অনলাইনে আছেন

  • জন ব্লগার

  • ২২ জন ভিজিটর

মণিপুরের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং এর যৌক্তিকতা

লিখেছেন আফগানী বৃহস্পতিবার ৩১ অক্টোবর ২০১৯

 

গতকাল মণিপুরের দুজন নেতা লন্ডনে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। এই নিয়ে বিশ্বে মোটামুটি একটু হইচই শুরু হয়েছে। মণিপুর নিয়ে অনেক নিউজ ও আর্টিকেল প্রকাশিত হচ্ছে। যখন কেউ স্বাধীনতার দাবী তোলে তখন দুটো পক্ষ তৈরি হয়। যারা এর পক্ষে থাকে তারা একে স্বাধীনতা আন্দোলন বলেন আর যারা এর বিপক্ষে থাকেন তারা একে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলেন।

 

ঐক্যের বিপরীতে বিচ্ছিন্নতাবাদ গ্রহণযোগ্য নয়। তখনই কেবল গ্রহনযোগ্য হতে যদি এর কোনো নৈতিক গ্রাউন্ড থাকে। ভারত থেকে মণিপুরের স্বাধীনতা ঘোষণা তখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে যদি তাদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য যৌক্তিক কারণ থাকে। যৌক্তিক কারণগুলো এমন।

১. যদি ভারত তাদের জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছে এমন ঘটনা ঘটে।

২. যদি মণিপুরবাসী ধর্ম, বর্ণ, জাতি বিদ্বেষের শিকার হয়।

৩. যদি মণিপুরবাসীদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত না থাকে। তারা তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি চর্চায় বাধাগ্রস্থ হয়।

৪. যদি মণিপুরবাসীদের ভোটাধিকার না থাকে। তারা তাদের নিজেদের নেতা নিজেরাই নির্বাচন করতে না পারে।

৫. যদি তারা শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়।

৬. যদি তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে থাকে।

 

এই কারণগুলো ঐক্যের বিপরীতে বিচ্ছিন্নতার দাবীকে যৌক্তিক করে তুলে। যদি এই কারণগুলো না থাকে তবে বিচ্ছিন্নতার দাবী সমর্থনযোগ্য নয়।

 

মণিপুরে কী ঘটেছে?

মণিপুর ভারতের সাথে একীভূত ছিলো না ইংরেজ আমলে। ইংরেজদের আনুগত্য ও কর দেয়ার মাধ্যমে তাদের রাজা তাদের আলাদাভাবে শাসন করতো। ১ম বিশ্বযুদ্ধের সময় মণিপুরের রাজা বার্মার আক্রমণের ভয়ে ইংরেজদের সাহায্য চায়। সে সুযোগে ব্রিটিশরা তাদের সরাসরি শাসন করতে শুরু করে। তবে তারা সাংস্কৃতিকভাবে ভারতের সাথে মিশে যায়নি। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে যেভাবে নবাব বা জমিদার ছিলো তাদের রাজার মর্যাদাও তেমন ছিলো।

 

ভারত যখন ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হয় তখনও মণিপুর ভারতের সাথে একীভূত হয়নি। ভারতের স্বাধীনতার দুই বছর পর ১৯৪৯ সালে দেশটির অংশ হয় সাবেক ব্রিটেন শাসিত মণিপুর। তখন থেকেই সেখানকার স্বাধীনতাকামীরা ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছেন এবং সহিংস আন্দোলন চালাচ্ছেন। তবে এ অংশ মণিপুরের অধিকাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না।

 

১৯৪৭ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বল্লভভাই প্যাটেলের অন্যতম দায়িত্ব ছিল ব্রিটিশ ভারত, প্রদেশ এবং দেশীয় রাজ্যসমূহকে নিয়ে অখণ্ড ভারত নির্মাণ। তারই কূটনীতিক প্রচেষ্টায় রাজ্যটির সর্বশেষ শাসক বোধচন্দ্র সিংহ ভারতের সাথে যুক্ত হয়েছেন।

 

ভারতের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পিস স্ট্যাডিজের তথ্যানুযায়ী, মনিপুরে বিদ্রোহীরা ১৯৬৪ সালের ২৪ নভেম্বর ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (ইউএনএলএফ) গঠন করেন। বর্তমানে স্বাধীনতাকামী এই সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

 

মণিপুরকে ভারতের সঙ্গে একীভূতকরণ ও স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা না দেয়ায় এই বিদ্রোহী সংগঠনের সূচনা হয়। এরপর একই দাবিতে ১৯৭৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সৃষ্টি হয় পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ), ১৯৭৭ সালের ৯ অক্টোবর পিপলস রেভ্যুলিউশনারি পার্টি অব ক্যাংলেইপাক (পিআরইপিএক), ১৯৮০ সালের এপ্রিলে ক্যাংলেইপাক কমিউনিস্ট পার্টির (কেসিপি) সূচনা হয়। তারা প্রত্যেকেই স্বাধীন ও সার্বভৌম মনিপুরের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন।

 

এমন বিদ্রোহের কারণে ১৯৮০ সালে ভারত সরকার মনিপুরকে ’সমস্যাপ্রবণ এলাকা’ বলে ঘোষণা করে যা এখনও বলবৎ আছে। এছাড়া ভারত সরকার এই রাজ্যে ভারতীয় সেনা আইন 'স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট ১৯৫৮' আরোপ করেছে। এই আইন আরোপ করায় এখানকার মানুষকে অনেক কড়াকড়ি ও বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

 

মণিপুরের গণতন্ত্রপন্থী নেতা ও তাদের রাজার দাবী তারা ভারতের প্রতি অনুগত এবং এর অখন্ডতার জন্য তারা কাজ করবে তবে মণিপুর থেকে যাতে সেনা আইন তুলে নেয়া হয়।

 

রাজ্যটি যখন এমন সব বিষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তখন লন্ডনে প্রবাসী সরকার গঠনের ঘোষণা আসলো রাজ্যের দুই নেতা ইয়ামবিন বিরেন এবং নরেংবাম সমরজিতের পক্ষ থেকে। তারা মনিপুরকে স্বাধীন বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং দাবি করেছেন সেখানকার রাজা লেইশেম্বা সানাজাওবার পক্ষ থেকেই এমন ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। তবে রাজা লেইশেম্বা ইতোমধ্যে জানিয়েছেন তিনি স্বাধীনতার ব্যাপারে কিছুই জানেন না এবং ঐ দুজন রাষ্ট্র ও সংহতি বিরোধী।

 

বিরেন ও সমরজিত বলেন, স্বাধীনতার দাবি নিয়ে তারা পূর্বতন শাসক ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কাছে যাবেন এবং যুক্তরাজ্যের প্রিভি কাউন্সিলের অনুমতি পেলে জাতিসংঘে গিয়ে সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি চাইবেন। কিন্তু তারা গণভোটের ব্যাপারে কিছুই জানান নি। মূলত স্বাধীনতাকামীরা বামপন্থী এবং তারা বহুধা বিভক্ত। মণিপুরের তিরিশ লক্ষ মানুষের মধ্যে খুব অল্প মানুষেরই সমর্থন তাদের সাথে রয়েছে।

 

উপরের যে ছয়টি যৌক্তিক কারণের কথা বলেছি তার মধ্যে মণিপুরে কোনোটাই বিদ্যমান নেই। মণিপুরে এখন সাধারণ মানুষের যে সমস্যা সেটা হলো তারা সরাসরি সেনা শাসনের মধ্যে থাকতে হচ্ছে আর এটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্যই হয়েছে।


ভারত মণিপুর স্বাধীনতা
০ টি মন্তব্য      ২৮৮ বার পঠিত         

লেখাটি শেয়ার করতে চাইলে: