অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৫ জন ভিজিটর

আধুনিক যুগের একজন ক্রুসেডার

লিখেছেন আফগানী শনিবার ২১ ডিসেম্বর ২০১৯

নাইট হলো খ্রিস্টানদের একটি সম্মানজনক উপাধি। এটি প্রদান করা হয় খ্রিস্টান রাজ পরিবার অথবা ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা। ইউরোপের দেশগুলোতে যারা দেশের জন্য, খ্রিস্ট ধর্মের জন্য, গীর্জার জন্য, রাজ পরিবারের জন্যে এবং কোনো ধর্মীয় নেতার জন্য অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন তাদের এই উপাধি প্রদান করা হয়। স্বাভাবিক কারণে ব্রিটিশ নাইট সব নাইটের চাইতে সম্মানজনক খ্রিস্টানদের কাছে। ঐতিহাসিকভাবে ইউরোপে সাধারণত অশ্বারোহী যোদ্ধাদের নাইটহুডে ভূষিত করা হতো। কারণ অশ্বারোহী যোদ্ধারাই তখন সর্বোচ্চ বীর ছিলেন অথবা বীরেরা ঘোড়াসহই যুদ্ধ করতেন।

 

দ্বাদশ শতাব্দিতে নাইট উপাধি পেতেন সেসব বীর যোদ্ধা যারা দেশের জন্য, রাজার জন্য প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হতেন। রাজারা নিজেদের দেহরক্ষী হিসেবেও নাইটদের নিয়োগ করতেন। রাজারা নাইটদের বিশ্বস্ততা, প্রতিরক্ষা ও সেবার জন্য জমির রাজস্বের অংশ প্রদান করতেন। এছাড়া অভিজাতগণ নাইটদের তাদের প্রয়োজনীয় উপকরণ, খাদ্য, বর্ম, অস্ত্র, ঘোড়া ও অর্থ প্রদান করতেন। অপর একজন নাইটের অধীনে যুদ্ধ করা নাইটকে বলা হতো নাইট ব্যাচেলর এবং তার নিজের ব্যানারের অধীনে যুদ্ধ করা নাইটকে বলা হতো নাইট ব্যানারেট।

 

আগে একজন ব্যক্তিকে নাইট হতে হলে অভিজাত বংশে জন্ম নিতে হবে - সাধারণত নাইট বা জমিদারের পুত্র। কিছু ক্ষেত্রে, সেনাবাহিনীতে অসাধারণ কাজের জন্য সাধারণ ব্যক্তিরাও নাইট হতে পারে। অভিজাতদের সন্তানদের সাত বছর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অভিজাত শ্রেণীর ধাইমাগণ দুর্গের অভ্যন্তরে লালনপালন করে থাকেন।

 

সাত বছর বয়সী পুত্রকে পেজ উপাধি দেওয়া হতো এবং দুর্গের প্রধানদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসা হতো। প্রারম্ভিক প্রশিক্ষণ হিসেবে তাদের শিকারী ও বাজপাখি পালকদের সাথে শিকার এবং পুরোহিতদের অধীনে একাডেমিক শিক্ষার জন্য পাঠানো হতো। পেজরা পরবর্তীতে যুদ্ধে বয়োজ্যেষ্ঠ নাইটদের সহকারী হতো, তাদের বর্ম বহন করত ও পরিষ্কার করত, ঘোড়ার দেখাশুনা করত, এবং মালপত্র ঘোছাত। তারা নাইটদের সাথে বিভিন্ন আক্রমণে যোগ দিত, এমনকি ভিন্ন দেশেও। জ্যেষ্ঠ পেজরা নাইটের নির্দেশনা অনুযায়ী তরবারি চালানো, অশ্বারোহণ, শৌর্য্য প্রদর্শন, যুদ্ধ বিগ্রহ ও একে অপরের সাথে যুদ্ধ করত।

 

১৫ বছর বয়স হলে একটি বালক স্কোইয়ার হয়। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে নতুন স্কোইয়ারকে একজন বিশপ বা পুরোহিত একটি তলোয়ার দিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করান এবং তার মালিকের বাড়িঘরের দেখাশুনাসহ তার যাবতীয় কর্তব্য পালনের অঙ্গীকার করান। এই সময়ে স্কোইয়াররা একে অপরের সাথে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ চালিয়ে যেত এবং বর্ম পড়ার অনুমতি দেওয়া হত। স্কোইয়ারদের সাতটি বিষয়ে তৎপর হতে হতো, সেগুলো হল - ঘোড়ায় চড়া, সাঁতার ও ঝাপ দেওয়া, বিভিন্ন অস্ত্র ছোড়া, উচ্চস্থানে আরোহণ করা, মল্লযুদ্ধ ও তরবারি চালনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ, উচ্চ লাফ ও নৃত্য। এসব হল নাইটহুডের জন্য দক্ষতা অর্জনের পূর্বশর্ত। বর্ম পড়ার পর এই সকল বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে হতো। ২১ বছর পূর্ণ হলে স্কোইয়ারগণ নাইট হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করত। এই দির্ঘ প্রশিক্ষণ ও পথ পরিক্রমায় একজন নাইট দক্ষ ও ধর্মযোদ্ধা হয়ে উঠতেন।

 

নাইটরা সারাবিশ্বে নাম করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের সময়। মুসলিমদের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধে নৈপুন্য প্রদর্শন করতেন তারাও নাইট উপাধি পেতেন। এছাড়াও যারা গির্জায় বা নাইট স্কুলে প্রশিক্ষণ নিয়ে নাইট হতেন তারাও যুদ্ধে ভালো ভূমিকা রাখতেন। তাই রাজারা যুদ্ধ জয়ের জন্য নাইটদের অন্যতম উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতেন।

 

সময়ের পরিক্রমায় যুদ্ধ ও আধিপত্য বিস্তারের ধরণ পালটে গেছে। তাই এখন আর ইউরোপিয়ানরা তাদের নাইটদের জন্য শুধু যুদ্ধ ও যুদ্ধ বিজয়কে উপলক্ষ করেন না। কারণ ইউরোপিয়ান নেতারা লক্ষ্য করেছেন এখন একজন সিভিলিয়ান তাদের রাষ্ট্রের জন্য ও ধর্মের জন্য অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারেন যা যুদ্ধে বিপুল বিজয়ের দ্বারাও অনেকসময় সম্ভব হয় না। এই কারণে কারা সিভিলিয়ানদেরও নাইট উপাধিতে ভূষিত করা শুরু করেছেন।

 

বর্তমান সময়ে বিভিন্ন খ্রিস্টীয় গির্জায় নাইটহুডের অনেক ক্রম রয়ে গেছে। কয়েকটি ঐতিহাসিকভাবে খ্রিস্টান দেশে এবং তাদের প্রাক্তন অঞ্চলসমূহে এই ক্রম দেখতে পাওয়া যায়, যেমন রোমান ক্যাথলিকদের অর্ডার অব দ্য হলি সেপালচার, প্রটেস্ট্যান্টদের অর্ডার অব সেন্ট জন, ইংরেজদের অর্ডার অব দ্য সেন্ট মাইকেল এন্ড সেন্ট জর্জ, সুইডিশদের রয়্যাল অর্ডার অব দ্য সেরাফিম, এবং রয়্যাল নরওয়েজিয়ান অর্ডার অব সেন্ট ওলাভ। এই পদক্রমে ভূষিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের নিজস্ব মানদণ্ড রয়েছে, কিন্তু সাধারণত রাজ্যের প্রধান, শাসক বা প্রধান ধর্মযাজক মেধাসম্পন্ন কাজের অবদানের জন্য নির্বাচিত ব্যক্তিকে নাইটহুড প্রদান করে থাকেন, যেমন ব্রিটিশ সম্মাননা পদ্ধতিতে গির্জা, খ্রিস্টধর্ম বা ইংল্যান্ডের সেবার জন্য প্রদান করা হয়ে থাকে। যুক্তরাজ্যে নাইটের সমকক্ষ নারী উপাধি হল ডেম।

 

এ পর্যন্ত তিনজন বাঙালি ও একজন বাংলাদেশী ব্রিটিশ নাইট উপাধি গ্রহণ করেছেন। এরমধ্যে একজন পাঞ্জাবে জালিওয়ানবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদস্বরূপ নাইট উপাধি প্রত্যাহার করেছেন। এরা সবাই ব্রিটিশ কিংডমের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার শপথ গ্রহণ করেছেন।

তিনজন বাঙালি হলেন

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

২. ফজলে হাসান আবেদ

৩. আখলাকুর রহমান চৌধুরী

 

রবি ঠাকুরের বড় অবদান হলো তিনি ব্রাহ্ম সমাজকে দারুণ জনপ্রিয়তা এনে দেন যা হিন্দু সমাজ ভাঙতে ভূমিকা রেখেছে। হিন্দুদের মধ্যে শিক্ষিত লোকদের তিনি সহজেই ব্রাহ্ম সমাজের মাধ্যমে ব্রিটিশদের অনুগত করে তুলেছেন। স্বীকৃতি হিসেবে ১৯১৫ সালে পেয়েছেন নাইটহুড। ২০১০ সালে ফজলে হাসান আবেদ সুদের বিস্তার ও নারীদের আত্মনির্ভরশীল করার মাধ্যমে পরিবার ভাঙার আন্দোলনে সফল হওয়ার জন্য। ২০১৭ সালে আখলাক সাহেব ইংল্যান্ডে জুডিসিয়ারি সার্ভিসে অবদান রাখার জন্য। তিনি বাংলাদেশী বংশদ্ভূত ব্রিটিশ। তার জন্ম ব্রিটেনেই হয়েছে।

 

নাইট উপাধি দেওয়ার সময় ব্রিটেনে রাজা/প্রিন্স/রানীর সামনে হাঁটু গেড়ে নিতে হয়। এসময় রাজা/প্রিন্স/রানী তার কাজের ব্যপারে যা উল্লেখ করেন তা হলো,

Be loyal of hands and mouth, and serve every man as best you may. Seek the fellowship of good men; hearken to their words and remember them. Be humble and courteous wherever thou go, boasting not nor talking overmuch, neither be dumb altogether. Look to it that no lady or damsel be in reproach through your default, nor any woman of whatsoever quality. And if you fall into company where men speak with disrespect of any woman, show by gracious words that it pleaseth you not, and depart.

 

The office of knight is to promote faith in Jesus Christ as Lord of Lords, King of Kings and the only Savior and to protect those who seek to worship in His name any where upon the face of this earth that He has made.

 

এবং নাইটহুড পাওয়া ব্যাক্তির কাঁধে তলোয়ার রেখে যে প্রার্থনা করা হয় তা হলো,

"Hearken we beseech Thee, O Lord, to our prayers, and deign to bless with the right hand of Thy Majesty this sword with which They servant desires to be girded, that it may be a defense of churches, widows, orphans and all Thy servants against the scourge of pagans, that it may be the terror and dread of all evil-doers, and that it may be just in both attack and defense."

 

একজন নাইট সম্পর্কে আর মনে হয় খুব বেশি বলার দরকার নেই। যথেষ্ট।


০ টি মন্তব্য      ৩৮৩ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: