অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২৫ জন ভিজিটর

হিলফুল ফুদুল/ফুযুলের ইতিকথা

লিখেছেন আফগানী বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর ২০১৯

যদিও বাংলাদেশে ফুযুল বলা হয় কিন্তু দোয়াদের উচ্চারণ বাংলাদেশে যেভাবে হয় সেভাবে ফুদুল হওয়াই যুক্তিযুক্ত। যাই হোক সেটা কোনো বিষয় না।

 

হিলফুল ফুদুল ৫৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সংগঠন। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাসূলের চাচা আয যুবায়ের বিন আব্দুল মুত্তালিব। রাসূল সা. তাঁর চাচার আহবানে এই সংঘে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

 

এই সংগঠনের পটভূমি হিসেবে রয়েছে দুটো ঘটনা। 

১- ফিজারের যুদ্ধ

নবীজির (সা.) শৈশবের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল "ফিজার যুদ্ধ।" কেউ কেউ অবশ্য একে "ফুজর যুদ্ধ" বলেন, ফিজার শব্দের উৎপত্তি এই "ফুজর" শব্দ থেকেই। এর মানে হচ্ছে "evil war." কুরাইশদের এক (কিনানা) গোত্রের লোক হাওয়াজিন গোত্রের এক লোককে হত্যা করে পালিয়ে আসে। মক্কাবাসীদের অতিরিক্ত মাত্রায় গোত্রপ্রীতি ছিল। তারা নিজেদের সাথীর মৃত্যুর বদলা নিতে হাওয়াজিনরা কিনানা গোত্রকে আক্রমন করে বসে। কিনানার লোকেরা তখন হারাম শরীফে অবস্থান করছিল। কিন্তু হাওয়াজিন গোত্রের লোকেরা ক্রোধে এমনই উন্মত্ত ছিল যে তারা কাবা ঘরের পরোয়া না করে কিনানা গোত্রকে আক্রমন করে এবং খুনিকে খুন করে বদলা নেয়। কাবা ঘরে রক্তপাত তখনো নিষিদ্ধ ছিলো এখনো নিষিদ্ধ।

 

হারাম শরীফের ভিতরে খুনাখুনি হওয়ায় হারাম শরীফের পবিত্রতা নষ্ট হয়। ফলে পুরো কুরাইশ বংশ এক হয়ে হাওয়াজিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ইতিহাসে এটিই ছিল ফিজার যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে দুই দলই ভুল ছিল। এই যুদ্ধ খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। একটা সময়ে দুই দলের সমঝোতার ভিত্তিতে এর মিমাংসা হয়। এই যুদ্ধ মক্কায় অনেক রক্তপাত ঘটায়। অনেকেই শান্তির খোঁজে মক্কা থেকে চলে যান। এই রক্তপাত আয যুবায়েরকে ভাবিয়ে তুলে।

 

২- ইয়েমেনি ব্যবসায়ীর প্রসঙ্গ 

ঘটনার শুরু হজ্ব মৌসুমে যখন এক ইয়ামেনি আরব মক্কায় হজ্ব করতে এসে আল-আস ইবনে ওয়া'ইলের (বিখ্যাত সাহাবী আমর ইবনুল আসের পিতা) কাছে কিছু সামগ্রী বিক্রি করেন। আল আস ইয়েমেনীকে বলেন, "তুমি হজ্ব শেষ করে যাবার সময়ে টাকা নিয়ে যেও।"

 

ইয়েমেনী ভদ্রলোক হজ্ব শেষে টাকা চাইতে এলে আল আস তাঁকে নানান বাহানায় ঘুরাতে থাকেন। একটা পর্যায়ে ইয়েমেনী বুঝতে পারেন যে তাঁর টাকা ফেরত পাবার আর কোনই সম্ভাবনা নেই। তখন তিনি মক্কার বিভিন্ন উচ্চমহলে গিয়ে বিচার দেন এবং বলাই বাহুল্য, তাঁকে কেউই সাহায্য করেনি। আল আস মক্কার সমাজে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন, মক্কার পক্ষ থেকে বিদেশী রাজা মহারাজাদের সাথে যাবতীয় রাজনৈতিক, কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন।

 

কোথাও কোন সুবিচার না পেয়ে ইয়েমেনী ভদ্রলোক মক্কার পাশের টিলায় উঠে কুরাইশদের ব্যঙ্গ করে কবিতা আবৃত্তি করতে থাকেন। কবিতাটির মূল বক্তব্য ছিল কোরাইশরা আসলে বাটপার, তারা সাধারণ মানুষকে ঠকায়। মক্কার লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো মূল ঘটনা। সবাই হায় হায় করে উঠলো।

 

আয যুবাইর ইবনু আবদিল মুত্তালিব ছিলেন একজন কল্যাণকামী ও সৎ ব্যক্তি। তিনি এই অবস্থার (অন্যায় যুদ্ধ, হানাহানি, অর্থ আত্মসাৎ ইত্যাদি) পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে মত বিনিময় করেন। এর অনুকূলে সাড়াও পেলেন। শিগগিরই গড়ে উঠলো একটি সংগঠন। নাম তার হিলফল ফুদুল। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স তখন একুশ বছর। তিনি সানন্দে এই সংগঠনের অন্তর্ভূক্ত হন। আব্দুল্লাহ ইবনে জুদানের ঘরে আরও তিনজনের সাথে নবীজির (সা.) ডাক পড়লো। সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এবং ভবিষ্যতে যেন এমন না ঘটে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

 

তাঁরা একটি চুক্তিপত্রে সই করলেন। তাঁরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে জনসম্মুখে ঘোষণা দিলেন তাঁরা এখন থেকে অন্যায়কারী যেই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে লড়বেন, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। এবং তারপর আঙ্গুলে সুগন্ধি মেখে একটি পৃষ্ঠায় সেই আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে কাবা ঘরে সংরক্ষণ করে রাখলেন। এই সংঘের ঘোষণাপত্র পাঁচটি বিষয় ছিলো।

১। আমরা মক্কা থেকে অশান্তি দূর করবো।

২। পথিকের জান-মালের হিফাজত করবো।

৩। অভাবগ্রস্থদের সাহায্য করবো।

৪। মজলুমের সাহায্য করবো।

৫। কোন জালিমকে মক্কায় আশ্রয় দেবো না।

 

এরপর তাঁরা একসাথে আল আসের বাড়ি যান এবং ইয়েমেনীর টাকা উদ্ধার করে দেন। তাদের এই উদ্যোগে আবু বকর রা.ও অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তিতে এই হিলফুল ফুদুলের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বনু হাশিম, বনু জুহরা, বনু আসাদ, বনু তাইম গোত্র। প্রভাবশালীদের মধ্যে অংশগ্রহণ করেনি বনু উমাইয়া ও বনু নওফেল।

 

জীবনের শেষ সময়ে ব্যপারটি নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রাসূল সা. বলেন, "আমাকে কেউ এক হাজার লাল উট (তখনকার সময়ের সবচেয়ে দামী প্রাণী/বাহন) দিলেও আমি আমার সেদিনের অবস্থান পরিবর্তন করব না।" তখনকার এক হাজার লাল উট মানে ধরেন এখনকার এক হাজারটা বিলাসবহুল গাড়ি। আল্লাহর রাসূল সা. তার সেই কাজ নিয়ে এতই গর্বিত ও সন্তুষ্ট ছিলেন যে, কোটি টাকার বিনিময়েও তিনি সেই দলের সাথে থাকার সম্মান বিক্রি করতে রাজি হবেন না।


ইসলাম সীরাতুন্নবি
০ টি মন্তব্য      ৯০৯ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: