অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২২ জন ভিজিটর

কবি আল মাহমুদঃ আমাদের চেতনার রাজপুরুষ........(শেষ পর্ব)

লিখেছেন লাবিব আহসান রবিবার ১৭ মার্চ ২০১৯

কিন্তু পরবর্তীতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন কবি। এমনকি এজন্য প্রায় ১ বছর তাঁকে কারাভোগও করতে হয়। তিনি ছিলেন দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক। কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর আপাদমস্তক বদলে যান কবি। তাঁর এই বদলে যাওয়ার পিছনে যে পরশ পাথর ছিলো, তার নাম আল কোরআন। এক সময় নাস্তিকতার আদর্শ লালনকারী কবি আল মাহমুদের হঠাৎ ইসলামপন্থী হয়ে যাওয়ার পিছনে রয়েছে একটি ইতিহাস। কবির নিজের ভাষায়, “আমি ১ বছর কারাগারে আটক থাকার সময় আমার স্ত্রী জেলখানায় একখানা কোরআন দিয়ে এলে আমি তা অর্থসহ আদ্যোপান্ত পাঠ করা শুরু করি। আার প্রথম পাঠেই আমার শরীর কেঁপে ওঠে। এর আগে কোনো গ্রন্থ পাঠে আমার মধ্যে এমন আলোড়ন সৃষ্টি হয় নি। যেন এক অলৌকিক নির্দেশে আমার মস্তক মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।” মূলত এরপরেই কবি মার্ক্সবাদী দর্শন ত্যাগ করে ইসলামী জীবন দর্শনে উদ্বুদ্ধ হন। এভাবেই তিনি বামপন্থীদের বিরাগভাজন হয়ে পড়েন। তাঁর এই পরিবর্তন সেক্যুলারপন্থীরা কিছুতেই মেনে নিতে পারে নি। অধিকাংশ সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেল বামপন্থী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে মিডিয়াতে কবিকে আমৃত্যু উপেক্ষা করা হয়েছে। নতুন প্রজন্ম যেন তাঁর সম্পর্কে জানতে না পারে, সেজন্য পাঠ্য বই থেকেও তাঁর কবিতা অপসারণ করা হয়েছে। জীবদ্দশায় তাঁকে অত্যন্ত সচেতনভাবে বর্জন করা হয়েছে, অযত্ন আর অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছে। একজন ভাষাসৈনিক এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্বেও তাঁর কফিন শহীদ মিনারে নিতে দেয়া হয় নি। জাতীয় ঈদগাহে করতে দেয়া হয় নি তাঁর নামাজে জানাযা। এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে জানানো হয় নি কোনো শোক। এটা জাতি হিসেবে আমাদের হীনমণ্যতা, আমাদের দৈন্যতা, আমাদের পরাজয়। আমরা মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠাতে সক্ষম হলেও হৃদয়কে প্রশস্ত করতে শিখিনি। আমরা বিশাল সমুদ্র জয় করলেও আমাদের ক্ষুদ্রতাকে জয় করতে পারি নি। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, “যে জাতি গুণীর কদর করতে জানে না, সে জাতির মধ্যে গুণীর জন্ম হয় না।”

 

 

আমাদের সকল অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য আর উপেক্ষা নিয়ে কবি চলে গেছেন নির্বিকারভাবে। যে তিতাসের কোল থেকে একদিন উঠে এসেছিলেন যান্ত্রিক শহর ঢাকায়, মৃত্যুর পর ফিরে গেছেন নিজের সেই চিরচেনা শহরে, নিজের মাটিতে। চলে গেছেন তাঁর আকাঙ্খিত প্রিয় শুক্রবারেই। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দার হৃদয়ের আঁকুতি কবুল করেছেন,

                                                                                   “কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে
                                                                                    মৃত্যুর ফেরেস্তা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাগিদ;
                                                                                    অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
                                                                                    ভালো মন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।”

 

কবি আব্দুল হাই শিকদার লিখেছিলেন, “আল মাহমুদ ছিলেন বলেই এখনও স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ। আল মাহমুদ ছিলেন বলেই আমরা এখনও হাসি, কাঁদি, ভালোবাসি। আল মাহমুদ ছিলেন বলেই ড. ইউনূস বিশ্বসভায় বাংলাদেশের মৌলিক মৃত্তিকা হয়ে ওঠেন। উঁচুতে তুলে ধরেন দেশের সম্মান ও মর্যাদা। আল মাহমুদ ছিলেন বলেই মুসা ইবরাহিম, এম এ মুহিত, নিশাত আর ওয়াসফিয়া এভারেস্টের ওপর পা রেখেছিলেন। আর সাকিব আল হাসান হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। নোংরা, স্বার্থপর, সঙ্কীর্ণ ও মূর্খ কিছু প্রাণীকে এ দেশের মানুষ যে কবি বলে সম্মান করে, সে তো শুধু এই কারণে, আল মাহমুদ আমাদের মধ্যে ছিলেন।” আমাদের সেই কবিতার রাজপুত্র চলে গেছেন ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখ। চলে গেছেন তিতাস পাড়ে, যেখান থেকে একদা উঠে এসেছিলেন আমাদের প্রেম শেখাতে, ভালোবাসার অবিন্যস্ত পঙক্তিমালা শেখাতে। কবি চলে গেছেন সকল অবিমৃষ্যকারী সংঘবদ্ধ দাসানুদাসদের হীনমণ্য কণ্ঠের ঘেউ ঘেউ উচ্চারণকে ভ্রুকুটি করে অনাদি কালের দিকে। যিনি আমাদের হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন ভালোবাসার এক সুরম্য অরণ্যঘন প্রান্তরে, তাঁকে বিদায় বেলায় আমরা ভালোবাসাটুকু ফিরিয়ে দিতে পারি নি। ফেব্রুয়ারির নিরুত্তাপ দুপুরে আমরা প্রকাশ করেছি আমাদের ক্ষুদ্রতা, আমাদের নিচতা। আজীবন যাঁর পথে বিছিয়ে এসেছি পঙ্কিল ঈর্ষার বিষময় কণ্টক, বিদায় বেলায়ও খানিকটা বদান্য হতে পারিনি তাঁর প্রতি। আমাদের হৃদয়ের অন্ধকার কুঠুরিতে জ্বালাতে পারিনি সত্যের আলোক মশাল। আমাদের বিভেদ, বিদ্বেষ, ঘৃণা আর অশ্রদ্ধার কার্বন-ডাই-অক্সাইডগুলিকে লাথি মেরে সীমান্তের ওপারে পাঠাতে পারিনি আমরা। আমরা পারিনি আমাদের রক্তাভ জমিনকে বানাতে কোনো এক মানবিক ভূখন্ড। আমরা থকথকে নর্দমার গন্ধভরা হৃদয়গুলো ধুয়ে পরিষ্কার করতে পারিনি এক মহানায়কের প্রস্থান বেলায়ও। কিন্তু যাঁকে ঘিরে এই অবজ্ঞার বিষন্ন উপত্যকা, তিনি কেমন যেন নির্লিপ্ত, ভ্রুক্ষেপহীন। নীরবে ঘুমিয়ে আছেন, প্রশান্ত, নিশ্চুপ। যেন তাঁর কোনো অভিযোগ নেই, নেই অনুযোগের এভারেস্ট। হয়তো স্থির হয়ে যাওয়া হৃদপিন্ডটার আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো অল্প বিস্তর কিছু অভিমান, নীরবে নিভৃতে। জানিনি আমরা, জানে নি কেউ। নরম নরম সে সকল অভিমান কেবল বেরিয়ে আসতে পেরেছিলো অনেক আগের কোনো কবিতার কালো অক্ষরে,

                                                           “কেন এতো বুক দোলে? আমি আর আসবো না বলে?
                                                            যদিও কাঁপছে হাত তবু ঠিক অভ্যেসের বশে
                                                            লিখছি অসংখ্য নাম চেনাজানা
                                                            সমস্ত কিছুর।
                                                            প্রতিটি নামের শেষে, আসবো না।
                                                            পাখি, আমি আসবো না।
                                                            নদী, আর আসবো না।
                                                            নারী, আর আসবো না, বোন।”

 


আল মাহমুদ সোনালী কাবিন বখতিয়ারের ঘোড়া রাজপুরুষ কবিতা আমাদের মিছিল
০ টি মন্তব্য      ৪৬০ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: