অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৭ জন ভিজিটর

অতঃপর সুন্দর শাহের সিলায়...

লিখেছেন Nazrul Islam Tipu সোমবার ১১ মার্চ ২০১৯

সুন্দর শাহের সিলায় গিয়ে কিছু মানত করলে, শর্ত সাপেক্ষে সে মানত পুরো হয়। শরতের এক সকালে মা, খালা, চাচী, জেঠি মিলে, ছোট-খাট এক তীর্থ দল আমাকে নিয়ে, সুন্দর শাহের সিলায় উপনীত হলেন। 'হালদা নদী' বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্রোতস্বীনি হালদার অনেক উজানে নদীর বাঁকের এক তীরে ইস্পাহানী গ্রুপের বিস্তীর্ণ চা বাগান; অন্য তীরে সুন্দর শাহের সিলার অবস্থান। সিলার সামনে দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম যাবার সুন্দর কাঁচা রাস্তা আছে। দারুণ মনোমুগ্ধকর স্বাস্থ্যকর স্থান! গরম কালে গরম থাকেনা, শীত কালেও আবহাওয়া সুখকর। পিকনিকের জন্য অতীব উৎকৃষ্ট স্থান। হালদার তীর ধরে উজান-ভাটিতে প্রায় ৬০ কিলোমিটার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমার আছে। তবে এত সুন্দর স্থান দ্বিতীয়টি দেখিনি।

চট্টগ্রামে বেশীর ভাগ পীর, দরবেশের নামের আগে বা শেষে 'শাহ' আছে। মুসলমানেরা আরবী ভাষায় নাম রাখলেও, ফার্সী ভাষার শাহ শব্দটি তাদের নামের উপর এক কীর্তমান পদবী। এই শব্দের প্রভাব পুরো ভারত বর্ষেই ব্যাপক। বহু শাসকেরাও এই শব্দটিকে পছন্দ করেন। বাদশাহ, শাহ-জাদা, বাবা হুরমুত শাহ এসব নামে 'শাহ' আছেই। সে হিসেবে 'সুন্দর শাহ' নামটি শুনলে বুঝা যায়; তিনি সুন্দর আকৃতির মানুষ ছিলেন এবং স্থান নির্বাচনেও যথেষ্ট সুন্দর রুচি-বোধের পরিচয় দিয়েছেন কিন্তু তাঁর পবিত্র নামের শেষে 'সিলা'কথাটার অর্থ বুঝিনি! মনের ভিতরে আবারো সেই পুরানো কৌতূহলের ঠেলাঠেলি! আমিই যেহেতু আজকের অনুষ্ঠানের মুল নায়ক, তাই আবেগে গদগদ হয়ে এক মুরুব্বীকে প্রশ্ন করলাম, 'সিলা'জিনিষটা কি?

শুরুতেই জ্যাঠাই মায়ের কড়া ধমক খেলাম! তিনি সোজা বলে দিলেন, এখানে আজে বাজে প্রশ্ন করা যাবেনা! চোখ আছে দেখবে, আর কান আছে শুনবে। মুরুব্বীরা যা বলে সেটা হুবহু মেনে চলবে। কোথায় কিভাবে চলতে হবে, কি বলতে হবে সবকিছু তোমাকে যথাসময়ে বলা হবে। তিনি আরো বললেন যে, “তোমার অতিরিক্ত কৌতূহলের কারণে আজকে পরিবারটি যায় যায় দশা”। জেঠাইমা আমার অতি প্রিয় ব্যক্তিদের একজন, তাঁর এমন কঠোর রুদ্র-মূর্তি আগে কোনদিন দেখিনি। অসময়ে অযথা এ ধরণের ধমক খেয়ে বোবার মত অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

সিলার নিয়ম-রীতি কঠিন। এখানে হাঁস-মুরগী জবাই করে খেতে হয়, খাওয়াতে হয়; যা বেচে যায় তা খাদেমকে দিয়ে দিতে হয়। রীতি মেনে কাজ করতে হয়, অনিয়ম কিংবা প্রথায় ভুল হলে প্রথম বার যত হাঁস-মুরগী জবাই হয়েছে দ্বিতীয় বার তার দ্বিগুণ দিতে হবে। আবার তৃতীয়বারে ত্রিগুণ না হয়ে ছাগল, অতঃপর চতুর্থ বারে গরু দিয়ে বেআকলীর চরম খেসারত দিতে হয়! এভাবে মানত পুরো না হওয়া পর্যন্ত, রীতির ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এসব ব্যাপার বোধগম্য না হলে, খাদেম সাহেব থেকে জেনে নিতে বলা হয়েছে!

আমাকে বারবার স্মরণ করানো হল, মানত পূরণ করতে গিয়ে যদি রীতি-নীতির বিরুদ্ধে কিছু করে বসি, তাহলে মানত তো পুরা হবেই না অগত্যা মানতের জরিমানা গুনতে হবে। বহুক্ষণ ধরে মানতের শর্ত ভাঙ্গলে যত বিপদ তার ফিরিস্তি শুনতে গিয়ে কাহিল হয়ে পড়েছি কিন্তু সে সব শর্ত কি কি, সেটাই জানতে না পেরে পরিত্যক্ত লেবু গাছের নীচে গিয়ে বসে পড়ি। সুন্দর খোশবুদার লেবু ধরে দেখতে গিয়ে, মুরুব্বীদের ফাইনাল শাসনের মুখোমুখি হলাম! সিলার অল্পভাষী খাদেম মুচকি হেঁসে বললেন, আমার অপরাধ এখনও মানত ভঙ্গের পর্যায়ে যায়নি! তবে সাবধান না এই ছেলের হাতে মানত ভাঙ্গতেও বা কতক্ষণ!

খাদ্য পর্ব শেষে, ঐতিহাসিক সিলা অভিমূখে তীর্থ যাত্রা শুরু হল। তখনই বুঝলাম আসল জায়গায় এখন যাওয়া হয়নি। হালদা নদীর তীর ঘেঁষে খাড়া পাহাড়ের দেওয়াল, তার প্রায় ত্রিশ ফুট উপরে সৃষ্টি হয়েছে একটি গুহামুখ! সেখানে উঠার জন্য মাটি কেটে অমসৃণ, হালকা পিচ্ছিল সিঁড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটাই সুন্দর শাহের সেই ঐতিহাসিক সিলা! একদা এই গুহার ভিতর দিয়েই, পাহাড়ের পেট ছিঁড়ে, সুন্দর শাহ ত্রিশ কিলোমিটার দূরের আরেকটি গুহামুখ দিয়ে বের হয়ে পালিয়ে ছিলেন!

গুহামুখ বিজয়ে দক্ষ প্রশিক্ষকের মারাত্মক পতন

সিন্দাবাদের কাহিনী কাল্পনিক হলেও, কিছু গঠনমূলক বাস্তবতা আছে। মনে হচ্ছে সিলার ঘটনা আলিফ লায়লাকেও হার মানাবে। অনেক প্রশ্ন কিলবিল করছে, পেট চেপে রাখতে পারলাম না, প্রশ্ন করেই ফেললাম! সুন্দর শাহ কেন পালিয়ে ছিলেন? কে তাঁকে দৌঁড়াল? তিনি কিভাবে পাহাড় ছিদ্র করেছিলেন? চতুর্থ প্রশ্ন মুখ থেকে বের হবার আগেই, কারো শক্ত হাত আমার মুখ চেপে ধরল। মরিচ মাখানো কান মলা ও মায়ের চপেটাঘাতের ব্যথা আজো ভূলিনি। কঠোর ভাবে বলে দেয়া হল কোন কৌতূহল নয়, একটিও নতুন প্রশ্ন নয়! নতুবা পুরো যাত্রাই বরবাদ হবে!

পিচ্ছিল সিঁড়ি বেয়ে সোজা উপরে উঠে গুহায় ঢুকতে হবে; বের হবার সময় পিছনে না তাকিয়ে উল্টো হেঁটে ধাপে ধাপে নীচে নামতে হবে। ভয় পাওয়া যাবেনা, চিৎকার করা যাবেনা। গুহার উচ্চতা খুবই কম তাই মাথায় আঘাত খাওয়া যাবেনা। সন্তর্পণে এক জোড়া মোমবাতি ও এক জোড়া আগর বাতি জ্বালিয়ে, গুহার একটু মাটি জিহ্বায় লাগিয়ে, পিছনের দিকে না তাকিয়ে উল্টো নামতে পারলেই কর্ম সাবাড়! যত বিপদ আসুক, কোন অবস্থাতেই গুহা মুখকে পিছন দেওয়া যাবেনা। এই সামান্য কসরত করেই তো শত শত মানুষের মান্নত পুরো হচ্ছিল!

ছহি-সালামতে কিভাবে উঠতে ও নামতে হবে, সূচারু প্রশিক্ষণের জন্য চাচাত দুলাভাইকে সাথে আনা হয়েছিল। তিনিই যত নাটের গুরু, এই সিলার সংবাদ তিনিই জুঠিয়েছিলেন! তাঁর রানের ফোঁড়াটা বহুদিন যাবৎ কষ্ট দিচ্ছিল! পাঁকেও না, ফাটেও না! নিয়ত করে এখানে এসেছিলেন। এক পায়ে ভড় দিয়ে, বহু কষ্টে সিলার মুখে উঠার সময়ই, পটাশ করে ফোঁড়া ফেটে যায়! তিনি রোগ মুক্তি পান! মাথার মেজাজ তিরীক্ষি হয়ে উঠেছিল, কিসের সাথে কিসের উপমা! ভাবলাম “কোথায় মহারাণী আর কোথায় চাকরাণী” দুটোকেই এক করে ফেলল! ‘তাঁর রানের ফোঁড়া ফাটা, আর আমার জ্বীনের নজর কাটা’ এঁদের কাছে দুটোই এক কাতারের বিষয় হয়ে গেল!

যাই হোক, দুলাভাই প্রশিক্ষণের নিমিত্তে খুবই আদবের সহিত, অতি সন্তর্পণে চার কদম পর্যন্ত উঠলেন! পঞ্চম ধাপে কদম রাখতে যাবেন, ঠিক তখনই তিনি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন! নিজেকে কোনভাবেই সামাল দিতে পারলেন না। টাল-মাটাল দশা হাঁটু-কোমরের মাঝে; চিৎপটাং ভঙ্গিতে এমন পলট খেলেন, সোজা হালদা নদীর পানিতে! শরতের এই বিকেলে হালদায় ছিল ভরা যৌবন, পানি থাকায় বেঁচেছেন নতুবা বেচারায় নির্ঘাত ঘাড় ভাঙ্গত। স্বামীর এ ধরনের লজ্জাজনক অধঃপতনে বুবু ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন! তিনি বলতে থাকলেন, তুমি এত বড় কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষ! তরতর করে সুপারি গাছে উঠে যেত পার, আর এখানে পাঁচটি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে পারলে না! অকর্মা নির্বোধ.....

এতগুলো শাশুড়ির সামনে মাত্র পাঁচ হাত উপর থেকে হাস্যকর অধঃপতনে দুলাভাইয়ের মুখ থেকে কোন কথাই বের হল না। বেচারা বেজায় শরমিন্দা হয়ে শুধু এতটুকুই বলল, বাকী জীবনে আর কাউকে তিনি কিছু শেখাতে যাবেন না। বুবু বললেন, তাই ভাল, অযোগ্য হিসেবে প্রমাণিত হবার চেয়ে, যোগ্যতার বাহাদুরি না দেখানোই উত্তম।


মাজার
০ টি মন্তব্য      ৪৩০ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: