অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ৩২ জন ভিজিটর

কমরেড সিরাজ সিকদারের সাতকাহন

লিখেছেন আফগানী সোমবার ১৩ জানুয়ারী ২০২০

 

সিরাজ সিকদার বাংলার রাজনীতিতে একজন আলোচিত ব্যক্তি। তিনি কারো মতে বাংলার চে গুয়েভারা। আবার কেউ তার মধ্যে একজন সন্ত্রাসবাদী ছাড়া আর কিছু খুঁজে পাননি। তার অনেক কমরেডই তাকে একনায়ক হিসেবে আখ্যা করে দল ছেড়েছেন। অনেক প্রবীন নেতা তার কাজকর্মকে বলেছেন হটকারী, বলেছেন সিআইএর দালাল। তারপরও লাল বই পড়ে বিপ্লবী হতে চাওয়া নাদানদের কাছে সিরাজ সিকদার হিরো হয়েই আছেন।

 

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব পরিচালিত রাষ্ট্র জানিয়েছে, জানুয়ারির ২ তারিখ গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাস্টোডি থেকে পালানোর সময় ক্রসফায়ারে নিহত হন সিরাজ সিকদার।

 

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস জানিয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের হালিশহরে সরকারী গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাকে গ্রেপ্তার করেন। আবার অন্য তথ্যমতে তিনি চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন। সেই দিনই তাকে বিমানে ঢাকায় আনা হয়। পরদিন শেরেবাংলা নগর থেকে সাভারে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে যাওয়ার পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাকে হত্যা করে।

 

তার বোনজামাই জাকারিয়া চৌধুরী জানিয়েছে, সিরাজ সিকদারকে হাতকড়া লাগিয়ে চোখবাঁধা অবস্থায় ঢাকাস্থ রমনা রেসকোর্সের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে আসা হয়। তারপর ২ জানুয়ারি ১৯৭৫ গভীর রাতে এক নির্জন রাস্তায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। আজকের এই দিনটিকে জাতীয় ক্রসফায়ার দিবস হিসেবে পালন করা যেতে পারে। এটাই বাংলাদেশের প্রথম ক্রসফায়ার হিসেবে জানি। বুয়েটের সাবেক ছাত্র জনাব সিকদার একজন মাওবাদী গেরিলা ছিলেন। সেসময় জনাব মুজিব তাকে বিনা বিচারে খুন করেন।

 

শিক্ষা ও ক্যারিয়ার :

সিরাজ সিকদার ১৯৫৯ সালে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে তিনি আইএসসি পাস করেন। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রকৌশলবিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ছাত্র অবস্থায় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িত থেকে প্রত্যক্ষভাবে ছাত্ররাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা জেলা কমিটির কংগ্রেসে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি পদে নির্বাচিত হন। ঐ বছরই তিনি সরকারের নির্মাণ (সিঅ্যান্ডবি) বিভাগের কনিষ্ঠ প্রকৌশলী পদে যোগদান করেন। কিন্তু মাত্র তিন মাসের মাথায় সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি টেকনাফের ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি কোম্পানিতে যোগদান করেন।

 

বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস :

বামপন্থীদের মধ্যে সে সময় দুটো ধারা-রুশ ও চীনাপন্থী। মূলত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যেই তা প্রবল ছিলো। নেতা পর্যায়ে তা ছিলো ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ব্যানারে। কারণ পাকিস্তানে তখন কম্যুনিস্ট পার্টি ছিলো নিষিদ্ধ, অতএব গোপন। রুশপন্থীদের ঝামেলা কম। তারা কর্মীদের নানা ধরণের অসাম্প্রদায়িক গান-বাজনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্যস্ত রাখে। সমাজতন্ত্রের পথে শান্তিপূর্ণ রূপান্তরে বার্মা তাদের কাছে মডেল। শৃংখলা ভাঙ্গার সুযোগ তাই নেই। অন্যদিকে চীনাপন্থীরা সোভিয়েত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কে বেশী সাম্রাজ্যবাদী, কাকে শ্রেনীশত্রু ও সংস্কারবাদী ধরা হবে এই নিয়ে বিতর্কে ব্যস্ত।

 

এই দশকের শেষ দিকে পশ্চিম বঙ্গ কাঁপিয়ে দিলেন চারু মজুমদার। নকশাল আন্দোলনের সেই জোয়ার পিকিং রিভিউর সৌজন্যে রোমাঞ্চিত করে তুললো চীনাপন্থী তরুণদের। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র সিরাজ শিকদার তাদের একজন। ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন) লিয়াকত হল শাখার সভাপতি তিনি। মার্কসবাদ সম্পর্কে তার প্রচুর জ্ঞান। পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টির (মার্কস-লেনিন) সদস্যপদও পেয়েছেন। নকশালবাড়ির আন্দোলনকে পার্টির নেতারা হঠকারিতা বলে রায় দিয়েছেন। আর এর প্রতিবাদে তরুণদের একটা দল বেরিয়ে এসে গঠন করলেন রেডগার্ড। ঢাকা শহরে চিকা পড়লো- বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস/ নকশালবাড়ী জিন্দাবাদ।

 

সিরাজ শিকদার তাদের অন্যতম। তার চোখে তখন মাও সেতুং হওয়ার স্বপ্ন জেঁকে বেসেছে। এমনিতে তার খুব বেশী বিলাসিতা ছিলো না বলেই জেনেছি শুধু ঐ সানগ্লাসটা ছাড়া। ধুমপানের বদভ্যাস ছিলো না, যা সাধারণত বাম বিপ্লবীদের ফ্যাশন। সে যুগের ট্রেন্ড অনুসরণ করে কৃষকদের জাগিয়ে তোলার জন্য গেলেন নিজের এলাকা মাদারীপুরের ডামুড্যায়। কিন্তু শ্রেনী সংগ্রামের বিভেদ বোঝাতে গিয়ে বিপাকে পড়লেন। সার্কেল অফিসারের ছেলে, ইঞ্জিনিয়ার, পাত্রের বাজারে দাম লাখ টাকা। এক কৃষক তাকে চ্যালেঞ্জ করে বসলেন গরীবের প্রতি তার দরদ পরীক্ষায়। চ্যালেঞ্জ মেনে কৃষকের মেয়ে হাসিনাকে বিয়ে করলেন।

 

নকশাল আন্দোলন :

এটি একটি কমিউনিস্ট আন্দোলনের নাম। পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি থেকে শুরু হয়ে এটি ধীরে ধীরে ছত্তীসগঢ় এবং অন্ধ্র প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমে এটি একটি সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। নকশাল বা নকশালবাদী বলতে উগ্র বামপন্থী মাওবাদী দলগুলোকে নির্দেশ করা হয়। এসব দলের জন্ম হয়েছিল চিন-সোভিয়েত ভাঙনের সময়। মতাদর্শগত ভাবে এরা মাও সে তুং-এর পদাঙ্ক অনুসরণকারী।

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের সদর দপ্তর :

বিপ্লবের আরো প্রস্ততি হিসেবে মার্শাল আর্ট শেখা ধরলেন। এরপর ৭ সঙ্গী নিয়ে টেকনাফ হয়ে গেলেন বার্মা। সেখানকার কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা থান-কিন-থাউর সঙ্গে দেখা করলেন নে-উইনের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামের স্বরূপ জানতে। এর মধ্যে রেডগার্ডের মাহবুবুল করিমকে চিঠি দিয়ে জানালেন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় তিনি বিপ্লবীদের মূল ঘাঁটি তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আরো সদস্য পাঠাতে। আর বাকী কমরেডদের নিয়ে লেগে গেলেন পাহাড় কেটে সুরঙ্গ তৈরিতে। চীনা দুতাবাসে এর আগে টানেল ওয়ারফেয়ার নামে একটা তথ্যচিত্র দেখেছেন তারা। সে ধাঁচেই তৈরি হবে বিপ্লবী সদর। সঙ্গীরা সব অল্প বয়সী, কেউ ২০ পেরোয়নি। মধ্যবিত্ত ঘরের আদুরে সন্তান। পাহাড়ের খাদে ওই খেয়ে না খেয়ে ঝড় বৃষ্টিতে মশার কামড় খাওয়া আর সাপের সঙ্গে শোয়া বিপ্লব তাদের সইলো না। ৭ জনের মধ্যে ৫ জন পালালেন। রেডগার্ড নেতা মাহবুবের ভাই মাহফুজ তাদের একজন। রয়ে গেলেন বিহারী দুই ভাই। এদের মধ্যে কায়েদ-ই আযম কলেজের বিএসসির ছাত্র সাইফুল্লাহ আজমী সিরাজ শিকদার অন্তপ্রাণ। তার স্বপ্ন লিন বিয়াও হওয়া। ক্ষুব্ধ সিরাজ তাকে ছেড়ে আসা ৫ জনের বিশ্বাসঘাতকতায় মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করলেন। মাহবুব তার ভাইর পক্ষ নিলেন। সিরাজের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলো রেডগার্ড।

 

মাও সেতুং থট রিসার্চ সেন্টার :

পুরো ঘটনাকাল ১৯৬৭-৬৮ সালের। এর মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিলো মাও সে তুং থট রিসার্চ সেন্টার বা মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারা গবেষণা কেন্দ্র। সে বছরই মালিবাগে এটি প্রতিষ্ঠা করেন সিরাজ সিকদার। পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির প্রকাশনা স্ফুলিংঙ্গের বিশেষ সংখ্যায় (১৯৮১) এই সময়কালের কথাই বলা হয়েছে। একই সময় জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ সিরাজ শিকদার পুর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের ব্যানারে সর্বদলীয় এক বিপ্লবী ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়াস নেন। আর মাও থট সেন্টার ছিলো তার একটি ওপেন ফ্রন্ট। অন্যদিকে কমরেড রোকন তার স্মৃতিকথায় ব্যাপারটা উল্লেখ করেছেন অন্যভাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের এডভেঞ্চার শেষে ঢাকায় ফেরার পর খানিকটা হতাশ ছিলেন সিরাজ শিকদার। তার মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করার মতো কোনো ক্যাডার তখন ছিলো না। আর রেডগার্ডের সেই অংশ অর্থাৎ মাহফুজ, মাহবুব, নুরুল ইসলামসহ বাকিরা পূর্ব বাংলা বিপ্লবী কম্যুনিস্ট আন্দোলন নামে আলাদা সংগঠন গড়ে তোলেন। আর সেই ঘাটতি পূরণ করতেই মাও থট সেন্টারের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করার দায়িত্ব পান রোকন।

 

জাহানারা-সিরাজের দ্বৈরথ :

১৯৬৯ সালে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন মোটামুটি জমিয়ে ফেলেছেন সিরাজ। ন্যাপ ভাসানীর ছাত্র ফ্রন্টের বেশীরভাগ কর্মীই যোগ দিয়েছেন তার সাথে। এদেরই একজন রোকনউদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের ছাত্র। তার কাজিন জাহানারা। পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ব্রিগেডিয়ার হাকিমের স্ত্রী। মহিলাদের পত্রিকা মাসিক বেগমে লেখালেখি করতেন। স্ত্রীর নারীবাদী চিন্তাভাবনা পছন্দ ছিলো না হাকিমের। তার চলাফেরার উপর তাই নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। দুই সন্তানের জননী জাহানারা রোকনউদ্দিনের সহয়তায় বাড়ি থেকে পালালেন। রোকন তাকে নিয়ে উঠলেন নেতা সিরাজ শিকদারের আস্তানায়। খালেদা ছদ্মনামে দয়াগঞ্জে এক শেলটারে রাখার ব্যবস্থা হলো তাকে। এনএসআইর একঝাঁক গোয়েন্দা নেমে পড়লো জাহানারার খোঁজে।

 

এদিকে বাংলার মাও সিরাজ সিকদার তার অর্ধশিক্ষিত স্ত্রী হাসিনার মাঝে যা পাননি, তা পেলেন জাহানারার মাঝে। জাহানারা আরেকটি ছদ্মনাম নিলেন রাহেলা। কারণ এনএসআই তার খালেদা নামের খোঁজ পেয়ে গেছে। আর অনেকটা মজা করেই সিরাজ নাম নিলেন হাকিম ভাই। সবুজবাগে একটা ভাড়া বাসায় দুজনে একসঙ্গে থাকতে শুরু করলেন। রাতে বেরোতেন একসঙ্গেই। পার্টি সদস্যদের মধ্যে এ নিয়ে কানাকানি এবং একসময় অসন্তোষ সৃষ্টি হলো। চরমপন্থাতেই এই বিদ্রোহ দমন করলেন সিরাজ। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর এবং পেয়ারা বাগানে দুর্দান্ত যুদ্ধ করা সেলিম শাহনেওয়াজ খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক হুমায়ুন কবিরকে মরতে হলো জাহানারা-সিরাজের সম্পর্কের বিরুদ্ধাচরণ করায়। তবে এসব স্বাধীনতার অনেক পরের ঘটনা। ১ জানুয়ারি ১৯৭৫ তারিখে সিরাজের সঙ্গেই গ্রেপ্তার হন জাহানারা ওরফে খালেদা ওরফে রাহেলা। তাকে কুমিল্লায় ভাইয়ের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর দুজনের সন্তান অরুণের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিরাজ শিকদারের পিতাকে।

 

সিরাজের মুক্তিযুদ্ধ :

১৯৭০ সালের ৮ জানুয়ারী পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে স্বাধীন পূর্ব বাংলার পতাকা ওড়ানো হয়। ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও ময়মনসিংহে ওড়া এই পতাকায় সবুজ জমিনের মাঝে লাল সূর্য্য। বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় পতাকারই অনুরূপ! সে বছর ৬ মে কার্লমার্ক্সের জন্মদিনে পাকিস্তান কাউন্সিলে দুটো হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায় পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন, যা নিজেই ছুড়েছিলেন বলে দাবি করেছেন কমরেড রোকন। তার মতে পাকিস্তানের দুই অংশের যুবক যুবতীদের মধ্যে বিয়েকে উৎসাহিত করতে ৫০০ রূপী ভাতা চালু করেছিলো এই কাউন্সিল। স্মৃতিকথায় একই কাউন্সিলে দ্বিতীয়বার সিরাজের নির্দেশে আরেকজন কমরেডকে পাঠান রোকন। তার একহাত পঙ্গু ছিলো। পাকিস্তান কাউন্সিলের চারপাশে কড়া পাহারা দেখে তিনি পাশের এক ডাস্টবিনে বোমা ফেলে দেন। আর তা কুড়িয়ে পেয়ে খোলার সময় বিস্ফোরণে মারা যায় দুটো অল্পবয়সী শিশু।

 

অক্টোবর নাগাদ ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন, আমেরিকান ইনফরমেশান সেন্টারসহ আরো বেশ কিছু জায়গায় বোমা হামলা চালায় সিরাজের দল, যাতে হতাহতের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে জাতীয় শত্রু খতম কর্মসূচী চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। পার্টির স্বার্থবিরোধী এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা বিরোধীদের এই খতম তালিকায় রাখা হয়। পার্টির প্রথম খতমের শিকার হন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির এক চা বাগানের সহকারী ম্যানেজার হারু বাবু। ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে সংগঠিত এই হত্যাকাণ্ডই ছিলো পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের প্রথম খতম অভিযান।

 

আমাদের দেশে প্রচলিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সিরাজের ঠাঁই হয় না, কারণ দেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক বিজয় দিবসে হরতাল আহবান কিংবা মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে অন্য পিকিংপন্থী কম্যুনিস্টদের আদলেই তার অবস্থান। নির্দিষ্ট করে বললে ৭১-এর অক্টোবরে সিরাজ সিকদার নতুন পরিকল্পনা দেন তার দলকে এবং আহবান জানান আওয়ামী লীগ, ভারতীয় বাহিনী ও পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুগপত লড়াই চালাতে। তার দলের আক্রমণের শিকার হন মুক্তিযোদ্ধারাও।

 

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সিরাজের রাজনীতি :

১৯৭২ সালের ১২ থেকে ১৬ জানুয়ারি প্রথম জাতীয় কংগ্রেসে নতুন রাজনৈতিক ধারার ব্যাপারে স্পষ্ট ঘোষণা দেন সিরাজ। এতে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, রুশ সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তব্যবাদ এবং রুশ ভারতের দালালদের পূর্ব বাংলার জনগনের মূল শত্রু হিসেবে গণ্য করা হয়। সিরাজ সিকদার পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশকে ভারতের উপনিবেশ হিসেবে উল্লেখ করে "পূর্ব বাংলার বীর জনগণ, আমাদের সংগ্রাম এখনও শেষ হয় নি, পূর্ব বাংলার অসমাপ্ত জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার মহান সংগ্রাম চালিয়ে যান" নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল হাজির করেন। যেখানে আওয়ামী লীগকে জাতীয় বিশ্বাসঘাতক ও বেইমান হিসেবে উল্লেখ করে তাদের কে ছয় পাহাড়ের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৬ ডিসেম্বরকে কালো দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ এ এই দিনে দেশব্যাপী হরতাল পালন করা হলে মওলানা ভাসানী বিবৃতি দিয়ে তা সমর্থন করেন। দেশব্যাপী গণভিত্তি সম্পন্ন পার্টি গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করেন। দিনে দিনে সিরাজ সিকদার এক জনপ্রিয় নেতা হয়ে ঊঠতে থাকেন। ছাত্র-তরুন'রা দলে দলে তার সংগঠনে যোগ দিয়ে লড়াই জারি রাখেন।

 

ভাঙন :

জাহানারার সঙ্গে সিরাজের অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে পার্টিতে শুরু হয় কলহ। এইসময় অভিযোগ ওঠে আজম, রিজভী ও মোহসিনসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে সঙ্গী করে সিরাজকে বহিষ্কার করার উদ্যোগ নেন ফজলু ও সুলতান। এদের কুচক্রী হিসেবে চিহ্নিত করে ১৯৭২ সালের মে মাসে বহিস্কার করেন সিরাজ। জুনের প্রথম সপ্তাহে কাজী জাফর গ্রুপের কিলার খসরুকে দিয়ে সেলিম শাহনেওয়াজ ওরফে ফজলু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরকে হত্যা করা হয়। হুমায়ুন কবির হ্ত্যাকান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে সিআইডি জেরা করে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফরহাদ মাজহারকে। এর মধ্যে মাহবুবুর রহমান ওরফে শহীদ গ্রেপ্তার হন পুলিশের হাতে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন এই সন্দেহে তাকে সেন্ট্রাল কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয় ‘৭৩ সালের শুরুতে। এর মধ্যে পার্টি বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে সংশোধনের শিকার হতে হয় আরো অনেককে। বহিষ্কার এবং মৃত্যু দুটোই বরণ করতে হয় তাদের।

 

সিরাজের উত্থান :

১৯৭৩ সালকেই ধরা হয় সিরাজ সিকদারের স্বর্ণ সময়। এ সময়ই সরকারের প্রশাসনিক দূর্বলতা এবং বাংলাদেশে দূর্ভিক্ষের আসন্ন ছায়াকে কাজে লাগিয়ে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন তিনি। ভাবমূর্তি বলতে এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাওয়া এক মেহনতি মানুষের ভাব। এর মধ্যে ঢাকার অদূরে বৈদ্যেরবাজারসহ বেশ কটি ব্যাঙ্ক লুট করেন তারা। গল্প ছড়িয়ে পড়ে সিরাজ ব্যাঙ্ক লুট করে অভাবী মানুষকে খাবার দিচ্ছেন। দখল করা হয় ময়মনসিং মেডিকেল কলেজ, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও টাঙ্গাইলের পাথরাইল পুলিশ ফাড়ি। মাদারিপুরের এএসপি সামাদ মাতবর, মগবাজারের রক্ষীবাহিনীর কর্মকর্তা ফজলুল হক, বরিশালে সাংসদ মুকিম, শেখ মুজিবর রহমানের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী মহিউদ্দিন, টেকেরহাতের নেতা শাহজাহান সরদার, ভোলার রতন চৌধুরী, মাদারিপুরের নিরুসহ অনেকেই তাদের হাতে খুন হন। এরপর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে আবার হরতাল ডাকেন সিরাজ। বিজয় দিবসকে ঘোষণা করেন কালো দিবস হিসেবে। এবার নড়েচড়ে বসে মুজিব সরকার। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ উল্লাহ মাওবাদী চরমপন্থীদের অরাজকতার দোহাই দিয়ে সারা দেশে জরুরী অবস্থা জারি করেন।

 

সিরাজের বিরুদ্ধে লাগে সরকার। গোয়েন্দা সংস্থার ক্রমাগত তাড়া খেয়ে তখন কোথাও কয়েকঘণ্টার বেশী থাকার উপায় নেই তার এবং জাহানারার। এর সরকারের সাথে লুকোচুরি খেলার মধ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামে জন্ম নেয় দুজনের সন্তান অরুণ। আর দলের মধ্যে কলহ লেগেই আছে। পার্টির অনেক ক্যাডারই সিরাজের আনুগত্যের বাইরে যা ইচ্ছে করে বেড়াচ্ছে। ইচ্ছেমতো ডাকাতি করছে আর সম্পদ গড়তেছে। অনেকেই দলীয় আদর্শ ভুলে পেশাদার ডাকাতে পরিণত হয়েছে।

 

সেবছর ভারতীয় রাষ্ট্রপতি গিরির সফরের সময় হরতাল ডাকেন সিরাজ এবং বোমায় কাঁপে সারা দেশ। এ সময়টাতেই ভারতের মার্কসবাদীদের মুখপাত্র বলে কথিত সাপ্তাহিক ফ্রন্টিয়ারে (২০ জুলাই, ১৯৭৪) সিরাজ শিকদারের দলের তীব্র সমালোচনা করে লেখা হয় যে চারু মজুমদার যা ভুলভ্রান্তি করেছেন তা সিরাজের নখের সমানও নয়। চীনা বিপ্লবের ভুল পাঠ নিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি লুটপাটের মাধ্যমে সদস্যদের পকেটভর্তি এবং ব্ল্যাক মেইলের অভিযোগও ওঠে। এবং অন্য মাওবাদীরা তাকে সিআইএর এজেন্ট বলছেন এমন কথাও লেখা হয়। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে গোটা সময়টায় সিরাজ শিকদারের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন শিল্পপতি জহুরুল ইসলাম। এই জহুরুল ইসলামের সাথে সিরাজের পরিচয় ঘটে সিএন্ডবিতে। ফেরারী অবস্থায় তার নাভানা মটরসই ছিলো সিরাজ ও জাহানারার নিরাপদ আশ্রয়।

 

গ্রেপ্তার ও ক্রসফায়ার :

১৯৭৫ সালের জানুয়ারির ১ তারিখ গ্রেপ্তার হন সিরাজ শিকদার। এ বিষয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। বলা হয় তার ঘনিষ্ঠ কোনো কমরেডই বিশ্বাসঘাতকতা করে ধরিয়ে দিয়েছেন তাকে। পাশাপাশি এও বলা হয় যে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা সফলভাবেই সর্বহারা গ্রুপে ইনফিলট্রেট করে এবং তারই ধারাবাহিকতায় গ্রেপ্তার হন সিরাজ। এরপর তাকে ঢাকা নিয়ে আসা হয়। কেউ কেউ বলে তাকে প্রাইভেট বিমানে করে উড়িয়ে আনা হয়েছে, কেউ বলেছেন হেলিকপ্টারে। বিমানের গল্পে সিরাজের চোখ বাঁধা, এটা দেখে পাইলটদের বিমান চালাতে অস্বীকৃতির অধ্যায় আছে। এয়ারপোর্টে সিরাজের পানি খেতে চাওয়া এবং তাকে কষে লাথি মারার গল্প আছে। এবং সবচেয়ে নাটকীয়টি হচ্ছে মুজিবের মুখোমুখি রক্তাক্ত সিরাজের উক্তি : বি কেয়ারফুল মুজিব, ইউ আর টকিং টু সিরাজ শিকদার। এরপর মুজিবের তাকে লাথি মারা। কিন্তু কোনটারই সত্যিকার অর্থে প্রমাণ দিতে পারেননি কেউই।

 

২ জানুয়ারী সাভারে নিহত হন সিরাজ শিকদার। সরকারী ভাষ্য গাড়ি থেকে পালানোর সময় গুলিতে নিহত হন তিনি। বাংলাদেশে ক্রসফায়ারের প্রথম উদাহরণ। এটাও ভারত থেকে আমদানী যা নকশালদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে খ্যাতিমান হয়ে গিয়েছিলেন সাব ইন্সপেক্টর রুনুগুহ নিয়োগী। তবে কমরেড রোকনের স্মৃতিকথায় একটি গুরুত্বপূর্ন ঘটনার উল্লেখ আছে। ১৯৭৩ সালে মাদারিপুরে একবার ধরা পড়েছিলেন সিরাজ শিকদার। কিন্তু দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা মোহসিন তাকে পালানোর সুযোগ দেন। কারণ ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও ক্ষিপ্ত ছিলেন।

 

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদ অধিবেশন বসে। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করানোর পর তার দ্বিতীয় বিপ্লব, বাকশাল প্রসঙ্গে শেখ মুজিব অধিবেশনে বলেন , স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার পর যারা এর বিরোধীতা করেছে, যারা শত্রুর দালালী করেছে, কোনো দেশেই তাদের ক্ষমা করা হয় নাই। কিন্তু আমরা করেছি। আমরা তাদের ক্ষমা করে দিয়ে বলেছি, দেশকে ভালোবাসো। দেশের স্বাধীনতা মেনে নাও। দেশের কাজ করো। কিন্তু তারপরও এদের অনেকে শোধরায়নি। এরা এমনকি বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে বিদেশ থেকে টাকা নিচ্ছে। ওরা ভেবেছে, আমি ওদের কথা জানি না! একজন রাতের আঁধারে মানুষ মেরে যাচ্ছে, আর ভাবছে তাকে কেউ ধরতে পারবে না। কোথায় আজ সিরাজ সিকদার? তাকে যখন ধরা গেছে, তখন তার সহযোগীরাও ধরা পড়বে।…

 

এরপর মুজিব, জিয়া ও এরশাদ সরকারের কঠোরনীতির ভেতর সর্বাহারা পার্টি বহু ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর বেশীরভাগ উপদলই আদর্শহীন সন্ত্রাসী বাহিনীতে পরিনত হয় মাত্র– সে ইতিহাস সবার জানা। সর্বশেষ তারা ডাকাতি করতে গিয়ে তারা মারা পড়ে বাংলা ভাইয়ের হাতে।

 

বাংলাদেশ সর্বহারা ক্রসফায়ার বামপন্থী
০ টি মন্তব্য      ১৫৫৬ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: