনার অভাবে প্রয়োজনে বিসমিল্লাহ বলে একটি শলাকা হলেও বসিয়ে রেখ। তাহলে তা নিরাপদ থাকবে। নতুবা জ্বীন-শয়তান এসব থেকে খাবে এবং নিয়েও যাবে। প্রশ্ন হল, যারা সর্বদা অলৌকিকত্বকে সেরা মানুষ হবার মানদণ্ড বানায়, তারা জ্বীনদের এসব কাজকেও অলৌকিক মনে করে তাদেরই পূজা করা শুরু করবে।

মুন্সী বাচা মিয়া ওরফে বোচা বৈদ্য। জ্বীন ভুত তাড়ানোতে সিদ্ধ হস্ত। নিজের সন্তানাদি জন্মের পর বাঁচেনা বিধায় তিনি এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। অগত্যা জন-প্রতিনিধির অনুরোধ, কান্নাকাটি ও পীড়াপীড়ির জন্য তাঁকে শেষবারের মত অগত্যা আবারো বৈদ্যের বোঁচকা হাতে নিতে হয়েছে। তিনি এই মহিলাকে সুস্থ করে তুলেছেন। সচরাচর একটা কথা আছে, যারা বৈদ্য, তাদের সন্তানাদি বেশীদিন টিকে না। অর্থাৎ জ্বীনেরা কোন অজুহাতে মেরে ফেলে। সংসারে অশান্তি লেগে থাকে। সন্তান দিয়ে বৈদ্যরা গর্ববোধ করতে পারেন না। শুধু তাই নয়, জ্বীনের এসব বৈদ্যদের উপরেও ক্ষেপে থাকে, সুবিধা-মত পেলে তাদেরও দফা-রফা করে ছাড়ে।

আমাদের গ্রামে দুই সুন্দরী ভাবী প্রতিনিয়ত জ্বীনের দ্বারা আক্রান্ত হতেন। একজন বৈশাখে হলে, অন্যজন জ্যৈষ্ঠে; এভাবে আষাঢ়, শ্রাবণ, কার্তিক কোন মাসই বাকি থাকত না। তাদের কথায় পড়ে আসব। বৈদ্য আনার দায়িত্ব কোন না কোন ভাবেই আমার উপরে চলে আসত। রাত-বিড়াতে বৈদ্যরা একাকী ফিরে যেতে ভয় পেত।তাই তাদের শর্ত থাকত কমপক্ষে দুই জন মানুষ দিয়ে হলেও গভীর রাত্রে তাদের বাড়ীতে পৌছাতে হবে। নিশি রাতে বৈদ্যদের বাড়ী পৌছিয়ে; খাল-বিল, নদী-নালা পাড়ি দিয়ে শেষ রাতে নিজের ঘরে ফিরে এসেছি। এভাবে নিঝুম রাতের, গভীর নিস্তব্ধতার সাথে পরিচিত হয়েছি বারে বারে, ধীরে ধীরে।

**(তিনি আত্মসম্মানী মানুষ, এখন বৃদ্ধ, তাই পদবী লিখলাম না, এলাকার মানুষ তাঁকে চিনে ফেলবে)


জ্বীন দরবেশ
০ টি মন্তব্য      ৫৯৩ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: