অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২২ জন ভিজিটর

সহীহ কুফুরী আকিদা: নবীগণ মিথ্যুক, মিথ্যাবাদী হতে পারে কিন্তু বুখারী মুসলিমের কোন রাবীর ভুল হতে পারে না!

লিখেছেন জিবরান সোমবার ১৮ মার্চ ২০১৯

আল্লামা মওদুদী (রাহঃ) বিরোধীতা করতে গিয়ে একশ্রেণীর বিপদগামী আলেম মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ) কে মিথ্যুক, মিথ্যাবাদী প্রমাণ করার অপচেষ্টা করে আসছে। বর্তমানে নব্য আহলে হাদীসগণ সেই কুফুরী মতবাদকে সহীহ বুখারীর লেভেল লাগিয়ে খুব জোড়ে সোড়ে প্রচার করছে মওদুদী (রাহঃ) গোমড়া! কারণ তিনি তাঁর তাফসীরে "নবী মিথ্যুক" হওয়ার বুখারীর হাদীস গ্রহণ করেন নি। আর তাদের সহীহ কুফুরী আকিদা হলো নবীগণ মিথ্যুক, মিথ্যাবাদী হতে পারে কিন্তু বুখারী মুসলিমের কোন রাবীর ভুল হতে পারে না। (নাউযুবিল্লাহ)
.
আল্লাহ তা'আলা কুরআনুল কারীমে বর্ণনা করেন,
قَالُوا أَأَنْتَ فَعَلْتَ هَٰذَا بِآلِهَتِنَا يَا إِبْرَاهِيمُ. قَالَ بَلْ فَعَلَهُ كَبِيرُهُمْ هَٰذَا فَاسْأَلُوهُمْ إِنْ كَانُوا يَنْطِقُون. فَرَجَعُوا إِلَىٰ أَنْفُسِهِمْ فَقَالُوا إِنَّكُمْ أَنْتُمُ الظَّالِمُون. ثُمَّ نُكِسُوا عَلَىٰ رُءُوسِهِمْ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا هَٰؤُلَاءِ يَنْطِقُونَ. قَالَ أَفَتَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكُمْ شَيْئًا وَلَا يَضُرُّكُمْ.
"তারা (মুশরিকরা) বলল, ‘হে ইবরাহীম, তুমিই কি আমাদের দেবদেবীগুলোর সাথে এরূপ করেছ’? সে বলল, ‘বরং তাদের এ বড়টিই একাজ করেছে। তাই এদেরকেই জিজ্ঞাসা কর, যদি এরা কথা বলতে পারে’। তখন তারা মনে মনে চিন্তা করল এবং একে অন্যকে বলতে লাগল, ‘তোমরাই তো জালিম’।
অতঃপর তাদের মাথা অবনত হয়ে গেল এবং বলল, ‘তুমি তো জানই যে, এরা কথা বলতে পারে না’। সে (ইবরাহীম) বলল, ‘তাহলে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর ইবাদাত কর, যা তোমাদের কোন উপকার করতে পারে না এবং কোন ক্ষতিও করতে পারে না?" (সূরা আম্বিয়াঃ২১/৬২-৬৬)
.
এ আয়াতগুলোর তাফসীর করতে গিয়ে এক পর্যায়ে আল্লামা মওদুদী (রাহঃ) বলেন, "হযরত ইবরাহীম মূর্তি ভাঙ্গার দায় যে বড় মূর্তিটির ঘাড়ে চাপিয়েছেন, তার দ্বারা মিথ্যা বলা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তিনি নিজের বিরোধীদেরকে প্রমাণ দর্শাতে চাচ্ছিলেন। তারা যাতে জবাবে নিজেরাই একথা স্বীকার করে নেয় যে, এ উপাস্যরা একেবারেই অসহায় এবং এদের দ্বারা কোন উপকারের আশাই করা যায় না, তাই তিনি একথা বলেছিলেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোন ব্যক্তি প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য যে বাস্তব ঘটনা বিরোধী কথা বলে তাকে মিথ্যা গণ্য করা যেতে পারে না। বক্তা প্রমাণ নির্দেশ করার জন্য একথা বলে এবং শ্রোতাও একে সেই অর্থেই গ্রহণ করে।
.
দুর্ভাগ্যক্রমে হাদীসের এক বর্ণনায় একথা এসেছে যে, হযরত ইরাহীম (আ) তাঁর জীবনে তিনবার মিথ্যা কথা বলেছিলেন। তার মধ্যে এটি একটি “মিথ্যা।” দ্বিতীয় “মিথ্যা” হচ্ছে সূরা সাফফাতে হযরত ইবরাহীমের اني سقيم কথাটি। আর তৃতীয় “মিথ্যাটি” হচ্ছে তাঁর নিজের স্ত্রীকে বোন বলে পরিচিত করানো। একথাটি কুরআনে নয় বরং বাইবেলের আদি পুস্তকে বলা হয়েছে। এক শ্রেণীর বিদ্বানদের “রেওয়াত” প্রীতির ব্যাপারে সীমাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে, তাদের কাছে বুখারী ও মুসলিমের কতিপয় বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতাই বেশী প্রিয় এবং এর ফলে যে একজন নবীর ওপর মিথ্যা বলা অভিযোগ আরোপিত হচ্ছে, তার কোন পরোয়াই তাদের নেই। 
.
অপর একটি শ্রেনী এই একটিমাত্র হাদীসকে ভিত্তি করে সমগ্র হাদীস শাস্ত্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা শুরু করে দেয় এবং বলতে থাকে, সমস্ত হাদীসের স্তুপ উঠিয়ে দূরে ছুঁড়ে দাও। কারণ এর মধ্যে যতো আজেবাজে ধরনের রেওয়ায়াত পাওয়া যায়। অথচ কোন একটি বা কতিপয় হাদীসের মধ্যে কোন ত্রুটি পাওয়া যাবার কারণে সমস্ত হাদীস অনির্ভরযোগ্য হয়ে যাবে--- এমন কোন কথা হতে পারে না। আর হাদীস শাস্ত্রের দৃষ্টিতে কোন হাদীসের বর্ণনা পরম্পরা মজবুত হওয়ার ফলে এটা অপরিহার্য হয়ে ওঠে না যে, তার “মতন” (মুল হাদীস) যতই আপত্তিকর হোক না কেন তাকে চোখ বন্ধ করে “সহীহ” বলে মেনে নিতে হবে। বর্ণনা পরম্পরা সহীহ ও নির্ভরযোগ্য হবার পরও এমন অনেক কারণ থাকতে পারে, যার ফলে এমন “মতন” ত্রুটিপূর্ণ আকারে উদ্ধৃত হয়ে যায় এবং এমন সব বিষয়বস্তু সম্বলিত হয় যে, তা থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, একথাগুলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ নিসৃত হতে পারে না। তাই সনদ তথা বর্ণনা পরম্পরার সাথে সাথে “মতন”ও দেখা অপরিহার্য। যদি মতনের মধ্যে সত্যিই কোন দোষ থেকে থাকে তাহলে এরপরও অযথা তার নির্ভুলতার ওপর জোর দেয়া মোটেই ঠিক নয়।
.
যে হাদীসটিতে হযরত ইবরাহীমের তিনটি “মিথ্যা কথা” বর্ণনা করা হয়েছে সেটি কেবলমাত্র এ কারণে আপত্তিকর নয় যে, এটি একজন নবীকে মিথ্যাবাদী গণ্য করেছে বরং এ কারণেও এটি ত্রুটিপূর্ণ যে, এখানে যে তিনটি ঘটনার কথার বলা হয়েছে সেগুলো সবই বিতর্কিত। এর মধ্যে “মিথ্যা”র অবস্থা তো পাঠক এইমাত্র দেখলেন। সামান্য বুদ্ধি-জ্ঞানও যার আছে তিনি কখনো এই প্রেক্ষাপটে হযরত ইবরাহীমের এই বক্তব্যকে “মিথ্যা” বলে আখ্যায়িত করতে পারেন না। এক্ষেত্রে নবী (সা) সম্পর্কে (নাউযুবিল্লাহ) আমরা এমন ধারণা তো করতেই পারি না যে, তিনি এই বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝাবেন না এবং খামাখাই একে মিথ্যা ভাষণ বলে আখ্যায়িত করবেন। 
.
আর اني سقيم সংক্রান্ত ঘটনাটির ব্যাপারে বলা যায়, এটিকে মিথ্যা প্রমাণ করা যেতে পারে না যতক্ষণ না একথা প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইবরাহীম সে সময় সম্পূর্ণ সুস্থ, সবল, রোগমুক্ত ছিলেন এবং তিনি সামান্যতম অসুস্থতায়ও ভুগছিলেন না। একথা কুরআনে কোথাও বলা হয়নি এবং আলোচ্য হাদীসটি ছাড়া আর কোন নির্ভরযোগ্য হাদীসেও এ আলোচনা আসেনি। এখন বাকী থাকে স্ত্রীকে বোন বলার ঘটনাটি। এ ব্যাপারটি এত বেশী উদ্ভট যে, কাহিনীটি শোনার পর কোন ব্যক্তি প্রথমেই বলে বসবে এটা কোন ঘটনাই হতে পারে না। এটি বলা হচ্ছে তখনকার কাহিনী যখন হযরত ইবরাহীম নিজের স্ত্রী সারাকে নিয়ে মিসরে যান। বাইবেলের বর্ণনামতে তখন হযরত ইবরাহীমের বয়স ৭৫ বছর ও হযরত সারার বয়স ৬৫ বছরের কিছু বেশী ছিল। এ বয়সে হযরত ইবরাহীম ভীত হলেন মিসরের বাদশাহ এ সুন্দরীকে লাভ করার জন্য তাঁকে হত্যা করবেন। কাজেই তিনি স্ত্রীকে বললেন, যখন মিসরীয়রা তোমাকে ধরে বাদশাহর কাছে নিয়ে যেতে থাকবে তখন তুমি আমাকে নিজের ভাই বলবে এবং আমিও তোমাকে বোন বলবো, এর ফলে আমি প্রাণে বেঁচে যাবো। (আদি পুস্তকঃ১২ অধ্যায়) 
.
হাদীসে বর্ণিত তৃতীয় মিথ্যাটির ভিত্তি এই সুস্পষ্ট বাজে ও উদ্ভট ইসরাঈলী বর্ণনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যে হাদীসের ‘মতন’ এ ধরনের উদ্ভট বক্তব্য সম্বলিত তাকেও আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উক্তি বলে মেনে নেবো কেমন করে--- তা তার ‘সনদ’ যতই ত্রুটিমুক্ত হোক না কেন? এ ধরনের একপেশে চিন্তা বিষয়টিকে বিকৃত করে অন্য এক বিভ্রান্তির উদ্ভব ঘটায় যার প্রকাশ ঘটাচ্ছে হাদীস অস্বীকারকারী গোষ্ঠী।" (তাফসীরে তাফহীমুল কুরআন, সূরা আম্বিয়া দ্রঃ; আরো বেশী জানার জন্য দেখুন আমার লিখিত বই রাসায়েল ও মাসায়েল ২ খণ্ড, কতিপয় হাদীসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তার জবাব নিবন্ধের ১২নং জবাব)
.
হযরত ইবরাহীম (আ) সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা নিজেই বলেন,
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِبْرَاهِيمَ ۚ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيقًا نَبِيًّا.
স্মরণ কর এই কিতাবে ইবরাহীমকে। নিশ্চয় সে ছিল পরম সত্যবাদী, নবী। (সূরা মারইয়ামঃ১৯/৪১)
সুতরাং যারা হযরত ইবরাহীম (আ) কে "মিথ্যুক" বা "মিথ্যাবাদী" প্রমাণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে তারা মূলত আল্লাহর বানী কুরআন অস্বীকারকারী এবং কুফুরীতে লিপ্ত।
.
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا
"তারা কি কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? আর যদি তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হত, তবে অবশ্যই তারা এতে অনেক বৈপরীত্য (ভুলভ্রান্তি) দেখতে পেত।" (সূরা নিসাঃ৪৮২)
.
এ অায়াত দ্বারা প্রমাণিত কুরআন ছাড়া অন্যান্য যে কোন কিতাবের ভুল হতেমা পারে। কারণ কুরআন আল্লাহর কালাম আর আল্লাহর কালাম ছাড়া কোন মানুষের বর্ণনা ভুল হওয়া স্বাভাবিক। বুখারী মুসলিমের রাবীরও ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আমরা বিশ্বাস করি কোন নবীই মিথ্যুক নন, তারা মিথ্যাবাদী হতে পারেনা। হযরত ইবরাহীম (আ) এর মিথ্যুক হওয়ার বর্ণনা আমরা বিশ্বাস করি না। বরং আমরা বিশ্বাস করি, কোন রাবীরই বর্ণনা করতে ভুল হয়ে গেছে কিংবা ভুল করে ইসলাঈলী বর্ণনাকেই রাসূলুল্লাহ (সা) হাদীস বলে চালিয়ে দিয়েছে। কেননা বুখারী মুসলিমের রাবী হলেও তারাও মানুষ। আর মানুষ ভুল করবে, এটাই স্বাভাবিক। 
.
কেননা, হযরত আনাস (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
.كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ.
হযরত আদম (আ) এর প্রত্যেকটি সন্তানই ভুলকারী। আর তাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম ব্যক্তি যে তার ভুল সংশোধন করে নেয়। (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৮৭)
.
সুতরাং যারা বলে "বুখারী মুসলিমের রাবী, তাই তাদের কোন ভুল হতে পারে না বরং নবীগণই মিথ্যুক বা মিথ্যাবাদী" - তারা বিপদগামী, পথভ্রষ্ট, গোমড়া এবং তাদের আকিদা সহীহ কুফুরী আকিদা, এতে কোন সন্দেহ নাই। 
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকর কুফুরী আকিদা থেকে হেফাজত করুন। (আমীন)


ইসলাম আকীদা
০ টি মন্তব্য      ৬০৭ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: