অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ১৯ জন ভিজিটর

ক্ষুদ্র ভুলের ব্যর্থ গুহা-ভিযান...

লিখেছেন Nazrul Islam Tipu মঙ্গলবার ১২ মার্চ ২০১৯

পরের বারে সিলায় গিয়ে দেখলাম কিছু দিনের ব্যবধানে সেখানে নিয়মের কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। যে লেবু গাছ থেকে লেবু ছিঁড়ে অন্যায় করেছিলাম, সে স্থানটি পরিপূর্ণ ফাঁকা! গাছগুলো কেটে সেখানে একটি পাকা ঘর উঠেছে। ঘরের মাঝখানে এক কোমর পরিমাণ উঁচু কবর আকৃতির রঙ্গিন স্তম্ভ বানানো হয়েছে। সেটাকে দৃশ্যমান করতে চিকন রশিতে রঙ্গিন কাগজ পেঁচিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। কবরের মত দেখতে এই জিনিষটা কি? আমাদের গ্রাম্য চাচার এমন প্রশ্নে তিন জন থেকে তিন ধরনের উত্তর পেলেন। তিনি আমার মায়ের কাছে ব্যাপারটি পরিষ্কার করতে গিয়ে, নিজের অভিজ্ঞতা ও আগে প্রাপ্ত তিন প্রকার তথ্য মিলিয়ে চতুর্থ প্রকার আরেকটি উত্তর খাড়া করে তাঁকে বুঝিয়ে দিলেন! মা তাড়াতাড়ি দুই জোড়া মোম বাতি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সেখানে পাঠিয়ে দিলেন!

যাক, যথারীতি শিন্নী বণ্টন, হাস-মুরগী জবাই, ফাতেহা ও খাওয়া পর্ব শেষে সিলার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। সিলার গুহাতে যখন ঢুকতে যাই, তখন গুহায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাতি জ্বালানোর পরে দেখি, চারিদিকে নিকষ কালো অন্ধকার, মোম আর আগর বাতির গন্ধে পুরো গুহায় এক প্রকার আবেগী পরিবেশ বিরাজ করছিল। আমার মনে তখনও হালকা ভীতি-যুক্ত কৌতূহল কাজ করছিল, আমার লক্ষ্য যতটুকু পারা যায় গুহার শেষ পর্যন্ত দেখা! যে সুরঙ্গ দিয়ে সুন্দর শাহ পালিয়ে যেতে পারল, সে সুরঙ্গ দিয়ে আমার পক্ষেও তো অনায়াসে যাওয়া সম্ভব হবে! যত ভিতরে যাই দম বন্ধ হবার উপক্রম। আলো-বাতাস নাই, শ্বাস নেওয়া কষ্টকর, ভ্যাপসা গরম, ঘামে একাকার, বিদঘুটে ধরনের দুর্গন্ধ! হয়ত বাদুরের উচ্ছিষ্টের গন্ধ হবে!

হামাগুড়ি দিয়ে আরেকটু এগিয়ে গেলাম, বাম হাতের চাপে কিছু একটা যেন গলে গেল! ঠিক পচা বেগুনের উপরে হাতের চাপ পড়লে যেমন অনুভুতি, তেমনই। দুর্গন্ধটা বাড়তে থাকল! অনুভব করলাম হাত বেয়ে কিলবিল করে অগনিত কিছু যেন উপরের দিকে বেয়ে উঠছে। লেদা পোকার মত কিছুটা পেঁচিয়ে উঠার মত অনুভূতি! ভাবলাম মরা ইঁদুর কিংবা বাদুরের পচা লাশ হতেও পারে! এর আগে অন্যত্র প্রায় একই ধরনের আরেকটি ঘটনার অভিজ্ঞতা ছিল। ঘেন্নায় পুরো শরীর রি রি করে উঠল, মুহূর্তেই হ্যাঁচকা টান মেরে হাত ঝেড়ে নিলাম। ডান হাত দিয়ে পকেটে লুকানো ক্ষুদ্র টর্চ লাইট বের করে বাটনে চাপ মারলাম। ঠিকই তো! মরা ইঁদুর! হাতের এক চাপে পুরো লাশটি একবারে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে! চারিদিকে পোকা কিলবিল করছে।

মনে হলো নাড়ি ভুঁড়ি সব এখুনি বের হয়ে আসবে। মুহূর্তেই পিছনে আসলাম, বহু কষ্টে জিহ্বা আয়ত্তে রাখলাম। চিৎকার দিলাম না, জানি আমার একটি মাত্র চিৎকারে আবার নতুন করে ইতিহাস রচিত হবে। কষ্ট হলেও টর্চ লাইটের আলো সামনে নিক্ষেপ করলাম, পুরো গুহার শেষ পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। মনের অজান্তে বললাম, ঐ ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে সুন্দর শাহ কিভাবে পালিয়ে গেলেন! যেখান দিয়ে অসহায় ইঁদুর পালাতে পারেনি! গতবারে বাদুরের মল-মূত্রে সবার পুরো শরীর আঠালো ও পুতি-গন্ধময় হয়েছিল। আজও বাদুরের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। তাই সবাই যার যার মত করে আনুষ্ঠানিক সওয়াবের কাজ সেরে বের হয়ে গেলেন। আমিই সবার পিছনের রয়ে গেলাম, আমার আগেই মা। শেষ ব্যক্তি হিসেবে আমি আস্তে আস্তে গুহা থেকে বের হয়ে গেলাম।

সবার চেহারা দেখে বুঝা গেল আমার উঠা নামা সহ সকল কিছু যথাযথ হয়েছে। আমি ভয় পাইনি, চিৎকার করিনি বলে প্রশংসা শুনলাম। অধিকন্তু গুহার অভ্যন্তরে আমার সামনে হালকা উজ্জ্বল কুদরতি আলো দেখতে পেয়েছিলেন বলে, অনেকে বলাবলি করতে থাকল। এসব প্রশংসা শুনে আমি খুশিতে গদগদ হয়ে মুখ ফসকে বলে বসি, এই গুহা কি আগে থেকেই ছিল? যার ছিদ্র দিয়ে সুন্দর শাহ পালিয়েছে! নাকি সুন্দর শাহ নিজের হাতে গুহা বানিয়ে, সেটার ছিদ্র দিয়ে প্রাণ ভয়ে পালিয়েছিলেন?

মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহাত্মক হয়ে গেল! মায়ের কান মলা, অন্যদের হা-হুতাশের মাধ্যমে পরিবেশটাই বিদঘুটে হয়ে গেল। একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে, সুন্দর শাহের সিলার মুখে দাঁড়িয়ে, তাচ্ছিল্য বাক্য কথন, সুন্দর শাহ সম্পর্কে এভাবে অসুন্দর, আপত্তিকর মন্তব্যে সবাই বিরক্ত হয়ে গেল। সবাই বলাবলি করতে লাগল এই ছেলেকে জ্বিন মুক্ত করতে আরো শক্ত চিকিৎসা দরকার। মায়ের মুখে আসমানের কালো মেঘে ছেয়ে গেল, পরিতাপ বেড়ে গেল, তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন, বাবাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে 'হাঁট'বসিয়েই অপঃ জ্বিনকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে।

'হাট' সম্পর্কে বলার আগে জ্বীনের কার্যপরিধি সম্পর্কে কিছু পরিষ্কার ধারণা অর্জন জরুরী। এতে "এ পিকুলিয়ার ম্যান" এর উপলব্ধি ও ঘটনা প্রবাহ বুঝা সহজ হবে। সচেতন পাঠকদের অনেক শোনা শব্দের অর্ন্তনিহীত রহস্য জানা যাবে। জ্বীন গ্রস্ত পরিবারে কিছুটা স্বচ্ছ ধারনা আসবে। নিচের এই লিখা পড়ে কেউ আমাকে জ্বীনাক্রান্ত রোগীর সঠিক চিকিৎসক মনে করে পরামর্শ চাইবেন না। চাইলে আমি উত্তর দিব না। আমি নিতান্ত কৌতূহলোদ্দীপক একজন ক্ষুদ্র গবেষক মাত্র এবং এটা বিগত পঁয়ত্রিশ বছরের পর্যবেক্ষণ।


অভিযান
০ টি মন্তব্য      ৩২৭ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: